ঐতিহাসিক বিবর্তন, চরম জনপ্রিয়তা এবং বিশাল বাজেটের ওপর ভিত্তি করে এটি বলা সম্পূর্ণ যৌক্তিক যে, বিশ্বজুড়ে ফুটবল নামে পরিচিত খেলাটি এখনো বিশ্বের শীর্ষ খেলা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে এর সর্বজনীন নাম ও নিয়মকানুন সত্ত্বেও এই খেলাটি যুক্তরাষ্ট্রে তেমন জনপ্রিয় হতে পারেনি। যেখানে ‘ফুটবল’ বলতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলাকে বোঝানো হয়। বিশ্বজুড়ে যা ফুটবল নামে পরিচিত, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ তাকে বলে সকার।
আমেরিকানদের কাছে এই খেলার গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে এর ভূমিকা স্পষ্ট হয় যখন ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ফুটবলকে আরো প্রসারিত করতে সেখানে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ১৯৯৪ ও ২০২৬ সালে- দুবার ঘটেছে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বকাপ আয়োজন করে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র যে একমেরু বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি করছিল, তার একটি সুন্দর ও উদার গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে এবং তথাকথিত ‘গ্লোবাল মাইনোরিটি’ ও ‘গ্লোবাল মেজরিটি’-র দেশগুলোর মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বৈষম্য ও বিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আধুনিক অলিম্পিকের জনক ব্যারন পিয়েরে দ্য কুবার্তাঁর ‘হে খেলাধুলা, তুমিই শান্তি’ মন্ত্রটি ফুটবলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারত। এটা অলিম্পিক গেমসের মতো সব সামরিক সংঘাত বন্ধ রাখার আহ্বান জানায়। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের এই ফিফা বিশ্বকাপটি ছিল খেলার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাবক দ্বারা আক্রান্ত একটি টুর্নামেন্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিশ্চিত করেছিলেন। সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছিল ২০১৮ সালের গ্রীষ্মে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ফিফা নির্বাহী কমিটির সভায়, যা সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে আয়োজনের দিক থেকে সেরা টুর্নামেন্ট ছিল।
ট্রাম্প চেয়েছিলেন এই টুর্নামেন্টটিকে ‘আমেরিকান জীবনযাত্রার জয়জয়কার’ হিসেবে তুলে ধরতে, কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের সাথে মিলে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত বিশ্বের সর্বত্র অত্যন্ত জনপ্রিয় এই খেলাটিকে মার্কিন রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির অনন্যতা প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিপুল সম্পদ ও প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। অ্যাপল টিভি-র ‘টেড লাসো’ সিরিজের মতো জনপ্রিয় প্রচারমূলক মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে সকারের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। যেখানে একজন আমেরিকান ফুটবল কোচ একটি তৃতীয় সারির ব্রিটিশ সকার ক্লাবকে প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়নে পরিণত করেন। এছাড়া, শাকিরা, ব্রাড পিট, এডওয়ার্ড নর্টন, এডাম ব্রোডি এবং আইশোস্পিডের মতো বৈশ্বিক তারকা ও ব্লগারদের মাধ্যমে এই ইভেন্টের বিশ্বব্যাপী প্রচার চালানো হয়। মূল ক্রীড়া নায়ক করা হয়েছিল একাধিকবারের বিশ্বসেরা লিওনেল মেসিকে, যিনি বর্তমানে প্রেসিডেন্টের নিজ অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডার ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলেন। আর্জেন্টিনা দল যেন ফাইনালে পৌঁছাতে পারে তার জন্য সুবিধাজনক ম্যাচ নির্ধারণের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল এবং সেমিফাইনালে এসে আর্জেন্টিনা কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়।
সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটিতে মালভিনাস (ফকল্যান্ড) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধ স্মরণ করিয়ে দেওয়া বিতর্কিত ব্যানার সংঘাতের রাজনীতিকে মাঠের ভেতর নিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজ জাতীয় দল ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়েও পিছিয়ে ছিল না। মার্কিন খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডজনিত স্থগিতাদেশ তোলার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন ও ক্রীড়া বিধিমালার প্রতি আমেরিকার তোয়াক্কা না করার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতি হাজার হাজার দর্শককে সরাসরি খেলা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক মিত্রদের সাথেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করেছে। নিউ ইয়র্কের আকাশে দাবানলের ধোঁয়া এবং ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল ম্যাচ বিঘ্নিত হওয়ার উপক্রম যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কাঠামোগত বিশৃঙ্খলাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
ফিফা বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮টিতে উন্নীত করে খেলাটিকে আরও গণতান্ত্রিক করার দাবি করলেও, এই টুর্নামেন্টটি মূলত নব্য-উপনিবেশবাদ এবং ফুটবলের বিশ্বব্যাপী বৈষম্যকেই পুনরুজ্জীবিত করেছে। কারণ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফিটি কেবল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মতো দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল যারা বিশ্বজুড়ে সেরা খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে।
নেদারল্যান্ডসের প্রভাবে গড়ে ওঠা কুরাকাও দল যখন ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে ড্র করে ইতিহাস গড়ে, তখন ডাচ রাজপরিবার তাদের অভিনন্দন জানাতে ড্রেসিংরুমে উপস্থিত হয়। ঠিক একইভাবে নরওয়ে দল তাদের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হাল্যান্ড এবং প্রিমিয়ার লিগে খেলা খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। বহুজাতিক ও শক্তিশালী দলগুলোর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত থাকা সত্ত্বেও, কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীরা এমন সব দেশকে সমর্থন জুগিয়েছে যারা তাদের প্রাক্তন উপনিবেশকদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে।
এই সামাজিক ও ঐতিহাসিক পটভূমির কারণেই কেপ ভার্দে দল এবং তাদের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভো জিনহার পারফরম্যান্স কিংবা ডিআর কঙ্গো দলের সমর্থনে প্যাট্রিস লুমুম্বার প্রতিকৃতি নিয়ে আসা সমর্থকদের আবেগ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে, বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ আন্তরিকভাবে ইরানের জাতীয় দলকে সমর্থন করেছে। ইরান দলকে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা (যার কারণে তাদের মেক্সিকো থেকে ভ্রমণ করতে হতো) এবং একটি বিতর্কিত অফসাইডের সিদ্ধান্তে গোল বাতিল হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয়। এসব ঘটনা সাধারণ দর্শক ও ফুটবল বিশ্বের একটি বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
তবে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বৈষম্যটি ছিল দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের পর থেকে রাশিয়ান অ্যাথলেটদের ওপর আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা, তাদের বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা এবং রাশিয়ার মাটিতে কোনো প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো নৈতিক বা আইনি যুক্তিতে টিকে থাকে না। বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন এই বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক ছিল স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র- যে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে। অথচ আমেরিকার আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান, ২০২৫ সালে ইরানে আক্রমণ এবং লেবাননে চলমান সামরিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও সমস্ত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নির্বিঘ্নে অংশগ্রহণ করে চলেছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) যেখানে ধীরে ধীরে রাশিয়ান অ্যাথলেটদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে, সেখানে ফিফা এবং উয়েফা নিজেদের একপাক্ষিক রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
রুশ দলকে টুর্নামেন্ট থেকে বঞ্চিত করার ফলে বিশ্ব ফুটবল বিশাল অঙ্কের করপোরেট স্পন্সরশিপ থেকে বঞ্চিত হয়েছে (২০২২ পর্যন্ত গ্যাজপ্রম উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রধান স্পনসর ছিল)। এর পাশাপাশি খেলোয়াড়দের দল বদল এবং বিশাল রাশিয়ান সম্প্রচার বাজার থেকে আয়ের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। অধিকন্তু, সর্বোচ্চ মান ও নিরাপত্তা বজায় রেখে বড় মাপের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে সক্ষম আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যুগুলো থেকে বিশ্ব ফুটবল বঞ্চিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট দেশকে কৃত্রিমভাবে বিচ্ছিন্ন করার উদাহরণ নয়, বরং এটি খেলাধুলার কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কর্তারা যত দিন এই দ্বিমুখী নীতির প্রতি চোখ বন্ধ করে রাখবেন, বৈশ্বিক ফুটবলের সংকট ততটাই গভীর হবে এবং যার প্রথম স্পষ্ট লক্ষণগুলো এই গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টটিতে ফুটে উঠেছে।
আলেকজান্ডার বব্রভ: আরইউডিএন বিশ্ববিদ্যালয়ের কূটনৈতিক অধ্যয়ন বিভাগের প্রধান।
(এই লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)