ads

জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম কি সোনার পাথরবাটি?

জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম কি সোনার পাথরবাটি?
কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ফাইল ছবি: চরচা

চীনের দুঃখ বলা হয় হোয়াংহো নদীকে, আর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মূল দুঃখের জায়গা বৃষ্টি। কারণ বৃষ্টি এলেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। দেশের অথর্নীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামে এ সংকট চলছে কয়েক দশক ধরেই। সরকার আসে, সরকার যায় কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীর মুক্তি মেলে না।

জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প হাতে নিলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রতি বছর বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম শহরের নিম্নাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে ডুবে যায়। আর একটু ভারী বৃষ্টি হলে স্থানভেদে বুকসমান পানি জমে। এটাই যেন চট্টগ্রামের নিয়তি।

জলাবদ্ধতা মানেই নগরের মানুষের জীবন-জীবিকা থমকে যাওয়া। ঘরবাড়ি ডুবে গিয়ে চরম দুর্ভোগে দিনযাপন করা। ক্ষেত্র বিশেষে পানিতে ডুবে ও দেয়াল ধসে নগরীতে মানুষের জীবনহানির ঘটনাও ঘটছে। তৈরি হয় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শুরুতে নগরীর নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় গত সোম ও মঙ্গলবার জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করে। নগরীর অর্ধেকেরও বেশি এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (সিডিএ) বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি সরাতে কাজ শুরু করেন।

বৃষ্টি বেশি হলেই ডুবে যায় চট্টগ্রাম নগরীর বেশিরভাগ এলাকা। ছবি: চরচা
বৃষ্টি বেশি হলেই ডুবে যায় চট্টগ্রাম নগরীর বেশিরভাগ এলাকা। ছবি: চরচা

নগরীর তীব্র জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর অধীনে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা শেষের পথে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরও সীমাহীন এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলছে না কেনো তা নিয়ে প্রশ্ন নগরবাসীর।

পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব ও নাগরিক সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে জলাবদ্ধতার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েও সুফল মিলছে না। সেবা সংস্থাগুলোর প্রধানদের বক্তব্যে অতীতে তাদের সমন্বয়হীনতার কথাও উঠে এসেছে।

২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে টানা ভারী বৃষ্টিতে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। পাহাড়, দেয়ালধস ও পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে ১২৭ জন মারা যান। বিশেষ করে ওই সময় থেকে নগরীর তীব্র জলাবদ্ধতার বিষয়টি সারা দেশের মানুষের সামনে উঠে আসে।

প্রতি বছরই এই দুর্ভোগে পড়তে হয় বন্দরনগরীর বাসিন্দাদের। বর্ষার মওসুম এলেই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন খাল, নালা, ড্রেন পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম করে জলাবদ্ধতা কমানোর কাজ শুরু করে। কিন্তু কয়েক দিন টানা বৃষ্টি হলেই সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

এক দশক আগেও জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন দিকে বয়ে চলা খাল ছোট হওয়া, অবৈধভাবে দখল, নিয়মিত নালা পরিষ্কার না করা এবং নালায় গৃহস্থালী বর্জ্যকে দায়ী করা হতো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে বাদ দিয়ে সিডিএকে দেওয়া এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরে জুন মাসে। প্রকল্প সিডিএর হলেও এর পূর্ত কাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনির্য়াস কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।

এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে নগরীর বিভিন্ন অংশে বয়ে যাওয়া ৩৬টি খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বড় করা এবং রিটেইনিং ওয়াল তৈরি, খনন, ব্রিজ ও কালর্ভাট নির্মাণ, সিল ট্রাপ ও স্লুইস গেট বসানো হয়। গত এপ্রিলে দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, প্রকল্পটির ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

কিন্তু গত ২৮ এপ্রিল হঠাৎ বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা ডুবে গিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং জনজীবন বির্পযস্ত হয়ে পড়ে। সেসময় জলাবদ্ধতার জন্য হঠাৎ বৃষ্টিকে দায়ী করা হলেও পরবতীতে পানি নামানোর জন্য বিভিন্ন খালের বাঁধ খুলে দেওয়া হয়।

জলাবদ্ধতা নিরসনের যে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন চলছে তার সুফল গত কয়েক বছরে কিছুটা মিললেও এবারের বর্ষায় অতিবৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়নি। শুরুর দিকে নগরীতে জলমগ্ন এলাকা কম থাকলেও বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার পর থেকে বিভিন্ন অঞ্চল যুক্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম শহরের নিচু এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন তৈরি, বৃষ্টির সাথে কণর্ফুলী নদীর জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়া, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত স্লুইস গেইটের রেগুলেটর বন্ধ রাখা, বাকি খাল ও নালার সংস্কার কাজে হাত না দেওয়া, নগরীর কোন এলাকায় নালা রাস্তা থেকে উঁচুতে হওয়া এবং নগরীর গৃহস্থালী বর্জ্য নালা বা খালে পেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

একজন নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, বিভিন্ন সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য উদ্যোগ নিলেও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাই জলাবদ্ধতা না কমার মূল কারণ। সিটি করপোরেশন যে কাজ করার কথা সেটা সিডিএকে দিয়ে করানো হচ্ছে। এছাড়া নগরীতে ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী জলাধার নির্মাণ করতে হবে। প্রকল্পের বাইরে থাকা খাল ও নালাগুলো খনন করে অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে। একইসাথে বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নগরবাসীকে সচেতন করতে হবে। কোনোভাবেই গৃহস্থালী বর্জ্য যাতে নালা বা খালে ফেলা না হয়।

পূর্ত কাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক মহসিনুল হক চৌধুরী কয়েক দিন আগে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, প্রকল্পের মধ্যে ৩০টি খালের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, বাকি পাঁচ খালের প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং হিজড়া খালের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। মে মাসের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্য থাকলেও বৃষ্টি এবারে আগে শুরু হওয়ায় সম্ভব হয়নি। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। তখন প্রকল্পের সুফল মিলবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলি বেলায়েত হোসেন বলেন, “এবারে বৃষ্টির তীব্রতা অনেক বেশি ছিল। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সুফল না মিললে এবারে চট্টগ্রামের সড়কে গাড়ির বদলে নৌকা চলত। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগের সরকারের অবহলো ছিল বলে জলাবদ্ধতা এ পর্যায়ে এসেছে। তাদের আমলে সিটি করপোরেশন, সিডিএসহ বিভিন্ন সংস্থর মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। সে কারণে করপোরেশনের বদলে সিডিএকে এ প্রকল্প দিয়েছে। এখন আমাদের মধ্যে কোন সমস্যা নাই। আমরা নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে একসাথে কাজ করছি। প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে, পরিকল্পিত কাজের মধ্য দিয়ে দ্রুতই এর সফলতা আসবে।”

প্রতিবছরই অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে নাগরিক দুর্ভোগের পর সরকারি সংস্থাগুলো একে অপরের সাথে সমন্বয়হীনতার দায় চাপান। ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতামুক্ত বন্দরনগরীর স্বপ্ন দেখান। কিন্তু বর্ষা আসলে বা অতিবৃষ্টি হলেই চট্টগ্রাম মহানগরী ডোবে পানিতে। পাহাড়-নদী-সমুদ্রবেষ্টিত মনোরম এই নগরী জলাবদ্ধতামুক্ত হওয়া কি অধরাই থেকে যাবে?

সম্পর্কিত