আল হেলাল শুভ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ সোমবারও সকাল থেকে বৃষ্টি হয়েছে। আর তাতে রাজধানীর অনেক জায়গায় গতকাল রোবারের চেয়ে জলাবদ্ধতা তুলনামূলক কম ছিল। যদিও মতিঝিল, গুলশান, মিরপুর, বনানী, তেজগাঁও, কাকরাইল, শান্তিনগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক রাস্তার ছিল পানির নিচে।
প্রতি বছর বৃষ্টির সময় রাজধানীতে হওয়া এই জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দুজন বিশেষজ্ঞ। তারা ঢাকার ব্লু নেটওয়ার্ক ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দিয়েছেন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও সচেষ্ট হওয়ার পরামর্শ।
এদিকে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় আছে। ফলে আগামী পাঁচ দিন; অর্থাৎ, শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯ টা থেকে দেশের রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে সারাদেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
নতুন করে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূ্র্বাভাস দেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়েছে বেশি। এর কারণেই বৃষ্টির নতুন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তাতে আগামী কয়েক দিন রাজধানী জলাবদ্ধতার মধ্যে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিনের সমস্যা হঠাৎ করে একদিনের মধ্যে পরিবর্তন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ব্লু নেটওয়ার্ক ফিরিয়ে আনার পরামর্শ
রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ঢাকার আগের ব্লু নেটওয়ার্ক ফেরানোর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব। তার মতে, যে ব্লু নেটওয়ার্ক ছিল, তা উদ্ধার করে নদী পর্যন্ত সংযোগ করলেই জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব। ওই নেটওয়ার্ক উদ্ধারে উন্নত পরিকল্পনা তৈরি করে জনগণকে সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।

ইকবাল হাবির চরচাকে বলেন, ‘‘প্রথমত ঢাকা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সময় বন্যা আক্রান্ত একটি শহর ছিল। পরে ধীরে ধীরে নদীর চারপাশে বেড়িবাঁধ দিয়ে নদীবন্যা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে বন্যার শিকার হয়। ঢাকায় ৮০টির বেশি খাল এবং ৩০টি জলাধার চিহ্নিত ছিল।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘‘বৃষ্টির পানি স্ট্রং ড্রেনেজ হয়ে খাল, জলাধার, পুকুর এবং বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল কিংবা নিম্নাঞ্চল হয়ে নদীতে যেত। এই পুরো প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রাখার জন্য অনেকগুলো সংস্থাকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই যে ব্লু নেটওয়ার্ক, সেটাকে সংরক্ষণ করা এবং তার গতিময়তা ঠিক রাখার জন্য কোনো সমন্বিত উদ্যোগ কেউই নেয়নি। এবং এর একটি মাস্টার প্ল্যান কিংবা সমন্বিত পরিকল্পনার জন্য সরকারও উদ্যোগ নেয়নি। এটি এখন সিটি করপোরেশনের হাতে।”
ইকবাল হাবিব বলেন, ‘‘ঢাকার মাত্র ৫০-৫২ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যেগুলো জলাধার ভরাতে ব্যবহৃত হয়েছে। দীর্ঘদিনে মাত্র ৩ শতাংশ সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির কারণে ৮০ শতাংশ এলাকাই এই নেটওয়ার্কের বাইরে। আমাদের বর্জ্য খাল, জলাধার, পুকুরে এসে সেগুলোকে অসহনীয় ও কুরুচিপূর্ণ কালো, গন্ধযুক্ত জলের ধারায় পরিণত করেছে। ফলে এগুলো দখল অথবা ভরাট করার ব্যাপারে মানুষ উৎসাহিত হয়েছে।”
এই স্থপতি বলেন, ‘‘ব্লু নেটওয়ার্ক উদ্ধার করে নদী পর্যন্ত সংযোগ করে উন্নত পরিকল্পনার জনসম্পৃক্ত বাস্তবায়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি কঠিনতর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পুঞ্জীভূত করে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া দরকার। এ কার্যক্রমের জন্য যথোপযুক্ত পেশাদার এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রয়োজন জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।”
