‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি’– রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই এমন এক দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে শিক্ষকের পরিচয় হবে তার জ্ঞান, গবেষণা ও মানবিকতা। তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি, একদিন এমন এক বাস্তবতার জন্ম হবে, যেখানে ‘জ্ঞান যেথা মুক্ত’ হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—‘গুরু যেথা কোন রঙের’।
এক সময় বলা হতো, শিক্ষক জাতির বিবেক। এখন সংজ্ঞাটা একটু সংশোধন করা দরকার। শিক্ষক আর কেবল জাতির বিবেক নন, তিনি জাতির রাজনৈতিক আবহাওয়া অফিস। ক্ষমতার বাতাস কোন দিকে বইছে, পতাকার রঙ কোন দিকে উড়ছে, কার সূর্য উদিত আর কার সূর্য অস্ত যাচ্ছে–এসব হিসাব না জানলে এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকা কঠিন। নিউটনের সূত্র ভুলে গেলে ছাত্র ফেল করে, কিন্তু ক্ষমতার সূত্র ভুলে গেলে শিক্ষকেরই চাকরি যায়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আর শুধু বিদ্যাপীঠ নয়; যেন বিশাল বিশাল রঙের শোরুম। এখানে পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন কিংবা বাংলা সাহিত্য–সবকিছু শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকে একটি মৌলিক প্রশ্নে, “স্যার, আপনি কোন দলের?” গবেষণাপত্রের সংখ্যা, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা কিংবা ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা–এসব যেন গৌণ বিষয়। সবচেয়ে মূল্যবান যোগ্যতা হলো রাজনৈতিক পরিচয়। শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার প্রথম প্রশ্ন এখন আর “আপনার গবেষণার ক্ষেত্র কী?” নয়; বরং “আপনার রাজনৈতিক রঙটা কী?”
আমরা একসময় ভাবতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয় ল্যাবরেটরিতে। এখন মনে হয় সবচেয়ে বড় গবেষণা চলছে ক্ষমতার গতিবিদ্যা নিয়ে। গবেষণার নতুন বিষয়, ক্ষমতার তরঙ্গ কোন দিকে যাচ্ছে, কোন করিডোরে হাঁটলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, কোন দরজায় কড়া নাড়লে পদোন্নতি নিশ্চিত, আর কোন দরজায় ভুল করে ঢুকে পড়লে কর্মজীবন অন্ধকার।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত যেন সেই গবেষণারই একটি ব্যবহারিক পরীক্ষা। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও কয়েকজন অধ্যাপককে তাদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তারা নাকি শিক্ষকের নিরপেক্ষ অবস্থান নয়, রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
একদল শিক্ষকের ‘রাজনৈতিক’ ভূমিকার বিচার করছেন, আরেকদল শিক্ষক, যারা নিজেরাও নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে এখন ক্ষমতাবান! সমস্যা সেখানেই। শিক্ষক যখন রাজনীতির সৈনিক হয়ে ওঠেন, তখন শ্রেণিকক্ষও ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা সূত্রের মাঝেও পতাকার ছায়া পড়ে। সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা জ্ঞান নয়; গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
অবশ্য দোষ শুধু শিক্ষকদের নয়। রাষ্ট্রও কখনো তাদের শুধু শিক্ষক থাকতে দেয়নি। প্রতিটি সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে যতটা দেখেছে, তার চেয়ে বেশি দেখেছে প্রভাব বিস্তারের দুর্গ হিসেবে। ফলে উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট, ডিন, প্রভোস্ট কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ– সব জায়গাতেই যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আনুগত্য একটি অলিখিত যোগ্যতায় পরিণত হয়েছে।
এ যেন এক অদ্ভুত সামাজিক চুক্তি। সরকার বলে, “তুমি আমার পক্ষে থাকো, আমি তোমাকে পদ দেব।” শিক্ষক বলেন, “পদ দিন, বাকিটা আমি সামলে নেব।” তারপর একদিন সরকার বদলায়। চেয়ার বদলায়। পদ বদলায়। বদলে যায় শিক্ষকের পরিচয়ও। ক্ষমতায় থাকলে তিনি ‘সম্মানিত শিক্ষাবিদ’। ক্ষমতা হারালে তিনি ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি’। ক্ষমতায় থাকলে সংবাদ সম্মেলন, সেমিনার, টকশো আর বিবৃতির বন্যা। ক্ষমতা চলে গেলে একমাত্র নিরাপদ বাক্য, ‘নো কমেন্টস।’
আমাদের দেশে নীরবতারও রাজনৈতিক রঙ আছে। ক্ষমতার সময় মাইক্রোফোনের সঙ্গে শিক্ষকদের এমন প্রেম জন্মায় যে সেটি ছাড়তেই চান না। কিন্তু ক্ষমতার বাতি নিভে গেলেই সেই মাইক্রোফোন যেন হঠাৎ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। যে কণ্ঠস্বর গতকালও বজ্রের মতো গর্জে উঠছিল, আজ সেটি ফিসফিস করতেও ভয় পায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দৃশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার বদলেছে, পতাকা বদলায়নি কিন্তু পতাকার নিচে দাঁড়ানো মানুষের অবস্থান বদলেছে বহুবার। কত উপাচার্য এসেছেন, গেছেন। কত শিক্ষক ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছেন, আবার ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিচেও নেমেছেন। আজ যারা তদন্ত কমিটি করছেন, কাল হয়তো তাদের জন্যই আরেকটি তদন্ত কমিটি হবে। আজ যারা লাল কালি দিয়ে অন্যের নাম কাটছেন, কাল অন্য কেউ নীল কিংবা সবুজ কালি দিয়ে তাদের নাম মুছে দেবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক অন্তহীন মিউজিক্যাল চেয়ার। গান বাজতে থাকে, সবাই চেয়ার আঁকড়ে বসে থাকেন। গান থামলেই একজন উঠে যান, আরেকজন বসেন। কেবল চেয়ার বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায় না।
