এই দেশে মানুষ মোটা দাগে দুই ধরনের। একটি হলো ‘সাধারণ’, অন্যটি হলো ‘অসাধারণ’। কে সাধারণ বা অসাধারণ এবং কেন, সেই ব্যাখ্যায় যাওয়া হবে শিগগিরই। তবে তার আগে জানানো যাক যে, শিরোনামে যে ‘শান্তি’র খোঁজ করা হয়েছে, তা আদতে এই সাধারণদের হিসাব থেকেই বলা। সাধারণদেরই একটু শান্তি দরকার। সেই প্রয়োজনের কথা আর কাকে বলা যায়, সরকার ছাড়া?
এবার সাধারণ ও অসাধারণের ব্যাখ্যায় যাওয়া যাক। এই দেশের ‘অসাধারণ’ মানুষ তারাই, যাদের কোনো না কোনো যোগাযোগ আছে ক্ষমতার সাথে। হয় তারা রাজনীতি করেন, নাহলে সরকারি উচ্চ পদে চাকরি করেন, অথবা তাদের ভালো ব্যবসা–বাণিজ্য আছে, কিংবা সমাজ ও দেশে প্রতিষ্ঠিত একপ্রকারে। এক কথায়, তারা এই দেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাকাঠামোর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। ক্ষমতার ব্যবহারও করে হয়তো কেউ কেউ। কারও ক্ষেত্রে হয়তো ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্টতার পরিচয়টিই তাকে এক ধরনের সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে দেয়।
পার্থক্যের কথা সোজাসাপ্টা বললে, ‘সাধারণ’ মানুষেরা এর ঠিক উল্টোটা। অর্থাৎ, এরা হলো আমজনতা। এদের সংখ্যাটাই এ দেশে সবচেয়ে বেশি। সংখ্যাগুরু হলেও, এরাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণায় থাকে। কারণ সব দুর্ভোগ যে তাদের ঘাড়েই চাপে! তাই তাদের জীবনেই শান্তির অভাব সবচেয়ে বেশি হয়।
ট্র্যাজেডি হলো, বাংলাদেশের এসব সাধারণের, যাদের জীবনে ‘নাই, নাই’ সবচেয়ে বেশি, তাদের জীবনে অন্ততপক্ষে কিছুটা স্বস্তি ও শান্তির প্রয়োজন প্রকট থাকে। অনেক ‘নাই’ তারা ভুলে থাকে ওই কিছুটা স্বস্তি ও শান্তির অনুভবে। আর এখন সেটা নিয়েও ব্যাপক টানাটানি।
প্রশ্ন আসে, কেন শান্তি অনুভূত হচ্ছে না? এই দেশে নানা পক্ষের ও মতের মানুষ থাকে। সেইসবের মধ্যে একটি মিল হলো, সব পক্ষেই ‘তাল গাছ’ শুধুই নিজের করে নেওয়ার মানসিকতার প্রবল বিস্তার। অন্তত সিংহভাগ মানুষ এমনই হয়ে গেছে কেন জানি। ফলে সরকারপক্ষীয় লোকজন অন্তত শান্তির অভাবকে বাঁকা চোখে দেখতেই পারে।
তবে অশান্তির কারণগুলো অলীক নয়। সুখে থাকলে অন্তত এই দেশের সাধারণ মানুষদের ভূতে কিলায় না। সুখ, শান্তি মিলেই তো কম। তখন সাধারণত দুঃখবিলাস করার অভ্যাস এই সাধারণদের থাকে না। চলুন, সাধারণ মানুষের এই অশান্তির কারণগুলো একটু বোঝা যাক।
এসব কারণের মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বেশি। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোথাও একবার গেলে ফিরতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। রাজধানীর বাইরে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কখনো কখনো দেশের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকছে। যেগুলো চালু থাকছে, সেগুলোর অধিকাংশও চলছে সক্ষমতার অনেক নিচে। এর সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তীব্র গরমের মধ্যে এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
সাধারণ মানুষ গ্যাসের ও বিদ্যুতের অভাবে ভুগছে। কারও ঘরে চুলা জ্বলছে না। আবার বিদ্যুৎ ছাড়া এখনকার জীবন কল্পনা করাও কঠিন। গ্যাসের অভাবে অনেকেই বিকল্প চুলা হিসেবে ইনডাকশন ও ইনফ্রারেডে ঝুঁকছে। তাতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। তবে সেখানেও আছে ভোগান্তির দুষ্টচক্র, কারণ ওইসব চুলাও তো বিদ্যুতেই চলে। আবার গ্যাস, বিদ্যুৎ না পেলেও বিল দিতে হচ্ছে, কখনো কখনো দিতে হচ্ছে বাড়তি বিলও। ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ভোগান্তি হয়ে গেছে এখন মিথজাত প্রাণি হাইড্রার মাথাগুলোর মতো। একটা কাটলেই একাধিক গজাচ্ছে!
