ads

চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঝুঁকির্পূণ বসতি কমছে না কেন?

চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঝুঁকির্পূণ বসতি কমছে না কেন?
বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম নগরীর ২৬টি পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয় প্রশাসনের। ছবি: চরচা

প্রতি বছর বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম নগরীর ২৬টি পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয় প্রশাসনের। মওসুম এলেই টানা বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ধসে সম্ভাব্য প্রাণহানি ঠেকাতে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের সরাতে মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি এবং তাদের পুনর্বাসনের কথা শোনা যায়। কিন্তু সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ পাহাড়ধসে প্রত্যেক বছরই ঘটছে প্রাণহানি। এত মৃত্যুর পরও কেন কমছে না ঝুঁকিপূর্ণ বসতি?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সংস্থগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তারা বলছেন, সংকট নিরসনে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ না থাকা, পুনর্বাসনে বাস্তবসম্মত উদ্যোগের অভাব, চট্টগ্রামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে দ্রুত নগরায়ণসহ প্রভাবশালীদের ভূমিকার কারণে এসব মানুষকে সরানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতি বছরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাহাড়গুলোতে বসবাসকারীদের তালিকা তৈরি করে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলে। কিন্তু সে কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি গত তিন বছর ধরে তালিকা হালনাগাদও করতে পারেনি প্রশাসন।

বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের লোকজন সেখান থেকে সরছে না।

২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে ভয়াবহ পাহাড় ও দেয়াল ধস এবং তীব্র পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যায় ১২৭ জন। পরের ১৯ বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টির সময় পাহাড় ও দেয়াল ধসের ঘটনায় মারা গেছে ২১০ জনের মতো।

চট্টগ্রামে ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট পাহাড় ধসে ১১ জন, ২০১১ সালের ১ জুলাই ১৭ জন, ২০১২ সালের ২৬ জুন ২৪ জন, ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই দুজন, ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই আটজন নিহত হয়, ২০১৭ সালের জুন মাসে একাধিক ঘটনায় সাতজন। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর চারজন, ২০২২ সালের ১৮ জুন চারজন নিহত হয়। অন্যান্য বছরগুলোতেও নিহত হন অনেকে।

গত মঙ্গলবার টানা বৃষ্টির মধ্যে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসে এক নারী ও নগরীর রহমান নগর এলাকায় ঘরের দেয়াল ধসে মারা যান এক দিনমজুর। আর সবশেষ বুধবার দুই শিশুর প্রাণ গেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল চরচাকে বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাবে চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঝুঁকির্পূণ বসতির সংখ্যা কমছে না। ২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির পর শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু তারা নিয়মিত বিষয়টি তদারকি না করে প্রতি বছর বর্ষার শুরু অথবা আসার আগে মিটিং করে দায় সারে।”

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে ঝুঁকি নিয়ে দরিদ্র মানুষেরাই বেশি থাকে। তাদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করাও সম্ভব হচ্ছে না। ওইসব জায়গায় যে পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, তা আগের অবস্থানেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যতটুকু পাহাড় আছে, তা বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর ঝুঁকির্পূণ বসতি স্থাপনকারীদের সরানোর জন্য বাস্তবধর্মী উদ্যোগ দরকার। নিম্ন আয়ের মানুষেরা জীবিকার প্রয়োজনেই শহর ছাড়তে চায় না। তাদের পুনর্বাসনে পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার।”

২০০৭ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে গঠন করা হয় ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’। পাহাড়ধসের পর এই কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করলেও গত ১৯ বছরে সভা করেছে মোট ৩১টি।

গত বছরের ২৬ মে কমিটির সর্বশেষ সভা হয়। কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করলেও তা র্কাযকর কোনো ফলাফল আনতে পারেনি।

জেলা প্রশাসনের ২০২৩ সালের তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি ২৬টি পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৫৮টি। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস ছিল ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবারের। আর ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩৮৩টি।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হলেও এ তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি। চলতি বছরও এ তালিকা অপরিবর্তিত রয়েছে বলে জানিয়েছে কয়েকটি সূত্র। এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের মধ্যে আগামী ১৩ জুলাই ওই কমিটির সভা হতে যাচ্ছে।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত চরচাকে বলেন, “পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনার হালনাগাদ তথ্য এখন পর্যন্ত নেই। ১৩ জুলাই পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির পরবর্তী সভা হবে; সেখানে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। আমরা এখন টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের শঙ্কায় সেখান থেকে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছি। নগরী ও জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং এবং তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।”

স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামে গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বুধবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৩৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রের্কড করা হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা পাহাড়ের নিচে বসবাসকারীদের সরতে বললেও তাতে কাজ হচ্ছে না।

গত মঙ্গলবার বিকেলেও দেখা গেছে, টানা বৃষ্টির মধ্যে চট্টগ্রামের লালখান বাজার মতিঝরনা, টাংকির পাহাড়সহ বিভিন্ন পাহাড়ে বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বললেও তারা সেখান থেকে সরেনি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাখাওয়াত জামিল বলেন, “ঝুঁকির্পূণ জেনেও লোকজন নিজ ঘরবাড়ি ফেলে যেতে চায় না। কিন্তু জীবনের চেয়ে তো বাড়িঘর গুরুত্বর্পূণ না। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের তরফ থেকে তাদের উচ্ছেদ না করে পুনর্বাসনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে নিম্নআয়ের লোকজনই বেশি বসবাস করে। তারা শহরকেন্দ্রিক কম ভাড়ার বাসায় থাকার জন্য পাহাড়গুলো বেছে নেয়।”

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, “পৌর সদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে যে স্থানে পাহাড়ধসে এক নারী মারা গেছেন, সেখানে মাইকিং করে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার কথা বলা হলেও তারা শোনেনি। ওই এলাকার কাছেই একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিল।”

চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ থানার ফয়’স লেক সংলগ্ন ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল এলাকা ও শান্তিনগর এলাকা, বায়েজিদ লিংক রোড এবং সলিমপুরের পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকা, ফিরোজ শাহ কলোনি, লালখান বাজার, টাঙ্কির পাহাড়, মতিঝরনা, বাটালি হিল ও পোড়া কলোনির পাহাড়, ষোলশহর স্টেশন-সংলগ্ন পাহাড়, বিজয় নগর, আকবর শাহ থানার বেলতলি ঘোনা, চান্দগাঁও থানার আমিন জুট মিলস পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, বার্মা কলোনি এলাকায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি আছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালায় পরিবেশ অধিদপ্তর।

জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে চট্টগ্রামবাসীর জন-জীবন। ছবি: সংগৃহীত
জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে চট্টগ্রামবাসীর জন-জীবন। ছবি: সংগৃহীত

বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা, উচ্ছেদ অভিযান এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে ঝুঁকি নিয়ে বাস করা পরিবারের সংখ্যা না কমার পেছনে সরকারের ‘সদিচ্ছার অভাবকে’ দায়ী করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।

চরচাকে তিনি বলেন, “বর্ষা এলেই প্রশাসন রুটিনওর্য়াক হিসেবে একটি সভা করে দায় সারে। বেশি বৃষ্টি হলে কোনো মওসুমে দুটি পর্যন্ত সভা করে। যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে, তারা নিম্নআয়ের মানুষ। আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি না থাকায় কম টাকায় তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে থাকছে।”

দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “সরকারের সদিচ্ছা থাকলে পাহাড় থেকে অবৈধ ও ঝুঁকির্পূণ বসতি সরানো সম্ভব। চট্টগ্রামের বেশির ভাগ পাহাড়ের মালিক সরকারি সংস্থাগুলো। তারা র্কাযকর উদ্যোগ না নেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি মালিকদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসাথে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিবন্ধন করে তাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসন অথবা সাশ্রয়ী মূল্যের বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে তারা যাতে পাহাড়গুলোতে পুনরায় বসতি করতে না পারে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।”

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের সহকারী পরিচালক মো. মুক্তাদির হাসান চরচাকে বলেন, “দ্রুত নগরায়ণের কারণে চট্টগ্রাম শহরে বাসযোগ্য ভূমির পরিমাণ কমছে। কিন্তু নগরকেন্দ্রিক মানুষের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কম দামে বাসস্থানের জায়গাও কমছে। সে কারণে তারা কম টাকায় ঝুঁকি নিয়ে হলেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে।”

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সেবা সংস্থার সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোক পাহাড়গুলোতে অবৈধ বসতির সুযোগ করে দেয়। কম ভাড়ায় তাদের বসতি গড়তে দিয়ে ওইসব পাহাড়ের বিভিন্ন ঢালু অংশ সমতল করার কাজও করিয়ে নেয়। পাহাড় দখল করে বসতি করে ভাড়া আদায় এবং তাদের দিয়ে পাহাড় কেটে সমতল করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এভাবেই নগরীর পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে।”

অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে উল্লেখ করে সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, “খবর পেলেই আমরা অভিযান চালাচ্ছি। এ বছরের মে পর্যন্ত নগরীতে ৪৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জরিমানাও আদায় করা হয়েছে ১২ লাখ টাকার মতো।”

সম্পর্কিত