Advertisement Banner

থার্ডক্লাস লেখক ও ফার্স্টক্লাস বিচারক

থার্ডক্লাস লেখক ও ফার্স্টক্লাস বিচারক
সলিমুল্লাহ খান ও শহীদুল জহির।

বাংলাদেশে লেখক হওয়া কঠিন কাজ। খুবই কঠিন। বছরের পর বছর পড়তে হয়, ভাবতে হয়, লিখতে হয়, কেটে ফেলতে হয়, আবার লিখতে হয়। কখনো পাঠক আসে, কখনো আসে না। কখনো প্রশংসা মেলে, কখনো নিন্দা। কিন্তু এই কঠিন কাজের চেয়েও কঠিন আরেকটি কাজ আছে–লেখক না হয়েও লেখকদের মার্কশিট তৈরি করা। কারণ লেখক হতে শ্রম লাগে, কিন্তু বিচারক হতে লাগে শুধু বাকচাতুর্য, আর নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাস। আর আমাদের দেশে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি কোনোদিন ছিল না।

বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি এ দেশে আরেকটি সমান্তরাল শিল্প বহুদিন ধরে বিকশিত হয়েছে, সেটা হলো: সাহিত্য মূল্যায়ন শিল্প। এখানে কেউ উপন্যাস লেখেন, কেউ কবিতা লেখেন, কেউ গল্প লেখেন, আর কেউ কেউ লেখকের ওপর লেখেন। তারা লেখকের সাহিত্য নয়, লেখককেই পাঠ করেন। তারা চরিত্র নির্মাণ করেন না, লেখকদের শ্রেণিবিন্যাস করেন। তারা প্লট তৈরি করেন না, সাহিত্যিকদের রিপোর্ট কার্ড তৈরি করেন। অনেকটা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষকের মতো। পার্থক্য শুধু এই যে শিক্ষা বোর্ডে উত্তরপত্র দেখা হয়, আর এখানে দেখা হয় আত্মবিশ্বাসের উচ্চতা।

সম্প্রতি একজন খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবী ঘোষণা করেছেন, শহীদুল জহির তৃতীয় শ্রেণির লেখক। কথাটি শুনে আমি প্রথমে কিছুটা অবাক, পরে কিছুটা আতঙ্কিত, এবং শেষে খানিকটা আশ্বস্ত হয়েছি। অবাক হয়েছি এই কারণে যে এতদিন জানতাম বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ উঠে গেছে। আতঙ্কিত হয়েছি এই ভেবে যে সাহিত্যে এখনো বিভাগ ব্যবস্থা বহাল আছে। আর আশ্বস্ত হয়েছি এই কারণে যে অন্তত কেউ একজন আছেন, যিনি এখনো সাহিত্য বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মনে প্রশ্ন জাগল, তাহলে প্রথম শ্রেণির লেখক কারা? কোথায় তাদের তালিকা? কোনো সাহিত্য মন্ত্রণালয় কি আছে, যেখানে সোনালি ফাইলে সংরক্ষিত রয়েছে ‘ফার্স্ট ক্লাস লেখক তালিকা’? কোনো গেজেট কি বেরিয়েছে? নাকি সাহিত্যের বিএসটিআই অফিসে একটি বিশেষ সিলমোহর আছে, যেখানে লেখা, ‘মান নিয়ন্ত্রিত লেখক’? যদি থাকে, তাহলে সেই সিলমোহর কার হাতে?

আরও বড় প্রশ্ন হলো, এই মূল্যায়নের পরীক্ষক কে? অবশ্য আমাদের দেশে পরীক্ষকের অভাব কোনোদিন ছিল না। এখানে ক্রিকেট খেললে সাবেক ওপেনার পরামর্শ দেন, অর্থনীতি নিয়ে কথা বললে ফেসবুকের দার্শনিক মতামত দেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে কথা বললে পাড়ার চায়ের দোকানের বিশ্লেষক হাজির হন। ফলে সাহিত্য নিয়ে কেউ এসে বলে দিলে, “আপনি আসলে লেখক নন”; তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এ এক আশ্চর্য দেশ। এখানে বই লেখার চেয়ে বই বাতিল করা সহজ। একজন মানুষ ত্রিশ বছর ধরে লিখলেন, পাঠক তৈরি করলেন, ভাষার মধ্যে নতুন পথ খুললেন, নতুন বর্ণনাশৈলী নির্মাণ করলেন, এসব খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো এক বিকেলে একজন জ্ঞানগুরু তাকে কত নম্বর দিলেন।

শহীদুল জহিরের দুর্ভাগ্য, তিনি মারা গেছেন। ফলে নিজের রিপোর্ট কার্ড নিজে দেখতে পারলেন না। ভাবুন তো, তিনি যদি বেঁচে থাকতেন! কোনো এক সাহিত্যসভায় গিয়ে হয়তো জানতে পারতেন, “আপনি আসলে থার্ডক্লাস।” তিনি হয়তো বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করতেন, “আচ্ছা, পরীক্ষাটা কবে হয়েছিল?” উত্তরে বলা হতো, “পরীক্ষা হয়নি, অনুভব হয়েছে।”

আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে অনুভবের ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ। এখানে অনেকেই বই পড়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছান না; সিদ্ধান্তে পৌঁছে তারপর বই পড়েন। আগে রায় লেখা হয়, পরে প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। ফলে অনেক সময় মনে হয়, এখানে সাহিত্য সমালোচনা নয়, সাহিত্যিক জমিদারি চলছে।

একজন ঠিক করে দেন কে কবি। আরেকজন ঠিক করে দেন কে চিন্তাবিদ। তৃতীয়জন ঠিক করে দেন কে লেখক। পাঠক নামের যে অদ্ভুত প্রাণীটি নিজের টাকায় বই কিনে, পড়ে, ভালোবাসে, আবার কখনো অপছন্দও করে, তার মতামতের বিশেষ কোনো মূল্য নেই। সাহিত্য যেন জনগণের সম্পদ নয়; কয়েকজন তত্ত্বাবধায়কের ব্যক্তিগত এস্টেট।

মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর প্রায় সব বড় লেখকই জীবদ্দশায় কারও না কারও কাছে ‘ফালতু’ ছিলেন। টলস্টয় শেক্সপিয়ারকে সহ্য করতে পারতেন না। ইউরোপের বহু পণ্ডিত রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়া নিয়ে বিরক্ত ছিলেন। বাংলাতেও একসময় প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছিল যে রবীন্দ্রনাথ মোটামুটি মানের কবি। অর্থাৎ সাহিত্য ইতিহাসের একটি চিরন্তন শিক্ষা আছে। মহান লেখকদের চেয়ে মহান লেখক-বিরোধীর সংখ্যা সবসময় বেশি।

তবে আজকের যুগে একটি নতুন পরিবর্তন ঘটেছে। আগে মানুষ বই লিখে বিখ্যাত হতো। এখন অনেকেই বই বাতিল করে বিখ্যাত হতে চান। এটি অনেকটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শর্টকাট অর্থনীতির মতো। একটি নতুন তত্ত্ব দাঁড় করানো কঠিন, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত নামকে ধাক্কা দেওয়া সহজ। নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করা কঠিন, কিন্তু পুরোনো সাহিত্যকে বাতিল করা সহজ। ফলে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ একটি বিশাল রিয়েলিটি শো, যেখানে প্রতিযোগীরা সাহিত্য সৃষ্টি করেন না; সাহিত্যিকদের বাদ দেন।

একজন বলেন, “ও লেখক না।” আরেকজন বলেন, ‘‘ও কবি না।’’ তৃতীয়জন বলেন, ‘‘ও চিন্তাবিদ না।’’ চতুর্থজন বলেন, ‘‘ওর সবই অতিরঞ্জিত।’’ শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, সবাই বাদ পড়েছে, শুধু বিচারকরাই টিকে আছেন। যেন পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র সফল সৃষ্টি হলো সমালোচক নিজেই।

অথচ সমালোচনারও একটি ভাষা আছে। সেখানে যুক্তি থাকে, পাঠ থাকে, বিশ্লেষণ থাকে। সেখানে “আমি পছন্দ করি না’’ এবং ‘‘এটি মূল্যহীন’’–এই দুটি বাক্যের মধ্যে পার্থক্য বোঝার মতো ন্যূনতম বুদ্ধিবৃত্তিক সততা থাকে। সভ্যতার ইতিহাস মূলত এই পার্থক্য শেখার ইতিহাস। কারণ রুচি ব্যক্তিগত, কিন্তু অবজ্ঞা প্রায়ই ক্ষমতার ভাষা। রুচি বলে, “এটি আমার ভালো লাগেনি।” ক্ষমতা বলে, “এটি ভালো লাগার যোগ্যই নয়।”