সমাজবিজ্ঞানী সমাজ বিশ্লেষণ করতে করতে সমাজেরই একটি রাজনৈতিক অংশে পরিণত হন। শান্তি ও সংঘাত বিষয়ে গবেষক সংঘাতের কারণ খোঁজার বদলে সংঘাতের পক্ষ বেছে নেন। নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক পরমাণুর কেন্দ্রের চেয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রকে বেশি গুরুত্ব দেন। মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে নতুন একটি করে গবেষণার বিষয় চালু করা উচিত: ‘ক্ষমতার কক্ষপথে নিরাপদে টিকে থাকার কৌশল’।
কখনো কখনো মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অবহেলিত শব্দটি ‘শিক্ষক’। কারণ শিক্ষক হওয়ার জন্য যে স্বাধীন চিন্তা, নৈতিক দৃঢ়তা ও সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রয়োজন, তা ধীরে ধীরে দলীয় পতাকার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। যে শিক্ষক রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করবেন, তিনি রাষ্ট্রের মুখপাত্র হয়ে উঠছেন। যিনি ছাত্রদের প্রশ্ন করতে শেখাবেন, তিনিই প্রশ্নকে ভয় পাচ্ছেন। যার বিবেকের প্রতিনিধি হওয়ার কথা, তিনি বিবেকের আগে রাজনৈতিক পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যস্ত।
আমরা প্রায়ই শুনি, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। কিন্তু এই ঘোষণা প্রায় প্রতিটি সরকারই দিয়েছে। তারপর প্রথম কাজ হিসেবে নিজেদের অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে। পূর্বসূরিদের সরিয়েছে। তদন্ত কমিটি করেছে। অব্যাহতি দিয়েছে। বরখাস্ত করেছে। ইতিহাসের বইতে একে হয়তো পরিবর্তন বলা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি একই সিনেমার নতুন নায়ক মাত্র। সংলাপ বদলায়, পোস্টার বদলায়, কিন্তু কাহিনি বদলায় না।
এই ধারা চলতে থাকলে হয়তো ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসও বদলে যাবে। একটি বাধ্যতামূলক কোর্স চালু হবে: ‘পলিটিক্যাল মেটিওরোলজি ১০১।’ সেখানে শেখানো হবে, ক্ষমতার বাতাস কোন দিকে বইলে কোন প্যানেলে নাম লেখাতে হয়, সরকার বদলালে কত দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরনো ছবি মুছে ফেলতে হয়, আর কখন ‘নো কমেন্টস’ বলা সবচেয়ে নিরাপদ। কোর্সের ব্যবহারিক পরীক্ষায় ছাত্রদের একটি কাল্পনিক সরকার পরিবর্তনের পর পাঁচ মিনিটের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। যে সবচেয়ে দ্রুত রঙ বদলাতে পারবে, সেই পাবে সর্বোচ্চ নম্বর।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই এমন হওয়ার কথা ছিল? যে প্রতিষ্ঠানের কাজ মুক্তবুদ্ধি সৃষ্টি করা, সেটি যদি দলীয় আনুগত্য তৈরির কারখানায় পরিণত হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষক বা কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নয়; ক্ষতি পুরো জাতির। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তো ভবিষ্যতের বিচারক, প্রশাসক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, লেখক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে। যদি তাদের প্রথম শিক্ষাই হয় সত্যের চেয়ে আনুগত্য বড়, তাহলে রাষ্ট্রও একদিন সেই শিক্ষার প্রতিচ্ছবিতেই গড়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট অধ্যাপককে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আরও মৌলিক। শিক্ষক কি সরকারের, নাকি রাষ্ট্রের? শিক্ষক কি দলের, নাকি জাতির? তার পরিচয় কি পতাকার রঙ দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি তার জ্ঞান, গবেষণা ও সততা দিয়ে?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কোনো অধ্যাপকের বরখাস্ত হওয়া নয়। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করেছি, যেখানে শিক্ষককে আগে রঙে চেনা হয়, পরে নামে। তার গবেষণা নয়, তার পতাকাই আগে পরিচয় দেয়। আর যে সমাজে শিক্ষককে ‘নীল শিক্ষক’, ‘সাদা শিক্ষক’ কিংবা ‘অমুক দলের শিক্ষক’ বলে পরিচয় করাতে হয়, সে সমাজে বিদ্যা আর পরম ধন থাকে না; পরম ধন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আনুগত্য।
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্ল্যাকবোর্ডে সবচেয়ে বড় ভুলটি লেখা হয়ে যায়। সেখানে ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’ আর লেখা থাকে না। অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা থাকে, ‘পাওয়ার ইজ নলেজ’। আর এই একটি বাক্যই আমাদের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার সনদ!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক।