কিছু জামা-কাপড় লন্ড্রিতে দিতে হয়েছিল, ইস্ত্রি করতে। গিয়েই দেখা গেল লন্ড্রিতে ঝুলছে বড় আকারের সাইনবোর্ড। তাতে লেখা–‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতি পিছ ইস্ত্রি এখন থেকে ১২ টাকা, ধন্যবাদ…’।
হ্যাঁ, ধন্যবাদ দেওয়া হলো বটে। তবে ভোক্তা হিসেবে ঠিক উষ্ণতার সাথে সেই ধন্যবাদ গ্রহণ করা গেল না। কারণ, ভোক্তা হিসেবে ক্ষতি তো আসলে নিজের পকেটের। তাই ঠিক খুশি হওয়া গেল না। তবে দোকানদারের যুক্তির সঙ্গে একমত না হওয়ার উপায় নেই। কারণ, নাগরিকেরা নিজেরাই ভুক্তভোগী এখন। বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদেরই খরচ বেড়ে গেছে। লন্ড্রি চালানো ব্যবসায়ীর তো বাড়বেই। তাই ইস্ত্রি সেবার মূল্য ১০ টাকা থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে ১২ টাকায় চলে যাওয়াতে বিস্মিত হওয়ার উপায় নেই।
সাধারণ ভোক্তারা বিস্মিত আর হবেনই বা কীভাবে? নিজেরাই যেভাবে নিত্যনতুন বিস্ময় উপহার হিসেবে পাচ্ছেন বিদ্যুৎ বা গ্যাসের ছদ্মবেশে, তাতে দোকানির দেওয়া নতুন ঘোষণা আর ‘শকড’ করতে পারছে না। বিদ্যুৎ বা গ্যাস কীভাবে ভোক্তাদের ‘শক’ দিচ্ছে, তারই বিস্তারিততে ঢোকা যাক বরং।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং করছে। সেসব প্রতিবেদন বলছে, গত জুন মাসের শেষে দেশের অনেক ভোক্তা অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পেয়েছে। আগের মাসের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল হাতে এসেছে তাদের। অনেক গ্রাহকের জিজ্ঞাসা হলো, বাসায় নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র না লাগানো হলেও এবং নিয়মিত লোডশেডিং থাকার পরও কেন জুনের বিদ্যুৎ বিল কয়েক গুণ বাড়ল!
বিদ্যুৎ বিল বাড়তি আসার মাত্রা বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে যে, মে মাসেও যে গ্রাহকের ১ হাজার ৬০০ টাকার মতো বিল এসেছে, জুনে তা এক লাফে প্রায় ৭ হাজার টাকায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিদ্যুতের মিটার পরীক্ষা করে কোনো ত্রুটি পাওয়া না গেলেও ইউনিট দ্রুত বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বাড়তি বিলও দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও নাকি বিদ্যুৎ অফিস থেকে বলা হচ্ছে যে, সমস্যা পাওয়া গেলে পরে সমন্বয় করা হতে পারে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা পাঁচ কোটির মতো। এর বড় একটি অংশ এখনো পোস্টপেইড মিটার ব্যবহার করে। কিছু কিছু এলাকায় অবশ্য প্রিপেইড মিটারও চালু হয়েছে। এখন পোস্টপেইড গ্রাহকদের অনেকের অভিযোগ, বেশির ভাগ এলাকাতেই নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না।
কোথাও কোথাও দেওয়া হয় অনুমাননির্ভর বিল। আবার কোথাও একসঙ্গে কয়েক মাসের রিডিং যোগ করা হয়। মোদ্দা কথা, বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক হারে বেশি আসছে। প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যবহার না বাড়লেও আগের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি বিল দিতে হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, মাস শেষে স্ল্যাব পরিবর্তন না হয়েই আগের ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন উচ্চহারে বিল কাটা হচ্ছে। এভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে জুনের বিদ্যুৎ বিল কয়েক গুণ হওয়ার অভিযোগ আসছে।
