ads

‘উগ্রবাদে’ অভিযুক্ত আতাউল্লাহ এনসিপিতে কীভাবে

‘উগ্রবাদে’ অভিযুক্ত আতাউল্লাহ এনসিপিতে কীভাবে
এনসিপির গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আতাউল্লাহ শাহ। ছবি: সংগৃহীত

উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তারের কয়েকদিনের মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে দলের গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আতাউল্লাহ শাহকে।

এনসিপি বলছে, আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক পোস্ট, বক্তব্য ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামি উগ্রবাদকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ ছিল, যা দলের ‘নীতি ও আদর্শের’ পরিপন্থী।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে তরুণদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে গত ৫ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কোনাবাড়ি এলাকার মিনি কক্সবাজার থেকে আতাউল্লাহসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

প্রশ্ন উঠেছে, উগ্রবাদে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে এনসিপির একটি মহানগর কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে এলেন? দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে স্থানীয় নেতারা বলছেন, সদস্য নির্বাচন ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। স্থানীয় পর্যায়ে তার অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক তথ্য তাদের জানা ছিল না।

আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?

আতাউল্লাহ শাহ এনসিপির গাজীপুর মহানগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব ছিলেন। পাশাপাশি গাজীপুর পুলিশ লাইন মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। আতাউল্লাহর বাবা একই মসজিদে ইমাম বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এনসিপির নেতারা।

পুলিশের ভাষ্য, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের কোনাবাড়ি থেকে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা কেন সেখানে জড়ো হয়েছিল, সে বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এই ঘটনায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল ফোন থেকে একটি ভিডিও উদ্ধার হয়, যা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভিডিওটিতে রাতের অন্ধকারে একাধিক বিস্ফোরণের দৃশ্য, উগ্রবাদী স্লোগান এবং ধারালো অস্ত্র হাতে ‘হুমকিমূলক’ বক্তব্য রয়েছে। ভিডিওটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রচারণামূলক একটি আরবি নাশিদও (সংগীত) যুক্ত করা হয়েছিল।

তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ভিডিওতে যেটিকে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বলে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেটি তা ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার ডুমুরিয়ায় চকলেট বোমার উপকরণ, পেট্রোল ও কিছু রাসায়নিক মিশিয়ে একটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। পরে ভিডিওটি সম্পাদনা করে তাতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ যুক্ত করা হয়, যাতে সেটিকে আরও ভয়াবহ দেখানো যায়।

এ ঘটনায় প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে ভিডিওটি প্রকাশ করে দাবি করেন, মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল। তবে ভিডিওটির উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে।

এনসিপি জানায়, আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে দলের নীতি ও আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণেই তাকে গাজীপুর মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব পদসহ দলের সব সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা গণমাধ্যমকে বলেন, আতাউল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে তার ফেসবুক পোস্ট, বক্তব্য ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ‘ইসলামি উগ্রবাদকে’ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অভিযোগ পাওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এনসিপিতে যেভাবে এলেন আতাউল্লাহ

আতাউল্লাহর এনসিপিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন দলের অনেকেই। তবে গাজীপুর মহানগর কমিটির নেতারা বলছেন, তার অতীত সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না।

এনসিপির গাজীপুর মহানগর আহ্বায়ক হুসাইন আল মামুন চরচাকে বলেন, “আতাউল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করতেন–এমন নেতাকর্মীদের কাছেও তিনি খোঁজ নিয়েছেন। এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তার পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। তাদের দাবি, তার বিরুদ্ধে উগ্রবাদের কোনো তথ্য আগে কারও জানা ছিল না।”

মামুন বলেন, “আমাদের কমিটির কেউই জানত না। আমি যাদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল, তাদেরও জিজ্ঞাসা করেছি। আমাদের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তার পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তার বাবা পুলিশ লাইন মসজিদের ইমাম। আর তিনি খতিব ছিলেন। এরপরও আমরা কোনো সংশ্লিষ্টতা পাইনি।”

এনসিপির এই নেতা জানান, বিষয়টি জানার পর দলীয়ভাবে দু-তিনটি টিমকে খোঁজখবর নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, আতাউল্লাহকে তারা আলাদাভাবে বাছাই করে কমিটিতে নেননি। এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো গঠনের সময় কেন্দ্র থেকেই যাচাই-বাছাই করে নাম পাঠানো হয়েছিল।

মামুনের ভাষ্য, “এখানে কমিটি কেন্দ্র থেকেই দেওয়া হতো। কেন্দ্র থেকে জুলাই আন্দোলনের সংশ্লিষ্টতা দেখা হতো। জুলাই আন্দোলনে যারা সক্রিয় ছিল, ভূমিকা রেখেছিল এবং আগের নাগরিক কমিটির কাজে সক্রিয় ছিল, তাদেরকেই মূলত এনসিপিতে রাখা হয়েছে।”

দলের কেন্দ্রীয় সূত্রও বলছে, সম্প্রতি জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির অংশ হিসেবে গাজীপুর সফরে গিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ পান কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর অভিযোগ যাচাইয়ের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আতাউল্লাহর ঘটনায় এনসিপির সদস্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং সাংগঠনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়; তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দলটি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে।

এনসিপির মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান মাহবুব আলমকে আতাউল্লাহর দলে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ ছাড়া দলের রাজনৈতিক পর্ষদের একাধিক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও কিছু বলতে চাননি।

সম্পর্কিত