বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপমানজনকভাবে ক্ষমতা হারিয়েছেন বললেও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিচারে তা যথেষ্ট নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এর আগে মাসব্যাপী প্রাণঘাতী বিক্ষোভ এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় গুম, নির্বিচার গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন এবং নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অনেক বাংলাদেশির কাছে, বিশেষ করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে তার পতন ছিল ভীতি ও দায়মুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থারই প্রত্যাখ্যান।
তাই গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা যখন ঘোষণা দেন যে, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরবেন। তখন মূল প্রশ্ন এটি ছিল না যে তিনি ফিরবেন কি না? বরং প্রশ্ন হলো, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক বন্দিবিনিময় আবেদনের মুখোমুখি থাকা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এখনো ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিত অবস্থায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। নয়াদিল্লি সেই আবেদন পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানিয়েছে, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন রয়েছে।
কিন্তু এসবের পরও হাসিনা ভারতীয় ভূখণ্ডে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন এবং দেশে ফেরার পরিকল্পনা প্রকাশ করছেন। এতে শুধু তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাই নয়, তাকে আশ্রয় দেওয়া দেশ হিসেবে ভারতের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
কোনো বিদেশি রাজনৈতিক নেতাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কোনো দেশকে দোষ দেওয়া যায় না। তবে আশ্রয় দেওয়া আর গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে নিজ দেশের বিচার ব্যবস্থার বাইরে রেখে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যান মনে করেন, ভারত তার আইনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "আমি বারবার ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি, তারা যেন প্রত্যর্পণ চুক্তিকে সম্মান জানায় এবং শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত বারবার সেই আহ্বান উপেক্ষা করেছে। চুক্তির কোনো ধারাতেই প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করার মতো ভিত্তি ছিল না। কিন্তু তা না হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়েছে।"
তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, আইন ও নাগরিকদের মাধ্যমে; প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সুরক্ষায় থেকে চালানো গোপন রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে নয়।
হাসিনা দেশে ফেরার জন্য ডিসেম্বরের সময়টি বেছে নিয়েছেন সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে, যা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি। দশকের পর দশক ধরে দলটি নিজেকে স্বাধীনতার প্রধান রক্ষক এবং রাষ্ট্র গঠনের মূল আদর্শের অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। ফলে এই সময়ে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা মূলত দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার একটি সচেতন উদ্যোগ।
এই সময় বেছে নেওয়ার পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য, ঘটনাটিকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কর্তৃত্ববাদী শাসকের প্রত্যাবর্তন হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলের নেত্রীর প্রত্যাবর্তন হিসেবে তুলে ধরা। এর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে আইনি জবাবদিহি হিসেবে না দেখিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে।
হাসিনা যদি দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন, তবে তার সমর্থকরা তাকে আদর্শের জন্য আত্মত্যাগী রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করবেন, এমন সম্ভাবনা প্রবল।
ডিসেম্বরে ফেরার এই ঘোষণা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও কাজ করছে। তিনি আদৌ বাংলাদেশে ফিরবেন কি না তা অনিশ্চিত হলেও, সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের কয়েক মাস আগেই সরকারকে বাড়তি নিরাপত্তা, সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এবং পাল্টা বিক্ষোভ সামলানোর প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এর ফলে একটি অমূলক সংঘাতের আশঙ্কায় ঢাকাকে অযথা রাজনৈতিক মনোযোগ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের সাবেক প্রধান এবং অধ্যাপক আলী রিয়াজ মনে করেন, এই সময় বেছে নেওয়া একটি ‘সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল’। রিয়াজ বলেন, "ছয় মাস আগে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিয়ে হাসিনা নিশ্চিত করতে চাইছেন যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি, তার দল এবং তার প্রত্যাবর্তনই থাকে।"
