তাসীন মল্লিক

সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। তারা বলছেন, ‘সংশোধন’ নয়, বরং ‘সংস্কার পরিষদ’ গঠনের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
তবে বিরোধী দলের এই অবস্থান নতুন নয়; বরং বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। ২০১০ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নের সময় তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিও একইভাবে বিশেষ কমিটিতে অংশ নেয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সংবিধান প্রশ্নে জামায়াত কি এখন বিএনপির সেই পথেই হাঁটছে, নাকি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কৌশল গ্রহণ করছে?
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম গতকাল সোমবার ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। যেখানে বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা বলা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন খালি রাখা হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, তবে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে। এই অনুপস্থিতি কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ-সংবিধান ‘সংশোধন’ বনাম ‘সংস্কার’।
পঞ্চদশ সংশোধনীর বিশেষ কমিটি
২০১০ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন জাতীয় সংসদে ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সংসদ উপনেতা প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
এই কমিটিতে তখনকার বিরোধী দল বিএনপিকে সদস্য দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়। তবে তারা তাতে সাড়া দেয়নি। কমিটির কাজ ছিল সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ দেওয়া। প্রায় এক বছরের কার্যক্রমে তারা ২৬টি বৈঠক করে এবং ২০১১ সালের ৮ জুন ৫১ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল–তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত। প্রথম দিকে কমিটির আলোচনায় এই ব্যবস্থাকে সংস্কারের মাধ্যমে রাখার প্রস্তাব আসে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের সংক্ষিপ্ত রায়ের পরও একটি খসড়ায় এটি বহাল রাখার সুপারিশ ছিল, যদিও মেয়াদ ৯০ দিনে সীমিত করার মতো পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর কমিটি আর কোনো বৈঠক না করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে।

এরপর সংসদে বিল উত্থাপন, স্থায়ী কমিটির অনুমোদন এবং বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে বিল পাস হয়। ৩০ জুন সংসদে পাস হওয়া এই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে ভোট দেন উপস্থিত সংসদ সদস্যরা, একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তখনো সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে, বিশেষ কমিটি বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে। অধিকাংশ মতামত ছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে, বাতিলের নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে–বিশেষ কমিটি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধীনে থাকলে তা ভিন্নমতকে প্রতিফলিত করতে পারে না।
সংস্কার পরিষদ বনাম বিশেষ কমিটি
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সংস্কার পরিষদ’ বনাম ‘বিশেষ কমিটি’–এই দুটি ভিন্ন পদ্ধতির দ্বন্দ্ব।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক সংস্কার নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। ফলে দলটি আংশিক সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট এই প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তাদের মতে, এটি কেবল সংশোধন নয়, একটি কাঠামোগত ‘সংস্কার’, যা নতুন রাজনৈতিক চুক্তির প্রতিফলন।
এই প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়। সেই অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোটভুক্ত সদস্যরা এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় তা গঠিত হয়নি। ফলে আইনি ও রাজনৈতিক এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেই কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সংসদে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ আসনের অনুপাতে তাদের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হয়েছে।
কিন্তু বিরোধী দলের আপত্তি মূলত কাঠামোগত। তাদের বক্তব্য, বিশেষ কমিটি গঠন করে সংস্কার পরিষদকে পাশ কাটিয়ে করা হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা গণভোটের রায়ের প্রতি ওয়াদাবদ্ধ এবং সংস্কার পরিষদের বাইরে কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না।
জামায়াত আমির বলেন, জনগণের অভিপ্রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থান থেকেই তারা সংসদে ওয়াকআউট করে।
রাজনৈতিক কৌশল নাকি নীতিগত অবস্থান?
এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্নটি হলো–জামায়াতের বর্তমান অবস্থান কি কেবল রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এটি একটি নীতিগত অবস্থান?
বিএনপির ২০১০ সালের অবস্থান ছিল মূলত একটি প্রতিবাদ। তারা মনে করেছিল কমিটি প্রক্রিয়া তাদের মতামত প্রতিফলিত করবে না। বর্তমানেও বিরোধী দলের একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তখন কোনো গণভোট বা পূর্বনির্ধারিত জাতীয় সনদ ছিল না। কিন্তু এখন জুলাই সনদের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং গণভোটের ম্যান্ডেট রয়েছে। ফলে জামায়াতের অবস্থান কেবল বর্জন নয়; বরং বিকল্প প্রক্রিয়ার দাবি।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান কিছুটা দ্বৈত। তারা সংশোধনের পক্ষে থাকলেও জুলাই সনদের সব প্রস্তাব মানতে রাজি নয়। ফলে তারা বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সময় নিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের অবস্থানকে বিএনপির অতীত অবস্থানের পুনরাবৃত্তি বলা গেলেও তা পুরোপুরি এক নয়। বরং এটি একটি বিবর্তিত রূপ, যেখানে ‘সংস্কার পরিষদ’ একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে সামনে এসেছে।

নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের শপথ নেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংসদীয় রাজনীতির বিশ্লেষক কে এম মহিউদ্দিন চরচাকে বলেন, “বিএনপির অবস্থান ছিল বিদ্যমান সংসদের অধীনেই সংবিধান সংস্কার করা, আর জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্যদের দাবি ছিল গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে একটি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “এই প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণভোটের প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আগে থেকেই ব্যাপক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে–সরকারি ও বিরোধী শিবিরে। এখন যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে পাঁচটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনের সময়ও এমন হয়েছিল। তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দলে ছিল বিএনপি; এখন উল্টো পরিস্থিতি–বিএনপি ক্ষমতায়, আর বিরোধী দলে জামায়াতে ইসলামী। ফলে এটাকে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বলা যায়।”
এই গবেষক আরও বলেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো–জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব। আর দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, সংবিধান সংস্কারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় যদি জামায়াতে ইসলামী অংশ না নেয়, তাতে প্রক্রিয়াগতভাবে কোনো সমস্যা হবে না; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করবে। কারণ সরকার ও বিরোধী দল যদি ঐকমত্যে না পৌঁছায়, তাহলে যে সংস্কারই করা হোক, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।”
বিরোধী দলকে আলোচনায় আনা বিএনপির দায়িত্ব উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, “পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর সেটিকে পুনর্বহালের প্রশ্ন এসেছে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে। এখন এটিকে কীভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে–তা নির্ধারণ করতে সরকার ও বিরোধী দলকে আলোচনায় বসতেই হবে।”
কে এম মহিউদ্দিন বলেন, “জামায়াতে ইসলামী যদি বিএনপির মতো অবস্থান নেয়–যেমনটি বিএনপি পঞ্চদশ সংশোধনের সময় নিয়েছিল–তাহলে সেটি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ সেই সময় বিএনপির একটি শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান এবং নৈতিক ভিত্তি ছিল। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে সেটি একইভাবে আছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। বিভিন্ন ইস্যুতে জনগণের মধ্যে জামায়াতকে নিয়ে ভিন্ন ধারণা রয়েছে, যা বিএনপির ক্ষেত্রে ততটা ছিল না।”
জাতীয় স্বার্থে জামায়াতে ইসলামীর ‘সমঝোতার পথে আসা’ উচিত বলেও মত দেন এই সংসদীয় রাজনীতির গবেষক।
সামনে কী?
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে এই অচলাবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে গঠিত হলেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে এর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে সংস্কার পরিষদ গঠনের আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় সেটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্যও রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক সংকটকে সামনে এনেছে–সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পরিবর্তন, নাকি অংশগ্রহণমূলক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার।
এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে, সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া আবারও রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। যেমনটি দেখা গিয়েছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়।
সেই প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক–জামায়াত কি বিএনপির পথে হাঁটছে, নাকি তারা নতুন এক রাজনৈতিক কাঠামোর দাবি তুলছে, যা ভবিষ্যতের সংবিধান সংস্কারের ধরন নির্ধারণ করবে?

সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। তারা বলছেন, ‘সংশোধন’ নয়, বরং ‘সংস্কার পরিষদ’ গঠনের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
তবে বিরোধী দলের এই অবস্থান নতুন নয়; বরং বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। ২০১০ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়নের সময় তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিও একইভাবে বিশেষ কমিটিতে অংশ নেয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সংবিধান প্রশ্নে জামায়াত কি এখন বিএনপির সেই পথেই হাঁটছে, নাকি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কৌশল গ্রহণ করছে?
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম গতকাল সোমবার ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। যেখানে বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা বলা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন খালি রাখা হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, তবে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে। এই অনুপস্থিতি কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ-সংবিধান ‘সংশোধন’ বনাম ‘সংস্কার’।
পঞ্চদশ সংশোধনীর বিশেষ কমিটি
২০১০ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন জাতীয় সংসদে ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সংসদ উপনেতা প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
এই কমিটিতে তখনকার বিরোধী দল বিএনপিকে সদস্য দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়। তবে তারা তাতে সাড়া দেয়নি। কমিটির কাজ ছিল সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ দেওয়া। প্রায় এক বছরের কার্যক্রমে তারা ২৬টি বৈঠক করে এবং ২০১১ সালের ৮ জুন ৫১ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল–তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত। প্রথম দিকে কমিটির আলোচনায় এই ব্যবস্থাকে সংস্কারের মাধ্যমে রাখার প্রস্তাব আসে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের সংক্ষিপ্ত রায়ের পরও একটি খসড়ায় এটি বহাল রাখার সুপারিশ ছিল, যদিও মেয়াদ ৯০ দিনে সীমিত করার মতো পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর কমিটি আর কোনো বৈঠক না করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে।

এরপর সংসদে বিল উত্থাপন, স্থায়ী কমিটির অনুমোদন এবং বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে বিল পাস হয়। ৩০ জুন সংসদে পাস হওয়া এই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে ভোট দেন উপস্থিত সংসদ সদস্যরা, একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তখনো সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে, বিশেষ কমিটি বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে। অধিকাংশ মতামত ছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে, বাতিলের নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে–বিশেষ কমিটি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধীনে থাকলে তা ভিন্নমতকে প্রতিফলিত করতে পারে না।
সংস্কার পরিষদ বনাম বিশেষ কমিটি
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সংস্কার পরিষদ’ বনাম ‘বিশেষ কমিটি’–এই দুটি ভিন্ন পদ্ধতির দ্বন্দ্ব।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক সংস্কার নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। ফলে দলটি আংশিক সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট এই প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তাদের মতে, এটি কেবল সংশোধন নয়, একটি কাঠামোগত ‘সংস্কার’, যা নতুন রাজনৈতিক চুক্তির প্রতিফলন।
এই প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়। সেই অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোটভুক্ত সদস্যরা এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় তা গঠিত হয়নি। ফলে আইনি ও রাজনৈতিক এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেই কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সংসদে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ আসনের অনুপাতে তাদের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হয়েছে।
কিন্তু বিরোধী দলের আপত্তি মূলত কাঠামোগত। তাদের বক্তব্য, বিশেষ কমিটি গঠন করে সংস্কার পরিষদকে পাশ কাটিয়ে করা হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা গণভোটের রায়ের প্রতি ওয়াদাবদ্ধ এবং সংস্কার পরিষদের বাইরে কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না।
জামায়াত আমির বলেন, জনগণের অভিপ্রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থান থেকেই তারা সংসদে ওয়াকআউট করে।
রাজনৈতিক কৌশল নাকি নীতিগত অবস্থান?
এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্নটি হলো–জামায়াতের বর্তমান অবস্থান কি কেবল রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এটি একটি নীতিগত অবস্থান?
বিএনপির ২০১০ সালের অবস্থান ছিল মূলত একটি প্রতিবাদ। তারা মনে করেছিল কমিটি প্রক্রিয়া তাদের মতামত প্রতিফলিত করবে না। বর্তমানেও বিরোধী দলের একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তখন কোনো গণভোট বা পূর্বনির্ধারিত জাতীয় সনদ ছিল না। কিন্তু এখন জুলাই সনদের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং গণভোটের ম্যান্ডেট রয়েছে। ফলে জামায়াতের অবস্থান কেবল বর্জন নয়; বরং বিকল্প প্রক্রিয়ার দাবি।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান কিছুটা দ্বৈত। তারা সংশোধনের পক্ষে থাকলেও জুলাই সনদের সব প্রস্তাব মানতে রাজি নয়। ফলে তারা বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সময় নিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের অবস্থানকে বিএনপির অতীত অবস্থানের পুনরাবৃত্তি বলা গেলেও তা পুরোপুরি এক নয়। বরং এটি একটি বিবর্তিত রূপ, যেখানে ‘সংস্কার পরিষদ’ একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে সামনে এসেছে।

নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের শপথ নেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংসদীয় রাজনীতির বিশ্লেষক কে এম মহিউদ্দিন চরচাকে বলেন, “বিএনপির অবস্থান ছিল বিদ্যমান সংসদের অধীনেই সংবিধান সংস্কার করা, আর জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্যদের দাবি ছিল গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে একটি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “এই প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণভোটের প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আগে থেকেই ব্যাপক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে–সরকারি ও বিরোধী শিবিরে। এখন যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে পাঁচটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনের সময়ও এমন হয়েছিল। তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দলে ছিল বিএনপি; এখন উল্টো পরিস্থিতি–বিএনপি ক্ষমতায়, আর বিরোধী দলে জামায়াতে ইসলামী। ফলে এটাকে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বলা যায়।”
এই গবেষক আরও বলেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো–জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব। আর দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, সংবিধান সংস্কারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় যদি জামায়াতে ইসলামী অংশ না নেয়, তাতে প্রক্রিয়াগতভাবে কোনো সমস্যা হবে না; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করবে। কারণ সরকার ও বিরোধী দল যদি ঐকমত্যে না পৌঁছায়, তাহলে যে সংস্কারই করা হোক, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।”
বিরোধী দলকে আলোচনায় আনা বিএনপির দায়িত্ব উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, “পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর সেটিকে পুনর্বহালের প্রশ্ন এসেছে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে। এখন এটিকে কীভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে–তা নির্ধারণ করতে সরকার ও বিরোধী দলকে আলোচনায় বসতেই হবে।”
কে এম মহিউদ্দিন বলেন, “জামায়াতে ইসলামী যদি বিএনপির মতো অবস্থান নেয়–যেমনটি বিএনপি পঞ্চদশ সংশোধনের সময় নিয়েছিল–তাহলে সেটি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ সেই সময় বিএনপির একটি শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান এবং নৈতিক ভিত্তি ছিল। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে সেটি একইভাবে আছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। বিভিন্ন ইস্যুতে জনগণের মধ্যে জামায়াতকে নিয়ে ভিন্ন ধারণা রয়েছে, যা বিএনপির ক্ষেত্রে ততটা ছিল না।”
জাতীয় স্বার্থে জামায়াতে ইসলামীর ‘সমঝোতার পথে আসা’ উচিত বলেও মত দেন এই সংসদীয় রাজনীতির গবেষক।
সামনে কী?
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে এই অচলাবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে গঠিত হলেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে এর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে সংস্কার পরিষদ গঠনের আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় সেটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্যও রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক সংকটকে সামনে এনেছে–সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পরিবর্তন, নাকি অংশগ্রহণমূলক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার।
এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে, সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া আবারও রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। যেমনটি দেখা গিয়েছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়।
সেই প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক–জামায়াত কি বিএনপির পথে হাঁটছে, নাকি তারা নতুন এক রাজনৈতিক কাঠামোর দাবি তুলছে, যা ভবিষ্যতের সংবিধান সংস্কারের ধরন নির্ধারণ করবে?

শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি বলেন, “আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক"