ads

ফ্রান্সের ‘ইংল্যান্ডে জন্মানো’ মাইকেল ওলিসের গল্প

ফ্রান্সের ‘ইংল্যান্ডে জন্মানো’ মাইকেল ওলিসের গল্প
চলতি বিশ্বকাপে মাইকেল ওলিসে পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেছেন। ছবি : ইনস্টাগ্রাম

গত মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পেনাল্টি নিতে যাচ্ছেন হ্যারি কেইন। সবাই বক্সের বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে আছেন পেনাল্টি মিস হলে ফিরতি শট নেওয়ার জন্য। আর মাইকেল ওলিসে? তিনি বক্সের বেশ বাইরে দাড়িয়ে রইলেন অন্য দিকে তাকিয়ে। প্রায় একই কাজ তিনি করছেন ফ্রান্সের জার্সিতেও। যেন মাঠের কোনো রোমাঞ্চই তাকে স্পর্শ করে না।

এই অদ্ভুত চুপচাপ, নির্বিকার স্বভাবের কারণে ওলিসে একটা নাম পেয়েছেন। তা হলো - ‘মিস্টার ননশ্যালান্ট’ বা শান্ত, নির্বিকার স্বভাবের লোক। তবে ফুটবল পায়ে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই ফরাসি প্লেমেকারকে দূর থেকে যতটা নির্লিপ্ত মনে হয়, বাস্তবে তিনি এর ঠিক উল্টোটাই। প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নতি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেই নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বসেরাদের কাতারে।

‘ননশ্যালান্ট’ শব্দটি তাই ওলিসের ক্ষেত্রে একেবারেই যথার্থ নয়। চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফর্মার হওয়ার পেছনে রয়েছে তার অসাধারণ নিবেদনের গল্প। নিজের মতো করে থাকেন, তার ধ্যানজ্ঞ্যান একটাই - আরও উন্নতি করা।

ওলিসেকে যার কাছ থেকে চেনেন, তারাও শুনিয়েছেন একই কথা। ক্লাব বদল, বেশি পারিশ্রমিক, কেইন বা কিলিয়ান এমবাপ্পের ছায়ায় থাকার মতো বিষয়গুলো তাকে একেবারেই ভাবায় না। ২০২৪ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়েই তিনি বাড়ির জন্য অত্যাধুনিক রিকভারি সরঞ্জাম কিনেছিলেন, যাতে ফিটনেসের জায়গা থেকে আরও ভালো জায়গায় যাওয়া যায়।

ওলিসের প্রতিনিয়ত ভালো করার তাগিদ এতটাই যে, তিনি শরীরে জাপানি শব্দ ‘কাইজেন’-এর একটা ট্যাটুও করেছেন। বাংলায় যা দাঁড়ায় - প্রতিদিন ছোট ছোট উন্নতি করা।

এই যখন একজনের খেলোয়াড়ের মনোভাব, তখন তার কাছ থেকে মাঠে নির্লিপ্ত আচরণ খুব স্বাভাবিকই বটে। আর তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রচার বা ব্র্যান্ডিং নিয়ে ওলিসের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। সাক্ষাৎকার দিতেও খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। ফ্রান্স ও বায়ার্নের মতো দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও তারকা খেলোয়াড়দের মত জীবনযাপন তাকে টানে না।

ওলিসের সব মনোযোগ ফুটবলকে ঘিরেই। নিজের পরিসংখ্যান নিয়ে তার প্রবল সচেতনতা তারই সাক্ষ্য দেয়। গোল ও অ্যাসিস্টের হিসাব তিনি খুব ভালোই রাখেন। আর তাই নিশ্চয় তিনি অবগত আছেন যে, এবারের বিশ্বকাপে তিনি একটি ইতিহাস গড়া একটি রেকর্ডের খুব কাছে চলে গেছেন। ছয় ম্যাচে করেছেন পাঁচটি অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপের এক আসরে এর চেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট আছে কেবল ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের। ১৯৭০ সালে তিনি করেছিলেন ছয়টি অ্যাসিস্ট।

ফ্রান্সের অপরাজিত থেকে সেমিফাইনালে যাওয়ার পেছনে বড় অবদান রেখেছেন ওলিসে। সব ঠিক থাকলে শেষ চারে তাকে খেলতে হতে পারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আর সেটা হলে ম্যাচটা ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এবং সমর্থকদের কাছেই আক্ষেপের কারণই হবে। ভাবছেন কেন?

কারণ, ওলিসের জন্ম ইংল্যান্ডের হ্যামারস্মিথে। বেড়ে উঠেছেন হেইজে। এরপর চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি ও রিডিংয়ের একাডেমিতে খেললেও ২৪ বছর বয়সী এই ফুটবলারকে লন্ডনের ছেলে বললে খুব একটা ভুল হবে না। তিনি নিজেও বলেছেন, তার লন্ডনে থাকতেই বেশি ভালো লাগে।

যুব দল থেকেই ওলিসের প্রতিভা নজর কেড়েছিল ইউরোপের ক্লাবগুলোর। তবে চেলসি, ম্যান ইউনাইটেডের মতো ইংলিশ ক্লাবগুলো শেষ পর্যন্ত ওলিসেকে নিজেদের যুব প্রকল্পে ধরে রাখতে পারেনি। পাশাপাশি এটা দেখিয়ে দেয়, একটু ভিন্ন ধাঁচের ব্যক্তিত্বের খেলোয়াড়দের নিয়ে ইংলিশ ফুটবলে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

ওলিসের বাবা নাইজেরিয়ান, যিনি আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও খেলেছেন। আর মা ফরাসি-আলজেরিয়ান হওয়ায় একই সঙ্গে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়া জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ ওলিসের সামনে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন দুবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকেই।