একজন লেখককে অপছন্দ করা যায়। তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তার ভাষা, নির্মাণশৈলী, নন্দনতত্ত্ব কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করা যায়। কিন্তু তাকে গাল দিয়ে বাতিল করে দেওয়ার মধ্যে যে আনন্দ, তা সাহিত্যিক নয়; তা অনেকটা জমিদারি মানসিকতার বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্করণ। সেখানে যুক্তির চেয়ে কর্তৃত্ব বেশি কাজ করে, পাঠের চেয়ে ভঙ্গি বড় হয়ে ওঠে, আর বিশ্লেষণের জায়গা দখল করে আত্মমুগ্ধতা।

এটি আমাকে গ্রামবাংলার একটি পুরনো কৌতুকের কথা মনে করিয়ে দেয়। এক চালাক লোক নিজেকে বিরাট জ্ঞানী বলে প্রচার করত। একদিন কয়েকজন নিরক্ষর দর্শকের সামনে সে একজন শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করল, “আই ডোন্ট নো মানে কী?” ভদ্রলোক সরলভাবে উত্তর দিলেন, “আমি জানি না।” অমনি চালাক লোকটি হাততালি দিয়ে উঠে বলল, “দেখেছেন! উনি নিজ মুখেই স্বীকার করলেন যে উনি কিছু জানেন না!”

দর্শকেরা হেসে উঠল, আর চালাক লোকটি বিজয়ীর ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারণ তার উদ্দেশ্য উত্তর জানা নয়; উদ্দেশ্য ছিল একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে চাতুর্য জেতে, আর সত্যের চেয়ে হাততালি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে মাঝেমধ্যে এমন কিছু বক্তব্য শোনা যায়, যা শুনলে মনে হয় বাংলা সাহিত্যে সবাই তৃতীয় শ্রেণির, বাংলা কবিতায় সবাই মাঝারি মানের, বাংলা চিন্তায় সবাই অগভীর, বাংলা দর্শনে সবাই অপরিণত। শুধু বক্তাই ব্যতিক্রম। শুধু তার হাতেই সাহিত্যিক পরিমাপযন্ত্র, শুধু তার কাছেই মান নিয়ন্ত্রণের সিলমোহর, শুধু তিনিই জানেন কে লেখক, কে অর্ধলেখক, আর কে লেখক হওয়ার ভান করছেন।

এই আত্মবিশ্বাস এতটাই প্রবল যে কখনো কখনো তা যুক্তিকেও হার মানায়। মনে হয়, বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস আসলে একটি দীর্ঘ ভুল বোঝাবুঝি, যা এসে ঠিক হয়েছে একজন সমালোচকের মাইক্রোফোনের সামনে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শহীদুল জহির ফার্স্টক্লাস না থার্ডক্লাস–এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ সাহিত্য পরীক্ষার খাতা নয়। এখানে নম্বর দেয় না কোনো বোর্ড, গ্রেড নির্ধারণ করে না কোনো স্বঘোষিত পরীক্ষক। এখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় সময়।

আর সময়ের একটি অদ্ভুত বদভ্যাস আছে।

সে প্রায়ই পরীক্ষকদের ভুলে যায়।

কিন্তু লেখকদের মনে রাখে।

সাহিত্য ইতিহাসের তাক খুলে দেখুন। সেখানে অসংখ্য বিচারকের নাম হারিয়ে গেছে, অসংখ্য রায় ধুলোয় চাপা পড়েছে, অসংখ্য সার্টিফিকেট পোকায় কেটে খেয়েছে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে সেই রায় দেওয়া হয়েছিল, তাদের বই এখনো মুদ্রিত হয়, তাদের বাক্য এখনো পাঠকের ভেতর আলোড়ন তোলে, তাদের চরিত্র এখনো মানুষের স্মৃতিতে হেঁটে বেড়ায়।

তাই কোনো লেখককে ‘থার্ডক্লাস’ বলার আগে হয়তো একটু থামা দরকার। কারণ সাহিত্য শেষ পর্যন্ত আদালত নয়, যেখানে একজন বিচারক হাতুড়ি পিটিয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। সাহিত্য বরং একটি দীর্ঘ, অন্তহীন কথোপকথন– যেখানে শেষ কথা বলে পাঠক, আর সর্বশেষ রায় দেয় সময়।

আর সময়, আমরা জানি, খুব কম ক্ষেত্রেই ফার্স্টক্লাস বিচারকদের নাম মনে রাখে।

চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক।

সম্পর্কিত