শুধু জুন নয়, এক মাসের ব্যবধানে বিলের মাস ‘জুলাই’তে এসেও একই অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। প্রিপেইড কিংবা পোস্টপেইড–দুই শ্রেণির গ্রাহকই বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। খোদ রাজধানী ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, গাজীপুর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এই অভিযোগ আসছে।
বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে নারায়ণগঞ্জে গ্রাহক সমাবেশের খবর পাওয়া গেছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দল বেঁধে বিদ্যুৎ অফিসে গেছেন গ্রাহকরা। ওদিকে রাজশাহীতে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপি। আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় এমন অভিযোগ গত কিছুদিনে পাওয়া যাচ্ছে এন্তার।
শুধু বিদ্যুতই নয়। গ্যাস নিয়েও চলছে ‘এলাহী’ কারবার। ঢাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের দৈনন্দিন জীবনে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম গ্যাস সংকট। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না থাকার সুযোগ নিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তার পকেটে। অথচ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না পেয়েই দাম মেটাতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার চাওয়ার বা গ্যাস বিল মওকুফের বিধান থাকলেও সে বিষয়ে তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে কোনো ভাষ্য পাওয়া যাচ্ছে না। আইন অনুযায়ী, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়ার কথা থাকলেও মাসের পর মাস সেবা না পেয়েও বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসী, যা তৈরি করছে গভীর এক আইনি ও সামাজিক বৈষম্য। অথচ গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি সেবায় বৈষম্য বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো সমর্থন করে না।
একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস–এই দুই খাতের দুরবস্থাটি আদতে সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত করছে বেশি। প্রাথমিকভাবে, মানুষের যে সেবা পাওয়ার কথা, সেই সেবা পাচ্ছে না। এবং তার জন্য যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত, সেটির কোনো নামগন্ধই নেই। মাঝে মাঝে সরকারের অতি উচ্চপর্যায় থেকে ‘ক্ষমা’ চাওয়া হচ্ছে বটে। তবে সেই ‘ক্ষমা চাওয়া’ দিয়ে মানুষের পেটও ভরে না, ভোগান্তিতেও কোনো উপশম হয় না। সবচেয়ে চরম যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, সেটি হলো–যে সরকারের সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে থাকা বৈষম্য ও অবিচারের প্রতিবিধান করার কথা, দূর করার কথা, সেই সরকারি সংস্থার মাধ্যমেই আসলে মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে! আর ঠিক এই কারণেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে সাধারণ নাগরিকেরা বেশি অসহায় বোধ করছে। কারণ, যার কাছে নাগরিকদের আশ্রয় পাওয়ার কথা ছিল, সেই কর্তৃপক্ষই যদি নাগরিকের পকেট কেটে টাকা বের করে নিতে থাকে, তখন প্রতিকার চাওয়া হবে কোথায়?
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, সরকার কেন নাগরিকের পকেট কাটবে? আপত্তিও জানাতে পারেন। কথা হলো, যে গ্যাস পাওয়ার কথা, সেটি পাওয়া যাচ্ছে না। কবে পাওয়া যাবে, তাও ঠিকমতো জানা যাচ্ছে না। এর বদলে ফি হিসেবে উল্টো টাকা দিতে হচ্ছে। মনে হবে যেন, গ্যাস যে আসছে না, সেটি নিশ্চিত করার জন্যই হয়তো ফি হিসেবে নাগরিকদের টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে! তার চেয়েও বিয়োগান্তক বিষয় হলো–ভোক্তাদের যেখানে চক্ষুলজ্জার খাতিরেই বিল না নেওয়ার কথা বলা উচিত সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন কর্তৃপক্ষের, সেখানে সেটি তো হচ্ছেই না, উল্টো ভোক্তারা দাবি তুললেও সে ব্যাপারে রা করছে না কর্তৃপক্ষ।
এ তো গেল গ্যাসের আলাপ। ‘পকেট কাটা’ শব্দজোড়টি তাই এখানে খাটে কারণ, অনেকটা পকেটমারের মতোই এক্ষেত্রে আচরণ কর্তৃপক্ষের। আর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যা হচ্ছে, তা অনেকটা ছিনতাই বা রাহাজানির নামান্তর। কীভাবে ১৫০০/১৬০০ টাকার মাসিক বিল ব্যবহারের বৃদ্ধি না হতেই ৭ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়? এটা কার সহ্য হবে? এবং এ ধরনের ঘটনা কিন্তু নতুন নয়। প্রতি বছর জুন, জুলাই বা ডিসেম্বরে এমন ঘটনা ঘটে। এই দেশের বেশির ভাগ ভোক্তারই এমন ভোগান্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে। এদিকে যে অস্বাভাবিক বিল এসে যায়, সেটি না দিয়েও ভোক্তাদের উপায় থাকে না। কারণ, বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে এই একবিংশ শতকে। অভিযোগ দিয়েও কাজ খুব একটা হয় না। উল্টো বিল বকেয়া হয়ে পড়ে বিদ্যুতের লাইন কোনো কারণে কেটে দিলে আছে বাড়তি হুজ্জত। ওসব কাজও আবার সাধারণ প্রক্রিয়ায় হয় না, লাগে আন্ডার দ্য টেবিল প্রযোজিত ‘অসাধারণ’ প্রক্রিয়া। সেটি কেমন, তা সচেতন নাগরিকেরা সবাই বোঝেন নিশ্চয়ই। তা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের এভাবে অস্বাভাবিক বিল করার এমন অযৌক্তিক কাজ করাটা কোন যুক্তিতে আসলে যৌক্তিক হয়?
যুক্তিবিদ্যার হিসেবে যৌক্তিকও হয় না। তবে দেশটা তো বাংলাদেশ, তাই যুক্তিবিদ্যা এখানে পাঠ্যসূচিতেও আবশ্যিক বিষয় নয়। জাতীয় পর্যায়েও ওতটা পাত্তা পায় না। বরং নতুন নতুন ‘কু’ যুক্ত ‘যুক্তি’র আমদানি হয়। এখানকার যে কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ যেকোনো বেকায়দায় সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায় ‘অস্বীকার’। সব চলে ওই কাকের নিয়মে, স্রেফ চোখ বুজে থাকলেই হলো!
সমস্যা হলো, এই দেশের নাগরিকদের পকেট কাটার অনুভূতি সরকারি তরফে এমন একটা সময়ে দেওয়া হচ্ছে, যখন মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতিতে তাদের অবস্থা জেরবার। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, টানা সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়েনি। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের এখন টানাটানির সংসার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। ফলে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
আর সেই সময়েই আপনার মনে হচ্ছে যে, যার কাছে গিয়ে আপনার ‘রক্ষা’ পাওয়ার কথা, সেই কর্তৃপক্ষই আপনার অনুমতি ছাড়াই অত্যন্ত ভাবলেশহীন প্রক্রিয়ায় আপনার পকেটে হাত ঢুকিয়ে জোর করে টাকা বের করে নিচ্ছে! এমন অনুভূতির মুখোমুখি হয়ে আপনার হৃদয়ে কি প্রশ্ন জাগবে না যে, ‘সরকার কেন পকেট কাটবে আমার?’
আসলে এমন প্রশ্ন ওঠাটা ততটাই স্বাভাবিক, ঠিক যতটা অস্বাভাবিক প্রশ্ন না ওঠাটা। জীবিত প্রাণি হিসেবে এ দেশের নাগরিকদের শরীরে যদি ন্যূনতম সংবেদনশীলতা থেকে থাকে, তবে এমনতর প্রশ্ন জাগবে। অবশ্য বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম দেখতে দেখতে জোম্বি হয়ে গেলে ঘটনা ভিন্ন!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা