ads

ফিফা নিরপেক্ষ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার

জাভিয়ের আবু এইদ
জাভিয়ের আবু এইদ
ফিফা নিরপেক্ষ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার
গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের সিয়াটলে অবস্থিত লুমেন ফিল্ডে (সিয়াটল স্টেডিয়াম) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম পর্বের ‘জি’ গ্রুপের ম্যাচে মিশর ও ইরানের মুখোমুখি লড়াইয়ের আগে দর্শকরা একটি ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করছেন। ছবি: সামাহ জিদান/আনাদোলু এজেন্সি

ফিফা কেবল একটি ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বর্তমান ভূরাজনীতিতে এটি একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান ফুটবল বিশ্ব যখন নতুন করে ফিফার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখন ফিলিস্তিনিরা মূলত সেই সত্যটিই পুনর্ব্যক্ত করছে যা তারা দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জেনে আসছে।

ফিফা তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার বুলি আউড়ে চললেও বাস্তবে এটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি পুতুলে পরিণত হয়েছে। বর্তমান ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফিফা এবং এর নেতৃত্বের ওপর বিশ্বজুড়ে যে তীব্র সমালোচনা ও নজরদারি তৈরি হয়েছে, তা এই ধারণাকেই আরও জোরালো করে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের পর একজন মার্কিন ফুটবল খেলোয়াড়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে সিদ্ধান্ত ফিফা নিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে।

এর পাশাপাশি চলমান টুর্নামেন্টে মিশর ও কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনার পক্ষে রেফারিদের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের অভিযোগ ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক সততাকে বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তবে এই ধরনের পক্ষপাতিত্ব কিংবা রাজনৈতিক চাপের মুখে ফিফার নতিস্বীকার করার ঘটনা ফিলিস্তিনিদের জন্য একেবারেই নতুন কিছু নয়। তারা বছরের পর বছর ধরে ফিফার এই চরম বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত আচরণের মুখোমুখি হয়ে আসছে, যা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ভণ্ডামির একটি জীবন্ত উদাহরণ।

ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও যাপিত জীবনের বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ফিফা তার নিজস্ব সংবিধানে মানবাধিকারকে সম্মান জানানোর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলেও, ফিলিস্তিনি ফুটবলের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তারা পদ্ধতিগতভাবে এবং বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) দীর্ঘদিন ধরে ফিফার কাছে ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ)-এর সদস্যপদ স্থগিত করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। এর মূল কারণ হলো, ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এবং ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে চুরি করা জমিতে তাদের লিগ ম্যাচের আয়োজন করছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সীমানার ভেতরে গড়ে ওঠা অবৈধ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের দলগুলো এই লিগে নিয়মিত অংশ নিচ্ছে, যা ফিফার নিজস্ব নিয়মাবলীর পরিপন্থী। কিন্তু ফিফা ফিলিস্তিনের এই বৈধ ও আইনি দাবিকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসরায়েলের এই দখলদারিত্বের নীতিকে কার্যত মৌন সম্মতি দিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের নির্বিচারে হত্যা, পঙ্গু করা কিংবা অমানবিকভাবে বন্দি করে রাখার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোতেও ফিফা সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

