আজকের দিনে ফর্মেশন ও ট্যাকটিস ছাড়া ফুটবল খেলা চিন্তাই করা যায় না। আবার কোচরা প্রায়ই বলে থাকেন, আমার একজন ‘নাম্বার এইট’ দরকার কিংবা দরকার ‘নাম্বার নাইন’। আমরা বুঝে ফেলি কোন পজিশনের খেলোয়াড় তার দরকার। কিন্তু কীভাবে? বুঝতে হলে আপনাকে জানতে হবে ফুটবলের আদি ফর্মেশন এবং তখনকার জার্সি নম্বর সম্পর্কে।
১৮৭২ সালের ৩০ নভেম্বর ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ড ক্রিকেট ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের ফুটবল ম্যাচ। পরে ফিফা এই ম্যাচটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচের স্বীকৃতি দেয়। এই ম্যাচের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, সেই অর্থে কোনো ফর্মেশনই সেদিন ছিল না। ইংল্যান্ড খেলেছিল ৭ কি ৮ জন ফরোয়ার্ড নিয়ে। ফর্মেশন বলা যেতে পারে: ১-১-৮ কিংবা ১-২-৭। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড খেলেছিল ৬ জন ফরোয়ার্ড নিয়ে, ফর্মেশন ছিল ২-২-৬।
১৮৭০-এর দশকে ধীরে ধীরে ফর্মেশনের ধারণা বিকশিত হতে থাকে। অর্থাৎ, মাঠে কীভাবে খেলোয়াড়েরা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেবে, তার সুনির্দিষ্ট কাঠামো দাঁড়িয়ে যেতে লাগল। ১৮৮০-এর দশকে এসে বলা যায় যে, ফুটবলের প্রথম প্রতিষ্ঠিত ফর্মেশন দাঁড়ায়। কেমন ছিল সেটি?
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সেটি ছিল: ২-৩-৫ বা গোলকিপারসহ হিসেব করলে ১-২-৩-৫, যা দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো। গোলকিপার থাকে পিরামিডের চূড়ায়। তাই একে পিরামিড ফর্মেশন বলা হয়। দীর্ঘদিন ফুটবল খেলায় এই ফর্মেশনের বাইরে কোনো কিছু ভাবাই হতো না। একটু এদিক-সেদিক করলেও মোটা দাগে ২-৩-৫-এ খেলা হতো।
১৯১১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার একটি ম্যাচে খেলোয়াড়দের নম্বর লেখা জার্সি পরে নামতে দেখা যায়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে পজিশনের সঙ্গে মিলিয়ে জার্সি নাম্বার পরার প্রচলন হয়।
এখানে ১ নম্বর জার্সি গোলকিপারের। রাইটব্যাক ২ নম্বর ও লেফটব্যাক ৩ নম্বর জার্সি পরত, যেভাবে আজকের দিনেও পরা হয়। এদেরকে বলা হতো ফুলব্যাক।
তারপর থাকত ৩ জন হাফব্যাক (তখন মিডফিল্ডার বলে কিছু ছিল না)। ডান পাশ থেকে এই ৩ জনের জার্সি নম্বর হতো ৪, ৫ ও ৬। এখনো হোল্ডিং মিডফিল্ডারদের অনেককে ৬ নম্বর জার্সি পরতে দেখা যায়।
সবশেষে থাকত ৫ জন ফরোয়ার্ড। ডান দিক থেকে এরা যথাক্রমে ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ নম্বর জার্সি পরত। এখানে বর্তমান সময়ের সাথে মিল পাওয়া যায়। ৭ ও ১১ নম্বর যথাক্রমে রাইট ও লেফট উইংগার, ৮ ও ১০ নম্বর ইনসাইড ফরোয়ার্ড, এবং ৯ নম্বর পরত সেন্টার ফরোয়ার্ড।
২-৩-৫ ফর্মেশনকে প্রথম ভেঙে দেন তৎকালীন আর্সেনালের কোচ হার্বার্ট চ্যাপম্যান। তিনি আর্সেনালে যোগ দেন ১৯২৫ সালে, ওই বছরের জুন মাসেই নতুন অফসাইড নিয়ম চালু হয়। এর আগ পর্যন্ত ১৮৬৬ সালের নিয়ম চালু ছিল, যেখানে বলা আছে– ফরোয়ার্ড পাসের সময় যে খেলোয়াড় পাস রিসিভ করবে, তার সামনে প্রতিপক্ষের অন্তত ৩ জন খেলোয়াড় থাকতে হবে।
এই নিয়মকে আগের সিজনে খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছিল কিছু ক্লাবের ফুলব্যাকরা। তারা অফসাইড ট্র্যাপে ফেলে ফরোয়ার্ডদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়তেন।
যা হোক, নিয়ম পাল্টে গেলে ফরোয়ার্ড পাস দেওয়া আগের চেয়ে সহজ হয়। এটাকে কাজে লাগানোর জন্য চ্যাপম্যান আনলেন ‘ডাব্লিউ-এম’ ফর্মেশন। ২-৩-৫ হয়ে গেল ৩-২-২-৩ ফর্মেশন। এখানে সেন্টার হাফব্যাক ৫ নম্বর জার্সিকে নামিয়ে আনা হলো সেন্টারব্যাক পজিশনে। হাফব্যাকে থাকল ৪ ও ৬ নম্বর। ৫ জন ফরোয়ার্ডের মধ্য থেকে দুজন ইনসাইড ফরোয়ার্ডকে নিচে নামিয়ে দেওয়া হলো। এরা হলো ১০ ও ৮ নম্বর জার্সি। নতুন এই ফর্মেশনে লম্বা পাসে কাউন্টার অ্যাটাক করতে সুবিধা হতো এবং অফসাইডের নিয়মে পরিবর্তনের পুরো ফায়দা তুলে নেওয়া যেত।
মাঠের একভাগের পাঁচজনকে দেখে মনে হবে ইংরেজি অক্ষর ‘ডাব্লিউ’, অন্য ভাগের পাঁচজনকে দেখে মনে হবে ‘এম’। ছবি: সংগৃহীতকালের বিবর্তনে কোচরা যখন ৪ জন ডিফেন্ডার ব্যবহার করতে শুরু করলেন, তখন হাফব্যাক ৪ নম্বরও নেমে এল সেন্টারব্যাক পজিশনে। অন্যদিকে ১০ নম্বর হয়ে উঠল দলের প্লেমেকার। আর ৮ নম্বর বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার।
এদিকে, অপরিবর্তিত থেকে গেল ৭, ৯ ও ১১ নম্বরের পজিশন। সেই হিসেবে ৭ ও ১১ নম্বর যথাক্রমে লেফট ও রাইট উইংগার, এবং ৯ নম্বর সেন্টার ফরোয়ার্ড।
অবশ্য, আধুনিক ফুটবলে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। প্রতিটি দলকে কোচ তার দর্শন অনুযায়ী সাজান, ফলে পাল্টে যায় ফর্মেশন। সেই সঙ্গে বদলে যায় জার্সি নম্বরের অবস্থান।
যেমন, ৪-৪-২ ফর্মেশনে ৪ ও ৫ নম্বর সেন্টার ডিফেন্ডার হিসেবে খেলে। অপরদিকে ৬ নম্বর জার্সি পরিহিত খেলোয়াড় মিডফিল্ডেই থেকে যায়। তবে আধুনিক সময়ে তাকে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায়ই বেশি দেখা যায়।
তথ্যসূত্র: ইনভার্টিং দ্য পিরামিড, উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা