ইরান যখন পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে তোলে, তখন অনেক বিশ্লেষকই ধরে নিয়েছিলেন, এর ফলে ইরান ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সম্পর্ক দীর্ঘ সময়ের জন্য তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। একই সঙ্গে তারা মনে করেছিলেন, এই পরিস্থিতি আরব দেশগুলোকে ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে।
তেহরানের এই পদক্ষেপ যেন ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সেই দাবিকেই সত্য প্রমাণ করেছিল। ইসরায়েল বরাবরই বলে এসেছে, পারস্য অঞ্চলের অভিন্ন শত্রু ইরানকে মোকাবিলায় উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর উচিত তাদের সঙ্গে কৌশলগতভাবে হাত মেলানো।
কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ঠিক উল্টোটা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে, ইরানকে কোণঠাসা করার নীতি শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং তা একটি ভয়াবহ যুদ্ধের পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করাও নিরাপদ নয়।
ফলে ইরানকে বাদ দিয়ে এগোনোর বদলে আরব দেশগুলো এখন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। তারা তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে ওঠা নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল-থানি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আঞ্চলিক দেশ হিসেবে আমরা এখন যা করার চেষ্টা করছি, তা হলো আমাদের নিজেদের এবং ইরানের মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা।” তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করছি, এই নিরাপত্তা বলয় ভবিষ্যতে আমাদের সবার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ খুলে দেবে এবং অঞ্চলটিকে আবারও স্থিতিশীলতার দিকে ফিরিয়ে আনবে।”
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে সৌদি আরব।
যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি, রিয়াদ একটি বিশেষ বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, জিসিসির সদস্যরাষ্ট্র ও ইরানকে একই টেবিলে বসানো। আলোচনায় গুরুত্ব পাবে একটি আঞ্চলিক অনাক্রমণ চুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ১৯৭৫ সালের ইউরোপীয় হেলসিঙ্কি চুক্তির আদলে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়মিত বৈঠকের একটি কাঠামো তৈরি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এই উদ্যোগ ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সেই ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে, যেখানে বলা হতো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যাবে। বরং বর্তমান পরিস্থিতি যুদ্ধবিরোধী ও সংযত পররাষ্ট্রনীতির সমর্থকদের সেই যুক্তিকে শক্তিশালী করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এক ধাপ পিছিয়ে গেলে এই অঞ্চলের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে নিতে সক্ষম হবে।
বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই অস্থিতিশীলতার অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ইরানের বিরুদ্ধে দুটি বড় সামরিক সংঘাতও শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, এমন সময় যখন পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল।
তবু এই আঞ্চলিক উদ্যোগকে ওয়াশিংটনের স্বাগত জানানো উচিত। কারণ এতে মার্কিন করদাতা ও সেনাসদস্যদের ওপর নিরাপত্তার যে বড় বোঝা রয়েছে, তার একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাঁধে স্থানান্তরিত হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান আবারও পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করছে। আদর্শ পরিস্থিতিতে এমন একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে ওঠা উচিত, যা কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জোট তৈরির ভিত্তিও হবে না। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগ উল্টো পুরোনো মেরুকরণকে অন্য রূপে ফিরিয়ে আনতে পারে।
অর্থাৎ, ইরানকে একঘরে করার নীতি থেকে যেমন সরে আসা হচ্ছে, তেমনি এবার ইসরায়েলকে একঘরে করার নতুন প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। এতে দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ইসরায়েলবিরোধী জোট গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত একগুচ্ছ চুক্তি, যার মাধ্যমে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়।
অবশ্য ইসরায়েল তার নিজস্ব নীতির কারণেই আজ এই বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, দখলদারিত্ব এবং সম্প্রসারণবাদী নীতির ফলে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে। তাই ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তোলা যেমন যৌক্তিক, তেমনি প্রয়োজনীয়ও। তবে শুধু চাপ প্রয়োগ করলেই দেশটির নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে না, যদি না একই সঙ্গে তাদের সামনে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথও খোলা রাখা হয়।
এই কারণেই আরও বৃহৎ ও দূরদর্শী লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যথেষ্ট নয়; এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পথও সুগম করতে হবে।
‘দ্য বেটার অর্ডার প্রজেক্ট’ এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে। তাদের মতে, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসানের পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।
এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ইএস-১০/২৪ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) পরামর্শমূলক মতামত। সেখানে আইসিজে স্পষ্টভাবে বলেছে, “অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতি সম্পূর্ণ অবৈধ” এবং যত দ্রুত সম্ভব এই অবৈধ উপস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে।
নতুন নিরাপত্তা কাঠামোটি ইউরোপের হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়া, অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ (ওএসসিই) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ান মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারে। এর ভিত্তি হবে যৌথ নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, কোনো দেশকে কোণঠাসা না করা, জোরপূর্বক ভূখণ্ড দখলের স্বীকৃতি না দেওয়া এবং সবার জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আঞ্চলিক কূটনীতি সহজ করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা তদারকির জন্য একটি স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক সংস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক উদ্যোগে আরও বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এই নতুন নিরাপত্তা বলয় থেকে ইসরায়েলকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। বরং তাদের জন্য অংশগ্রহণের পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। তবে শর্ত হবে স্পষ্ট—ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে হবে।
এর বিনিময়ে ইসরায়েল এমন একটি সুযোগ পাবে, যা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের প্রতিশ্রুতির চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
অবশ্য এ ক্ষেত্রে ইরানের সম্মতিও প্রয়োজন হবে। তেহরান আগেই ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় কিংবা ফিলিস্তিনিদের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আসে, তাহলে তারা ইসরায়েলের এই অন্তর্ভুক্তি মেনে নিতে প্রস্তুত।
তবে শর্তটি হতে হবে নির্দিষ্ট ও আপসহীন। শুধু ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নয়; ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া উচিত। তবে একটি প্রক্রিয়া যেন অন্যটির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করে। ইসরায়েল যদি দখলদারিত্বের অবসানে রাজি না-ও হয়, তবুও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ থেমে থাকা উচিত নয়। বরং ইসরায়েলকে বাইরে রেখেই যদি এই জোট এগিয়ে যায়, তাহলে একসময় দেশটির জনগণই বুঝতে পারবে, বিচ্ছিন্ন থাকার চেয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হওয়াই অধিক লাভজনক।
বর্তমানে ইসরায়েলের কাছে ফিলিস্তিন দখল করে রাখা লাভজনক মনে হতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে। তখন ইসরায়েলও বুঝতে পারবে, দখলদারিত্বের নীতি ত্যাগ করাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে বেশি উপকারী।
দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এই ভঙ্গুর ও পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তে আরও স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ একটি আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবেন। এতে যেমন ইরানকে একঘরে করে রাখার নীতির অবসান ঘটবে, তেমনি ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্বেরও টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
ইতিহাস খুব কম সময়ই কোনো পরাশক্তিকে সম্মানজনকভাবে একটি অঞ্চল থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যে তেমনই একটি মুহূর্ত এসেছে। যদি এই অঞ্চলের দেশগুলো সবাইকে নিয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ে তুলতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ ভূমিকা হবে সেটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে দূর থেকে সমর্থন জানানো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়, বরং এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া, যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্য নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করতে পারে এবং সেই সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন। ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করে ভুল করেছিলেন, কিন্তু এখন শান্তির পথে সাহসী মোড় নেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসে ভিন্নভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকার সুযোগ এখনো তার সামনে রয়েছে।