সম্প্রতি ফিলিস্তিনি নারী ফুটবল দলের অন্যতম দুই সদস্য রান্ড হালাওয়ানি এবং নাটালি আবু দায়্যাহকে ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক অন্যায়ভাবে বন্দি করার ঘটনা ঘটলেও ফিফা তাদের মুক্তির জন্য কোনো ধরনের পদক্ষেপ বা বিবৃতি দেয়নি।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে ফিলিস্তিনের একের পর এক ফুটবল স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া অবকাঠামো ধ্বংসের শিকার হলেও ফিফা এর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়নি। এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি ফুটবল দলগুলোর আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক ম্যাচে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ পারমিট কিংবা ভিসা না দিয়ে ইসরায়েল যে বৈষম্যমূলক নীতি প্রয়োগ করে আসছে, তা বন্ধ করতেও ফিফা কোনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ) কেবল ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য ও অবৈধ দখলদারিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিচ্ছে না, বরং তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গাজা কিংবা লেবাননে যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত থাকা ইসরায়েলি ফুটবলারদের কর্মকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধুবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছে। এই ধরনের চরম রাজনৈতিকীকরণ এবং ক্রীড়াঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের প্রকাশ্য উদ্‌যাপন সত্ত্বেও ফিফা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক সুস্পষ্ট রায় ও প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ফিফা ফিলিস্তিনিদের এই মানবিক ও আইনি দাবিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এক অদ্ভুত অজুহাত খাড়া করে রেখেছে। ফিফার দাবি, ফিলিস্তিনের এই দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পাবলিক আইনের অধীনে অত্যন্ত জটিল একটি বিষয় এবং পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি মর্যাদা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফিফার এই ধরনের বক্তব্য মূলত ইসরায়েলি ও মার্কিন প্রশাসনের প্রচারণামূলক বক্তব্যের হুবহু প্রতিফলন, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি ভূমি চুরির ঘটনাকে বৈধতা দিতে এবং তাদের আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করতে ব্যবহার করে থাকে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসরায়েল যেভাবে তার অবৈধ ভূখণ্ড দখল ও সম্প্রসারণকে আড়াল করার জন্য পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম এবং কৃষিকে ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের স্বাভাবিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে, ঠিক একইভাবে তারা ফুটবলকেও তাদের অপরাধের বৈধতা দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ফিফা তাদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সভাপতিত্বে ফিফার এই বিতর্কিত ও ইসরায়েলপন্থী ভূমিকা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনফান্তিনোর এই বৈষম্যমূলক এবং মানবাধিকার বিরোধী অবস্থানের কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযোগ দায়ের করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইনফান্তিনো খুব ভালো করেই জানেন যে ইসরায়েলের এই চর্চাগুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য ও যুদ্ধাপরাধের শামিল। তবুও তিনি বছরের পর বছর ধরে আসা অসংখ্য প্রতিবেদন ও চিঠির তথ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলছেন।

ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব কেবল ইসরায়েলের এই অপরাধগুলোর ব্যাপারে নীরব বা নিষ্ক্রিয়ই থাকছে না, বরং তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ইসরায়েলের এই অপরাধের ইতিহাসকে চিরতরে মুছে ফেলার করার প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিচ্ছে। এর একটি বড় প্রমাণ মেলে যখন গত মাসে ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ একটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ফিলিস্তিনকে ইসরায়েলের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তাব দেয় এবং এটিকে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে খোদ ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবে প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানকে তার ইসরায়েলি প্রতিপক্ষের সাথে করমর্দন বা হ্যান্ডশেক করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন, যা ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নিপীড়নকে আড়াল করার একটি নির্লজ্জ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফিফা তার নিজস্ব সংবিধানে নিজেকে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশন হিসেবে দাবি করলেও, বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ উল্টো। ফিফা আজ আর কোনো নিরপেক্ষ ক্রীড়া সংস্থা নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিনের ওপর চালানো দশকের পর দশক ধরে চলা ইসরায়েলি নিপীড়নের প্রতি ফিফার এই অন্ধ সমর্থন ও পক্ষপাতিত্ব আজ বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশের ফুটবল ভক্তদের কাছেও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, যা ফিলিস্তিনিরা তাদের জীবনের চড়া মূল্য চুকিয়ে অনেক আগে থেকেই উপলব্ধি করে আসছিল। ক্রীড়াক্ষেত্রে সমতা ও মানবাধিকারের যে গালভরা বুলি ফিফা বিশ্ববাসীকে শোনায়, তা যে আসলে মহাশূন্যে ছড়ানো কিছু অর্থহীন শব্দ মাত্র, তা আজ ফিফার নিজস্ব কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত। যতদিন না বিশ্ব ফুটবল সংস্থাটি তার এই দ্বিমুখী নীতি ও রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে ফুটবলকে শান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যেকোনো দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভণ্ডামি হিসেবেই গণ্য হবে।

জাভিয়ের আবু এইদ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

(লেখাটি আল জাজিরার সৌজন্যে প্রকাশিত।)

সম্পর্কিত