প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথের পর প্রথম চট্টগ্রাম সফর করলেন তারেক রহমান। দিনভর মহেশখালীর মাতারবাড়ী, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে বিভিন্ন কর্মসূচি শেষ করে রাতে বৈঠক করেন তৃণমূলের বাছাই করা নেতাদের সঙ্গে। সব ছাপিয়ে বৈঠকের মূল আলোচনায় চলে আসে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে নেতা-কর্মীদের নানা নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। পাশাপাশি দলের ভেতর সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
চলতি বছরের অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর কথা জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপির চাওয়া, আগামী বছরের শুরুতে এই নির্বাচন হোক। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এমন কথা। তিনি বলেন, আগামী বছরের শুরুর দিকেই ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ভেতরে চলা নানা ‘কোন্দলের’ খবরের মধ্যেই তারেক রহমান চট্টগ্রামের নেতাদের কাছে দলীয় ঐক্যের কথা বলেছেন। পাশাপাশি নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থনের জন্য স্থানীয় নেতাদের ‘ওয়াদা’ও করিয়েছেন।
তারেক রহমান নগরের পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে গতকাল রোববার রাতে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জেলা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অন্তত সাতটি স্তরের প্রায় ৭০০ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক বিএনপি নেতা জানান, তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে দলের নেতারা উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত। তিনি সাংগঠনিক কাজের বিষয়ে নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা ছাড়াও চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত করা এবং দলীয় নেতাদের সততার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারের অংশ হিসেবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম এসেছিলেন তারেক রহমান। নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে তখন তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে বসার সুযোগ হয়নি। তবে এবার চট্টগ্রামে এসে সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর বলেন, ‘‘সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচনে দল যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে অর্থাৎ একক প্রার্থীর সমর্থনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন তারেক রহমান। চট্টগ্রামে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে শক্তিশালী করতে কাজ করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।’’
গতকাল রোববার চট্টগ্রামে নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের সভা। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে নেওয়া
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ‘‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকবেন। কিন্তু দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পাশেই সবাইকে থাকার ওয়াদা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণের কাছে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। আর এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্যই নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।’’
গতকাল রোববার সকালে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকা ও কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। এরপর তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে তিনি ১০০টি অসচ্ছল পরিবারকে নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর করেন।
বাঁশখালী থেকে হেলিকপ্টারে করে তিনি ফটিকছড়ি উপজেলায় যান। সেখানে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোয়া চান। পরে হাটহাজারী উপজেলায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করেন। বিকেলে হাটহাজারী কলেজ মাঠে এক জনসভায় অংশ নেন তিনি।
দিনভর ব্যস্ত সময় পার করে রাতে চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি নেতা নাজিমুর রহমান বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী দিনভর ব্যস্ত সময় পার করার পরও আমাদের সঙ্গে সভা করে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হওয়ার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেছেন এবং ধীরে ধীরে তা দৃশ্যমান হবে বলে জানান। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকের পর তৃণমূলের নেতারা বেশ চাঙ্গা ও উচ্ছ্বসিত।’’
সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর বলেন, ‘‘বিএনপি করতে হলে নেতাদের সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে—এ কথা প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন। দেশের সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকটের কথাও তিনি সভায় তুলে ধরেন। বিগত সরকারের অপরিকল্পিত প্রকল্পের কারণেই এখন জনগণকে বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতে হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে সংকট নিরসনে সরকার ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’’
সভায় বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে সভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনসহ বিএনপির স্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।