হাসিনার ঘোষণার পর বাংলাদেশের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম পুনরায় স্পষ্ট করেন, দেশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তিনি হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আপনি ডিসেম্বরে আসবেন না কি জানুয়ারিতে, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। তবে আমরা চাই আপনি আগামীকালই চলে আসুন।"
দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির কাছে ঢাকায় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার ছিল হাসিনা সরকার। নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুদেশের সহযোগিতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছায়।
তবে তার ক্ষমতাচ্যুতি সেই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। নতুন সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ভারতসহ যেকোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক নির্ভরতার ওপর নয়।
হাসিনাকে ভারতের অব্যাহত আশ্রয় দেওয়া কেবল একটি আইনি বিষয় নয়; এটি একটি জটিল ভূরাজনৈতিক ইস্যু, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর।
ভারত ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আবেদন আইনি পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এটি অবশ্যই নয়াদিল্লির নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে সার্বভৌমত্ব তো আর একতরফা বিষয় হতে পারে না। বাংলাদেশও এটি প্রত্যাশা করতে পারে যে তার আবেদন আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং ভারতীয় ভূখণ্ড এমন কোনো মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, যেখান থেকে দণ্ডিত একজন সাবেক নেতা নিজ দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন।
নয়াদিল্লি যে সরাসরি হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা পরিচালনা করছে, এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে ভারতে অবস্থান করে নিষিদ্ধ একটি দলকে সক্রিয় করার সুযোগ দেওয়ায় বর্তমান সরকারের ওপর দিল্লির রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি সুযোগ থেকে যায়।
এই প্রভাব সরাসরি ব্যবহার করা হোক বা ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখা হোক, এটি ঢাকার "বাংলাদেশ ফার্স্ট" পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন এবং হাসিনা আমলে গড়ে ওঠা ট্রানজিট, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।
রিয়াজের মতে, বাস্তবতার বিচারে হাসিনা এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিনি বলেন, "ভারত সরকার যদি তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের সংকেত না দেয়, তবে হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে পুরো আলোচনাটি আসলে বাংলাদেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির একটি রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া কিছুই নয়।"
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালের পর বাংলাদেশ মৌলিকভাবে বদলে গেছে। হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আন্দোলন কোনো একক বিরোধী দল পরিচালনা করেনি। এটি ছিল জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং স্বৈরাচারী শাসন অবসানের দাবিতে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক গণঅভ্যুত্থান।
যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে জনগণ প্রত্যাখান করেছে, সেটিকে ফিরিয়ে আনার যেকোনো চেষ্টা সমাজের একটি বড় অংশের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়বে। রিয়াজের মতে, এ ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি "বাংলাদেশকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করছে।"
তিনি বলেন, "বাংলাদেশ বদলে গেছে। কেবল নতুন সরকার এসেছে তা নয়; ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশিদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। ভারত যদি তার নীতি পরিবর্তন না করে, তবে তারা আবারও একটি বড় ভুল করবে।"
হাসিনার এই ঘোষণা সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের কয়েক মাস আগেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী দেশের সাবেক এক স্বৈরশাসককে একই সঙ্গে আশ্রয়, সুরক্ষা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিয়ে ভারত কি নিজেকে নিরপেক্ষ সহযোগী হিসেবে দাবি করতে পারবে?
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত ঢাকায়, বিদেশে বসে নয়। রিয়াজের ভাষায়, "বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। বাংলাদেশকে প্রতিবেশী হিসেবে বিবেচনা করেই অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান করা উচিত। বাংলাদেশিদের মধ্যে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অসম সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।"
বাংলাদেশের বিশ্লেষকদের মতে, ভারত যদি তার নিকটতম প্রতিবেশীর সার্বভৌমত্বের প্রতি সত্যিই শ্রদ্ধাশীল হতে চায়, তবে শেখ হাসিনাকে নিয়ে তাদের অবস্থান এমন হওয়া উচিত যা তাদের মুখে বলা 'পারস্পরিক সম্মান' ও 'অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার' নীতির সঙ্গে বাস্তবিকভাবে মেলে।
অন্যথায়, সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে ভারতের একটি নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পুরস্কারপ্রাপ্ত ইতালীয় সম্প্রচার সাংবাদিক