ads

ইনকিলাব সেন্টার থেকে জাবের-জুমাদের পদত্যাগের পেছনে কী?

ইনকিলাব সেন্টার থেকে জাবের-জুমাদের পদত্যাগের পেছনে কী?
ইনকিলাব সেন্টার থেকে পদত্যাগ করেছেন জাবের-জুমা। ছবি: চরচা

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন সেন্টারের সভাপতি, নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যানসহ মোট ছয়জন। এক সঙ্গে সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের পদত্যাগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ওই সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের গত বুধবার ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। একই দিন পদত্যাগের ঘোষণা দেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও। তিনিও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এ ঘোষণা দেন। পদত্যাগীদের মধ্যে আরও রয়েছেন সেন্টারের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রায়হান ও উপ-নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ মিসবাহ।

পদত্যাগকারীদের একজনের সঙ্গে চরচা যোগাযোগ করে। তবে কী কারণে পদত্যাগ করেছেন সেটা পরিষ্কার করেননি তিনি। পদত্যাগ করা একজন ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাদের দায়িত্ব ছাড়ার পেছনে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে।

ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গড়ে ইনকিলাব মঞ্চ গড়ে তোলেন প্রয়াত শরীফ ওসমান বিন হাদি। পরে ইনকিলাব মঞ্চের সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। মূলত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ আন্দোলন ও ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ওই সংগঠনটির জন্ম হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন বই প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে আলোচনায় আসে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। তবে এর প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান হাদি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিহত হওয়ার পর এর কার্যক্রমে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন আসে।

ইনকিলাব সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন কয়েকজন সদস্যের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণার পর থেকে প্রশ্ন উঠেছে- কেন তারা হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিলেন।

বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেন্টারের সভাপতি, নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ করে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে। দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “আমি আব্দুল্লাহ আল জাবের, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান। শহীদ ওসমান হাদি শাহাদাতের পূর্বে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিলেও শেষ করে যেতে পারেননি। যেহেতু এটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় হতে জনতার আমানত হিসেবে পরিচিত ও পরিকল্পনাও এমনই ছিল, তাই আমরা বিগত ছয় মাস শাহাদাত পরবর্তী উত্থাপিত ওয়ারিশ সংক্রান্ত ইস্যু সমাধানের চেষ্টা করেছি। সমসাময়িক সময়ে আমরা নানাবিধ প্রোডাক্টিভ কাজের পরিকল্পনাও হাতে নিই, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে আপনারা দেখেছেন বিষয়গুলো আরো জটিল হয়ে পড়েছে।”

জাবের ইনকিলাব মঞ্চেরও সদস্য সচিব এবং হাদি হত্যা মামলার বাদী। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন তিনি। যা পরে (হাদির মৃত্যুর পর) হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

জাবের আরও লেখেন, “আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদিকে যে সম্মান দিয়েছেন, সেই সম্মানের স্বার্থে, তার ওয়ারিশদের দাবির প্রেক্ষিতে ও সমস্ত দলিল দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যে ভীষণ ভালোবাসা ও সম্মান আপনারা আমায় দিয়েছেন তার জন্য আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। আপনাদের অসম্ভব বিশ্বাসের দায় রক্ষা করতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কতখানি পেরেছি জানি না। তবে শহীদ ওসমান হাদি শাহাদাতের পর ঢাকা-৮, সেন্টারসহ সব অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থাকায় এই সংক্রান্ত হিসাব ব্যতীত আমার দায়িত্বকালীন সময়ের অন্যান্য সব হিসাব দ্রুততম সময়ে পাবলিক করা হবে। ইনসাফের লড়াই ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যে স্বপ্ন শহীদ ওসমান হাদি জাগিয়ে গিয়েছেন, তা বয়ে নেওয়ার যে বিশাল ভার খোদাতায়ালা আমাদের কাছে সমর্পণ করেছেন, তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দোয়া চাই। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার কেন্দ্রীক আমার যাত্রা এতটুকুই। হাসবি আল্লাহ।”

এ বিষয়ে জাবেরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা কলেও তিনি সাড়া দেননি। ইনকিলাব সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহর নম্বরে কল করা হলেও তিনি তোলেননি।

সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ পদত্যাগ করে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘আমি সালাহ উদ্দিন শুভ, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। মাত্র অল্প কিছুদিন আগে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম শহীদ ওসমান হাদির অসমাপ্ত কালচারাল লড়াই ও বিপ্লবটাকে কন্টিনিউ করার স্বপ্ন দেখে। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরই চেষ্টা করেছি কালচারাল কাজের পরিধি বাড়ানোর জন্যে। কিন্তু নানাবিধ অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ দিনে দিনে এই লড়াইটাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে শহীদ ওসমান হাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জনতার আমানত হিসেবে। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাই বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেছি এই সমস্যা সমাধানের। কিন্তু বিষয়গুলো এতটাই স্পর্শকাতর যা আমার জন্যে সামনে এগিয়ে চলার পথ বাধাগ্রস্থ করছে।”

শুভ আরও লিখেছেন, ‘‘আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদীকে যে সম্মান দিয়েছেন, সেই সম্মানের স্বার্থে, তার ওয়ারিশদের দাবির প্রেক্ষিতে ও সমস্ত দলিল দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপনাদের বিশ্বাসের দায় রক্ষা করতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কতখানি পেরেছি জানি না তবে শহীদ ওসমান হাদি শাহাদাতের পর ঢাকা ৮, সেন্টার সহ সব একাউন্ট ফ্রিজ থাকায় এই সংক্রান্ত হিসাব ব্যতীত আমার দায়িত্বকালীন সময়ের অন্যান্য সব হিসাব দ্রুততম সময়ে পাবলিক করা হবে। আমার এই ছোট্ট সংগ্রামের সময়ে আমি আমার মন-প্রান উজাড় করে দিয়েছি নতুন করে কালচারাল বিপ্লবটাকে জাগ্রত করতে। ইনসাফের লড়াই ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যে স্বপ্ন শহীদ ওসমান হাদি জাগিয়ে গিয়েছেন, যেখানেই থাকিনা কেন আল্লাহ্‌ তাআলা যেনো আমাকে সেই লড়াইটা চালিয়ে যাওয়ার তৌফিক দান করেন, এই দোয়া চাই। জিতটাই জীবন না, লড়াইটাই জীবন...।”

ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

পদত্যাগের বিষয় জানতে চরচা যোগাযোগ করলে সালাউদ্দিন শুভর কারণে বলতে চাননি। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘এটা তো আমরা পাবলিকলি ঘোষণাই করেছিলাম, বাকিটা আমরা প্রেস কনফারেন্স করে জানাব। আগামী দুই এক দিনের মধ্যেই সেটা জানাব।”

একসঙ্গে ছয়জনের পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা যা জানানো অফিসিয়ালি জানাব। আসলে এভাবে আমরা বলতে চাই না।”

কোনো চাপ ছিল কি না জানতে চাইলেও তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হন নি। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কোনো বিষয় আছে কি না জানতে চাইলে শুভ বলেন, ‘‘আগামীকাল কিংবা পরশু দিনের মধ্যেই বিস্তারিত জানতে পারবেন।”

পদত্যাগ করে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ফাতিমা তাসনিম জুমাও। সেখানে জুমা লিখেছেন, “আমি ফাতিমা তাসনিম জুমা, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। জুলাই পরবর্তী নানান রাজনৈতিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আমি ইনকিলাবে যুক্ত হই বাংলাদেশপন্থি কালচারের স্বার্থে। ইনকিলাব যখন কালচার থেকে কিছুটা পলিটিক্যাল হয়ে উঠতে শুরু করে, আমি শহীদ ওসমান হাদির নিকট অভিযোগ করছিলাম, কালচার থেকে যেন ফোকাস না হারাই। এরপর আমরা সকলে হাতে করে দিন রাত এক করে আস্তে আস্তে এই সেন্টার গড়ে তুলি।”

ওসমান হাদির মৃত্যুর পর নানাবিধ ওয়ারিশ সংক্রান্ত ঝামেলা সামনে আসে জানিয়ে জুমা লেখেন, “এই সকল সমস্যা চিন্তা করে ট্রাস্ট গঠনের চেষ্টা চালালেও শেষ করে যেতে পারেননি হাদি ভাই। শহীদ ওসমান হাদির পর জনগণ আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছে সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে আমরা জনতার আমানত রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। তবে ইদানীং সময়ে ওয়ারিশ সংক্রান্ত বিষয় নানান আলাপ আপনারা পাবলিক হতে দেখেছেন। যেখানে নানাবিধ অপপ্রচার ও মানহানিকর মন্তব্য প্রচারিত হয়েছে। আই ডোন্ট থিংক আই হ্যাভ দ্য রাইট টু ক্যারি দিজ বার্ডেনস হোয়াইল আই অ্যাম স্টিল লিভিং অন মাই প্যারেন্টস মানি। আমার বাবা-মা অন্তত এসব দেখা ডিজার্ভ করে না।”

জুমা আরও লেখেন, “আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদিকে যে সম্মান দিয়েছেন, সেই সম্মানের স্বার্থে, তার ওয়ারিশদের দাবির প্রেক্ষিতে ও সমস্ত দলিল দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেহেতু ভাইয়ের শাহাদাতের পূর্বের সকল অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছিল, এর পর হতে ও আমার দায়িত্বকালীন সময়ের সেন্টারের সকল হিসাব দ্রুততম সময়ে পাবলিক করা হবে। আপনাদের ভীষণ বিশ্বাস ও ভালোবাসার দায় ইনকিলাব মঞ্চ রাখবে ইনশাআল্লাহ। লড়াইটা আমাদের নিকট মুখ্য, লড়াই চলবে অন্য কোনো মাধ্যমে, অন্য কোনও উপায়ে। জিতটাই কেবল জীবন নয়, লড়াইটাই জীবন।”

জুমার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি সাড়া দেননি।

সম্পর্কিত