ইকবাল হাবিব বলেন, ‘‘আমি এ সময় সামগ্রিক জায়গায় একটি বড় ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাশা করি।” এই উদ্যোগের নকশা ও পরিকল্পনা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘শুধু দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা। এ ছাড়া রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।”
পরিকল্পনার অভাব দেখছেন আরেক বিশেষজ্ঞ
ঢাকায় জলাবদ্ধতার পেছনে পরিকল্পনার অভাব দেখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘ঢাকার জলাবদ্ধতা তো আমাদের স্বেচ্ছাচারী নগরায়নের ফসল। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দূর করার পরিকল্পনা সরকারের আসলে নেই। ওয়াসা যে পরিকল্পনা করেছিল, এর পর সিটি করপোরেশন যখন দায়িত্ব নিল, তারপর থেকে সমন্বিত কিংবা পৃথকভাবে কোনো ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান করেওনি, নেয়ওনি।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “পরিকল্পনাহীনভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ শহরে কী পরিমাণ সবুজ এলাকা থাকা দরকার, কী পরিমাণ বৃষ্টির চাপ কমানো দরকার, সেটা কোন এলাকায় থাকবে, কিংবা এলাকাভিত্তিক–আসলে কোনো পরিকল্পনা নেই।”
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “ড্রেন, কৃত্রিম নালা–সেগুলোও আবার কঠিন বর্জ্যে পরিপূর্ণ। অথচ সারা বিশ্বে এখন জলাশয়ের যে গতি কিংবা ফ্লো–এটা নিয়ে কিন্তু ড্রেনের মডেলিং করা হয়।

সেখানে কোন এলাকায় কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে, সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। আমরা সেই সমাধান না খুঁজে এখনো অ্যাডহক বেসিসে টাকা বরাদ্দ দিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান খুঁজছি।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ মনে করেন, সরকার যতক্ষণ না উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হবে, ততদিন জলাবদ্ধতা থাকবে। তিনি বলেন, “খাল ও নদী অনেকটা শেষ। এখন যা আছে, সেটা দিয়ে অতিবৃষ্টি সামাল দেওয়া খুবই কঠিন। আমাদের আরবান এলাকা এত বড় হয়ে গেছে যে, আমাদের ভুগতেই হবে।”
তবে জলাবদ্ধতার ভোগান্তিটা ‘কিছুটা কমাতে’ সরকারের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে দখল হওয়া জলাশয় ও জলাধারগুলো উদ্বার করতে সরকারকে ‘বাস্তবসম্মতভাবে’ কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সোমবার সকালে জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ধীরগতিতে হয়। গুলশান ট্রাফিক বিভাগ এক বার্তায় জানিয়েছে, বনানী কবরস্থানের পর ঢাকা গেট-সংলগ্ন মূল সড়কের উভয় লেনে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া বনানী-কাকলী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পে নামার অংশেও হালকা জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করেছে।
অন্য জেলার পরিস্থিতি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (সকাল ৬টা পর্যন্ত) চট্টগ্রামে ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় এ সময় বৃষ্টি হয় ৯৭ মিলিমিটার। এ ছাড়া বগুড়ায় ৮৪, রংপুরে ৫১, সিলেটে ২৮, ময়মনসিংহে ২৭, বাঘাবাড়িতে ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি, ঢল, বন্যা ও পাহাড় ধসে গতকাল রোববার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে।
তবে সোমবার চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় কমেছে পানিবন্দী মানুষের সংখ্যাও।
সিলেট বিভাগের সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ–এই তিন জেলায় তুলনামূলক বন্যা বেশি। আর সিলেট জেলার সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া সারিগোয়াইন ও পিয়াইন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। তবে বরিশালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি বলে জানা গেছে। খুলনায় বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়নি।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন চরচার চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা প্রতিনিধি)

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ সোমবারও সকাল থেকে বৃষ্টি হয়েছে। আর তাতে রাজধানীর অনেক জায়গায় গতকাল রোবারের চেয়ে জলাবদ্ধতা তুলনামূলক কম ছিল। যদিও মতিঝিল, গুলশান, মিরপুর, বনানী, তেজগাঁও, কাকরাইল, শান্তিনগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক রাস্তার ছিল পানির নিচে।
প্রতি বছর বৃষ্টির সময় রাজধানীতে হওয়া এই জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দুজন বিশেষজ্ঞ। তারা ঢাকার ব্লু নেটওয়ার্ক ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দিয়েছেন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও সচেষ্ট হওয়ার পরামর্শ।
এদিকে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় আছে। ফলে আগামী পাঁচ দিন; অর্থাৎ, শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯ টা থেকে দেশের রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে সারাদেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
নতুন করে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূ্র্বাভাস দেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়েছে বেশি। এর কারণেই বৃষ্টির নতুন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তাতে আগামী কয়েক দিন রাজধানী জলাবদ্ধতার মধ্যে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিনের সমস্যা হঠাৎ করে একদিনের মধ্যে পরিবর্তন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ব্লু নেটওয়ার্ক ফিরিয়ে আনার পরামর্শ
রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ঢাকার আগের ব্লু নেটওয়ার্ক ফেরানোর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব। তার মতে, যে ব্লু নেটওয়ার্ক ছিল, তা উদ্ধার করে নদী পর্যন্ত সংযোগ করলেই জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব। ওই নেটওয়ার্ক উদ্ধারে উন্নত পরিকল্পনা তৈরি করে জনগণকে সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।

ইকবাল হাবির চরচাকে বলেন, ‘‘প্রথমত ঢাকা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সময় বন্যা আক্রান্ত একটি শহর ছিল। পরে ধীরে ধীরে নদীর চারপাশে বেড়িবাঁধ দিয়ে নদীবন্যা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে বন্যার শিকার হয়। ঢাকায় ৮০টির বেশি খাল এবং ৩০টি জলাধার চিহ্নিত ছিল।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘‘বৃষ্টির পানি স্ট্রং ড্রেনেজ হয়ে খাল, জলাধার, পুকুর এবং বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল কিংবা নিম্নাঞ্চল হয়ে নদীতে যেত। এই পুরো প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রাখার জন্য অনেকগুলো সংস্থাকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই যে ব্লু নেটওয়ার্ক, সেটাকে সংরক্ষণ করা এবং তার গতিময়তা ঠিক রাখার জন্য কোনো সমন্বিত উদ্যোগ কেউই নেয়নি। এবং এর একটি মাস্টার প্ল্যান কিংবা সমন্বিত পরিকল্পনার জন্য সরকারও উদ্যোগ নেয়নি। এটি এখন সিটি করপোরেশনের হাতে।”
ইকবাল হাবিব বলেন, ‘‘ঢাকার মাত্র ৫০-৫২ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যেগুলো জলাধার ভরাতে ব্যবহৃত হয়েছে। দীর্ঘদিনে মাত্র ৩ শতাংশ সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির কারণে ৮০ শতাংশ এলাকাই এই নেটওয়ার্কের বাইরে। আমাদের বর্জ্য খাল, জলাধার, পুকুরে এসে সেগুলোকে অসহনীয় ও কুরুচিপূর্ণ কালো, গন্ধযুক্ত জলের ধারায় পরিণত করেছে। ফলে এগুলো দখল অথবা ভরাট করার ব্যাপারে মানুষ উৎসাহিত হয়েছে।”
এই স্থপতি বলেন, ‘‘ব্লু নেটওয়ার্ক উদ্ধার করে নদী পর্যন্ত সংযোগ করে উন্নত পরিকল্পনার জনসম্পৃক্ত বাস্তবায়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি কঠিনতর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পুঞ্জীভূত করে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া দরকার। এ কার্যক্রমের জন্য যথোপযুক্ত পেশাদার এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রয়োজন জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।”
ইকবাল হাবিব বলেন, ‘‘আমি এ সময় সামগ্রিক জায়গায় একটি বড় ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাশা করি।” এই উদ্যোগের নকশা ও পরিকল্পনা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘শুধু দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা। এ ছাড়া রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।”
পরিকল্পনার অভাব দেখছেন আরেক বিশেষজ্ঞ
ঢাকায় জলাবদ্ধতার পেছনে পরিকল্পনার অভাব দেখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘ঢাকার জলাবদ্ধতা তো আমাদের স্বেচ্ছাচারী নগরায়নের ফসল। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দূর করার পরিকল্পনা সরকারের আসলে নেই। ওয়াসা যে পরিকল্পনা করেছিল, এর পর সিটি করপোরেশন যখন দায়িত্ব নিল, তারপর থেকে সমন্বিত কিংবা পৃথকভাবে কোনো ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান করেওনি, নেয়ওনি।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “পরিকল্পনাহীনভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ শহরে কী পরিমাণ সবুজ এলাকা থাকা দরকার, কী পরিমাণ বৃষ্টির চাপ কমানো দরকার, সেটা কোন এলাকায় থাকবে, কিংবা এলাকাভিত্তিক–আসলে কোনো পরিকল্পনা নেই।”
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “ড্রেন, কৃত্রিম নালা–সেগুলোও আবার কঠিন বর্জ্যে পরিপূর্ণ। অথচ সারা বিশ্বে এখন জলাশয়ের যে গতি কিংবা ফ্লো–এটা নিয়ে কিন্তু ড্রেনের মডেলিং করা হয়।

সেখানে কোন এলাকায় কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে, সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। আমরা সেই সমাধান না খুঁজে এখনো অ্যাডহক বেসিসে টাকা বরাদ্দ দিয়ে জলাবদ্ধতার সমাধান খুঁজছি।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ মনে করেন, সরকার যতক্ষণ না উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হবে, ততদিন জলাবদ্ধতা থাকবে। তিনি বলেন, “খাল ও নদী অনেকটা শেষ। এখন যা আছে, সেটা দিয়ে অতিবৃষ্টি সামাল দেওয়া খুবই কঠিন। আমাদের আরবান এলাকা এত বড় হয়ে গেছে যে, আমাদের ভুগতেই হবে।”
তবে জলাবদ্ধতার ভোগান্তিটা ‘কিছুটা কমাতে’ সরকারের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে দখল হওয়া জলাশয় ও জলাধারগুলো উদ্বার করতে সরকারকে ‘বাস্তবসম্মতভাবে’ কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সোমবার সকালে জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ধীরগতিতে হয়। গুলশান ট্রাফিক বিভাগ এক বার্তায় জানিয়েছে, বনানী কবরস্থানের পর ঢাকা গেট-সংলগ্ন মূল সড়কের উভয় লেনে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া বনানী-কাকলী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পে নামার অংশেও হালকা জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করেছে।
অন্য জেলার পরিস্থিতি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (সকাল ৬টা পর্যন্ত) চট্টগ্রামে ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় এ সময় বৃষ্টি হয় ৯৭ মিলিমিটার। এ ছাড়া বগুড়ায় ৮৪, রংপুরে ৫১, সিলেটে ২৮, ময়মনসিংহে ২৭, বাঘাবাড়িতে ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি, ঢল, বন্যা ও পাহাড় ধসে গতকাল রোববার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে।
তবে সোমবার চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় কমেছে পানিবন্দী মানুষের সংখ্যাও।
সিলেট বিভাগের সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ–এই তিন জেলায় তুলনামূলক বন্যা বেশি। আর সিলেট জেলার সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া সারিগোয়াইন ও পিয়াইন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। তবে বরিশালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি বলে জানা গেছে। খুলনায় বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়নি।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন চরচার চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা প্রতিনিধি)

রাজধানীর আমিনবাজারে নির্মাণাধীন নর্থ ঢাকা ওয়েস্ট-টু-এনার্জি পাওয়ার প্ল্যান্টে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ দুবছর পর ২০২৮ সালের আগস্টে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি মেগা প্রকল্প। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিদিন ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন সলিড বর্জ্য পুড়িয়ে