হাইস্নোবিটি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার ওলিসে এই সিদ্ধান্তের কারণটা বলেছিলেন, “ছোটবেলায় যাদের খেলা দেখে বড় হয়েছি, তারা সবাই ফ্রান্সেরই ছিলেন। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরি, ফ্রাঙ্ক রিবেরিদের দেখেই আমার বেড়ে ওঠা।”

ইংল্যান্ডে জন্ম হওয়ায় ইংরেজিই অবশ্য তার প্রথম ভাষা। তবে তাই বলে ফ্রেঞ্চ ভাষাটা তিনি যে পারেন না, তা নয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি মায়ের সঙ্গে ফরাসি ভাষায় কথা বলতেন এবং ফ্রান্সে বেড়াতে যেতেন। সতীর্থদের সঙ্গে তিনি ফরাসিতেই কথা বলেন। প্রচারবিমুখ হওয়ার কারণে সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য ইংরেজিতেই কথা বলে থাকেন।

তবে ওলিসে গত এক বছর ধরে যে স্বপ্নের ফুটবল খেলছেন, তাতে চাইলেও তার পক্ষে প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়। বিশ্বকাপে এসেছেন বুন্দেসলিগার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়ে। গত মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২২ গোলের পাশাপাশি করেছেন অবিশ্বাস্য ৩১টি অ্যাসিস্ট!

বায়ার্নে ওলিসে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় খেলেন। ইনভার্টেড উইঙ্গার হিসেবে সাধারণত ডান দিকে খেলেন। বাঁ পা শক্তিশালী হওয়ায় এই জায়গা থেকে তিনি সহজেই দূর থেকে শট নিতে পারেন বা কেইনের মত স্ট্রাইকারদের উদ্দেশে নিখুঁত থ্রু-পাস বাড়াতে পারেন।

ওয়ান-ভি-ওয়ান পজিশনে ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলে বক্সের ভেতরে কাট-ইন করার অসাধারণ দক্ষতার কারণে ওলিসের সঙ্গে বায়ার্ন কিংবদন্তি আরিয়েন রোবেনের সঙ্গে তুলনা প্রায়ই চলে আসে।

মিডফিল্ড ও আক্রমণের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার পাশাপাশি দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ওলিসে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ‘নাম্বার ১০’ ভূমিকাতেও খেলতে পারেন।

বিশ্বকাপেও তাকে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ে দেশঁ ব্যবহার করছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেই। এই কাজটা তিনি এতটাই নিখুঁতভাবে করছেন যে, আঁতোয়ান গ্রিজমানের মতো একজনের অভাব একেবারেই টের পাচ্ছে না ফ্রান্স। একের পর এক অ্যাসিস্টের পাশাপাশি এমবাপ্পে ও দেম্বেলেকে নিয়ে ওলিসে গড়ে তুলেছেন ভয়ংকর এক আক্রমণভাগ।

২০২১ সালেও ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা ওলিসে তাই পাঁচ বছরের মধ্যে হয়েছেন সময়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। জাতীয় দলে ফ্রান্সকে বেছে নেওয়ার পেছনে এটাও রেখেছে বড় ভূমিকা। তার কাছে মনে হয়েছিল, সাফল্যের সম্ভাবনা ইংল্যান্ডের চেয়ে ফ্রান্সেই বেশি তার।

তাছাড়া এমবাপে, দেম্বেলে, ব্রাডলি বারকোলা ও দেজিরে দুয়ের মতো খেলোয়াড়দের পেছনে খেলার লোভ কোন প্লেমেকারই বা সামলাতে পারবে? একসঙ্গে খেলার সুবাদে ওলিসে যেমন তাদের আরও ভালো করে তুলছেন, তেমনই তারাও তাকে আরও উজ্জ্বল করছেন। বায়ার্নে কেইন ও লুইস দিয়াসের মতো তারকাদের পাশে খেলেও তিনি ঠিক একইভাবে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

তবে বায়ার্নের মত বিশ্বকাপে ফ্রান্স দলেও ওলিস লাইমলাইটে নেই। এই জায়গাটা বরাদ্দ অধিনায়ক এমবাপ্পের জন্যই, যিনি এরই মধ্যে ৮ গোল করে টানা দ্বিতীয় গোল্ডেন বুটের জন্য লড়ছেন। ‘মিস্টার ননশ্যালান্ট’ ওলিসের জন্য অবশ্য এটাই ভালো। সবাই এমবাপ্পেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন, আর তিনি ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানোর লক্ষ্যে আড়ালে থেকে করে যাবেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা।

চুপচাপ স্বভাবের ওলিসে মাঠে নামলে তাই হয়ে যান সবচেয়ে ব্যস্ত খেলোয়াড়দের একজন। বল পায়ে এলেই যিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভাঙন ধরান নিখুঁত সব অ্যাসিস্ট দিয়ে। একটা দলে এমন নিবেদিত ফুটবলার পাওয়া তাই ভাগ্যের ব্যাপার।

ওলিসের মাঠের বাইরের উদাসীনতা দিয়ে তাই তাকে বিচার করলে বড্ড ভুলই করা হবে। সেটা হচ্ছে না বলেই তার জার্সির চাহিদা এতটাই বেড়ে গেছে যে, তা যোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রস্তুতকারীদের। ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতলে সম্ভবত তিনিই হয়ে যাবেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়।

ওলিসে কি তখনও চুপচাপ থাকতে পারবেন? তখনও কি ‘কাইজেন’-এর সেই ট্যাটুটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বলবেন, আরও ভালো করতে হবে?

সম্পর্কিত