সেরকম গজানো আরেকটি মাথা হলো জ্বালানি সংকট। কিছুদিন পর পরই ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সেসব নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। এটি সংবাদমাধ্যমগুলোর একটা নিয়মিত নিউজ আইটেমে পরিণত হয়েছে যেন। এবং এমন সংকটের কারণে আরও নানামাত্রিক সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও যাতায়াতে কষ্ট হচ্ছে, তো কখনো সাধারণের পকেট কাটছে। এমন পরিস্থিতিতে আর যাই হোক, মনে শান্তি থাকার কোনো কারণ নেই।
আবার বাজারের মেজাজও চড়া। জিনিসপত্রের দাম দারুণভাবে কমে গেছে—এমনটা বলার জো নেই। আর যেটার দাম বাড়ছে, সেটার কমে আসার উদাহরণ তো এই দেশটায় কখনোই দেখা যায় না। অন্তত বাজারে গিয়ে নিত্যপণ্যের দাম যৌক্তিকভাবে কমে আসার কথা খুব একটা শোনা যায় না। এই তো গতকালও বাজারে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার তথ্য জানা গেল দোকানদার মারফত। শেষে ওই পণ্যটি আর কেনাও হলো না, কারণ অন্য সবার মতো এই অতিসাধারণ লেখকও যতটা সম্ভব রেশনিং করার মনোভাবে চলে গেছেন।
দেশের বাজারের মেজাজও চড়া। ফাইল ছবি
না গিয়ে আর উপায়ই–বা কি? খরচ বাড়লেও, আয় যে খুব একটা বাড়েনি কারোরই। দেশে মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতিতে বেশির ভাগের অবস্থাই জেরবার। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, টানা সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়েনি। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের এখন টানাটানির সংসার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। ফলে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
সব ধরনের টানাটানির মধ্যে নতুন করে আবার টানাটানি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের জান নিয়ে। না, না, জানের ভাবগত সংজ্ঞায় আমরা যাচ্ছি না। ওপরের ঘটনাগুলোতেও সাধারণের প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার মতো অবস্থা বটে। তবে যখন আক্ষরিক অর্থেই জানের ভয় ঢুকে যায় মনে, তখন এসব সংকট সংক্রান্ত অনুভূতি কিছুটা ভোতা হয়েও আসে। ওই অনেকটা বিষে বিষক্ষয় হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তেমনটাই হচ্ছে দেশে একের পর এক খুন হওয়ায়। শুধু বিচ্ছিন্ন খুনই নয়, একেবারে সিরিজ খুনের ঘটনা ঘটছে, পরিবারসুদ্ধ নৃশংস হত্যার শিকার হয়ে মরে পড়ে থাকছে মানুষ।
শুধু খুন নয়, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই খারাপ। নতুন সরকার এসেছে ৬ মাস হয়েছে, তবু অপরাধের চিত্র ঊর্ধ্বমুখীই আছে। কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে সারা দেশে খুনের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি। সে হিসাবে খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। এই শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ৩১৭টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ২৭৫টি। অর্থাৎ বেড়েছে ৪২টি। অন্যদিকে ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ এবং চুরির মামলা আগের ছয় মাসের তুলনায় সম্মিলিতভাবে ৫৯৮টি কমেছে। এই চার শ্রেণিতে গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ৮ হাজার ৪৮৫টি, আগের ছয় মাসে হয়েছিল ৯ হাজার ৮৩টি। সমস্যা হলো, এত হাজার হাজারের ভিড়ে কয়েকশ কমলে তা আসলে কমে যাওয়ার অনুভূতি হিসেবে খুব একটা জোরালো হয় না। তাই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিও কমছে না কোনোভাবেই। কারণ এগুলো তো শুধু নথিবদ্ধ ঘটনা। নথির বাইরে আরও কত কিছুই তো থাকে। সেসব হিসাবে নিলে অবস্থা বেগতিকই বলতে হবে।
আর যখন জানের ভয়ই কমে না, তখন মনে শান্তি আর বাড়বে কীভাবে? স্বস্তি আসবে কোথা থেকে? তাই হাজারো সমস্যার ভিড়ে এই দেশের সাধারণ মানুষের মনে শান্তি আর ঘাঁটি গাড়তে পারে না। ঘরে শান্তি নাই, বাইরে বের হলেও নাই। একেবারে সাধারণ মানুষ প্রবল দুর্যোগে ঘরে সীমাবদ্ধ থেকেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে অনেক সময়। সেটি হলো একেবারে বেসিক আত্মরক্ষার কৌশল। এখন দেখা যাচ্ছে সেখানেও আপনার পরিবারের সবাইসহ মেরে ফেলা যায় অবলীলায়। তা, সাধারণ মানুষগুলো তবে শান্তিতে থাকবে কীভাবে?
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, গ্যাস, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তেল আমদানি করা গেলেও শান্তি আসলে আমদানি করা যায় না। এই দুনিয়ার কোথাও কেউ গ্যালনে গ্যালনে শান্তি বেচেও না। বেচলে হয়তো আকুতি জানানো যেত শান্তি আমদানির জন্য। সেটি যেহেতু হওয়ার নয়, তাই সাধারণ মানুষগুলোর সরকারের কাছে হাতজোড় করা ছাড়া উপায় নেই কোনো।
হাতজোড় করে মিনতি শুধু একটাই। হে সরকার, একটু শান্তি যে দরকার! দেবেন না একটুখানি শান্তি?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা