ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আর কী কী উপায়ে ফুটবলকে বিক্রিযোগ্য পণ্য করে তুলতে পারেন, সেটা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে।
বর্ধিত কলেবরের ক্লাব বিশ্বকাপের মতো নতুন টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছেন। ১০৪ ম্যাচ আর ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের মতো ঘটনা–যে বিশ্বকাপকে ৬৪ দলের করে ফেলার ইচ্ছার কথাও এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন ইনফান্তিনো। কিন্তু ইনফান্তিনোর ‘ট্র্যাক রেকর্ড’ বলে, তিনি সেখানেই থামার লোক নন! ফুটবলকে তিনি আরও যেভাবে পারেন, বেচেই ছাড়বেন।
এবং সে ধরনেরই এক খবর এবার এসেছে সামনে। ফিফা বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ত্বের একটা অংশ ফিফার বাইরের তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা আঁটছেন ইনফান্তিনো। তার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিতর্ক তো এর আগেও অনেকবার হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় বিতর্ক আরও উসকে উঠবে। কারণ, যে প্রতিষ্ঠান গঠন করে সেখানে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ত্বের কিছু অংশ বিক্রির পরিকল্পনা ইনফান্তিনোর, সে প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দিয়েই পরিচালিত হতে পারে বলে জানাচ্ছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদন।
ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ ‘বেচে দেওয়ার’ পরিকল্পনার কথাও টাইমস-ই সবার আগে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক দিকগুলো দেখার জন্য ফিফার বাইরে আলাদা একটি কোম্পানি গড়ে তোলা হবে।
ফিফা মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করার কথা জানিয়েছে বটে, তবে সেখানে বিশ্বকাপের স্বত্ত্ব বিক্রির কথা কিছু জানায়নি তারা। এফএফই কী করবে? ফিফা জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি ফিফার মালিকানাধীনই থাকবে। ফিফার বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট-সংক্রান্ত দিকগুলো দেখাশোনা করবে তারা। ফিফার পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে এখন শুধু সদস্য দেশগুলোর অনুমোদনের অপেক্ষা।
অন্য যেকোনো বেচা-বিক্রি বা ফুটবলকে বাণিজ্যিকীকরণের পরিকল্পনায় ফিফা যে মুলাটা ঝুলায়, ‘ফুটবল উন্নয়ন তহবিল’-এর সেই মুলা এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ঝুলানো হয়েছে। ফিফা বলেছে, এফএফই-র মাধ্যমে ফুটবল উন্নয়ন তহবিলে ১০০০ কোটি ডলার বাড়ানোর লক্ষ্য তাদের। এ জন্য এই বছরের শেষদিকেই ৪২০ কোটি ডলার তোলা হবে।
এফএফই-র কাছে ফিফার বাণিজ্যস্বত্ত্বের ‘খুব ছোট’ ও ‘নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না দেওয়ার মতো’ একটা অংশ বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছে ফিফা। এফএফই-র প্রাথমিক মূল্যায়ন ধরা হয়েছে ২০০০ কোটি ডলার!
এসব ফিফার বিবৃতি। সেখানে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের কথা কিছু বলেনি তারা। তবে দ্য টাইমস তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ফিফার পরিকল্পনা সফল হলে যে কোম্পানিটি গঠিত হবে, সেটি ফিফার বাইরে থেকেই বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক দিকগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। অবশ্য ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও এটা বুঝে নিতে তো কষ্ট হয় না যে, ফিফার বাণিজ্যিক স্বত্ত্ব কিনতে টাকা ঢালবে যে প্রতিষ্ঠান, তারা বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের ফিফার সবচেয়ে বেশি সোনার ডিম পাড়া হাঁসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সে টাকার কয়েকগুণ বেশি তুলতে চাইবেই!এখানে টাইমস-এর প্রতিবেদনের যে অংশটি আরও বেশি বিতর্কিত মনে হতে পারে, তা হলো–এফএফই নামের যে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা ফিফার, সে পরিকল্পনায় যুক্ত আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ লোকজন। ইনফান্তিনো-ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বলার কিছু আর নেই। নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে তিতিবিরক্ত ট্রাম্পকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ নামের এক পুরস্কার হঠাৎ আবিষ্কার করে সেটার প্রথম বিজয়ী ঘোষণা করেছে ইনফান্তিনোর অধীন ফিফা। ট্রাম্পের সঙ্গে গাজা যুদ্ধ নিয়ে শান্তি আলোচনায়ও ইনফান্তিনো সঙ্গী হয়েছিলেন! এর মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে, ইনফান্তিনো ফিফা ছাড়লে ট্রাম্প তাকে জাতিসংঘের মহাসচিবের পদের জন্যও সুপারিশ করতে পারেন!
সেটা না হলেও ইনফান্তিনোর জন্য অন্য বিকল্প সম্ভবত তৈরি হয়েই আছে! টাইমসের প্রতিবেদন তা-ই বলছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর আবার ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হলে ইনফান্তিনো দায়িত্বে থাকবেন ২০৩১ সাল পর্যন্ত। সেটা শেষ হলে এই নতুন কোম্পানির (এফএফই) কমিশনার হিসেবে ইনফান্তিনোকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে বলে জানাচ্ছে টাইমসের প্রতিবেদন।
উয়েফার আপত্তি
ফিফার বিশ্বকাপ বিক্রি করার এই পরিকল্পনা নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিবাদ জানিয়ে রেখেছে ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।
বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, “এটা (বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ত্ব বা এর অংশবিশেষ বিক্রি করা) এমন একটা সীমা, যা অতিক্রম করা ফুটবল পরিচালনা করা কোনো সংগঠনের কখনোই উচিত নয়।” ফুটবলের ‘আত্মা’ কখনো বেচাকেনার জিনিস নয় জানিয়ে উয়েফা আরও বলেছে, “বিশেষ করে কারা এই পরিকল্পনার কারণে আর্থিকভাবে লাভবান হবে, সেটা স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত এমন পরিকল্পনা ভীষণ উদ্বেগজনক।”
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক তদন্তের দাবি যুক্তরাষ্ট্রেই
ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ ‘বেচে দেওয়া’ এবং সেই প্রতিষ্ঠানে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ লোকদেরই থাকার এই খবর সামনে এল এমন সময়ে, যখন ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছে ইনফান্তিনোকে। কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন আগামী ৯ আগস্টের মধ্যে ট্রাম্প, তার প্রশাসন এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ফিফা ও ইনফান্তিনোর সব ধরনের যোগাযোগের নথি জমা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
রোববার এক চিঠিতে রাসকিন ফিফার কাছে দুটি বিষয় জানতে চেয়েছেন। এক, ট্রাম্প, তার প্রশাসনের কোনো সদস্য, তাদের স্বজন বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ফিফা কিংবা ইনফান্তিনোর দিক থেকে কোনো অর্থ, উপহার, সম্মাননা বা অন্য কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না। দুই, দেওয়া হয়ে থাকলে তার বিস্তারিত তথ্য।
এ ছাড়া তিনি মায়ামি ও নিউইয়র্কে ফিফার কার্যালয়ে দর্শনার্থীদের নিবন্ধন তালিকা (ভিজিটর লগ) চেয়েছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগের রেকর্ড রেখেছেন। কোনো এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হয়ে থাকলে সেগুলো সংরক্ষণের আহ্বানও জানিয়েছেন রাসকিন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছে। এই আয়োজনের সময়ে এবং এর আগে থেকেই ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই এই অনুসন্ধানের আহ্বান জানালেন রাসকিন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি বিশ্বকাপের সময়ে, যা ফুটবলে কালিমাই লেপে দিয়েছে! যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাম্প ইনফান্তিনোকে আহ্বান জানান; পরে ফিফা বালোগুনকে খেলার অনুমতি দেয়। যদিও ফিফা জানিয়েছে, তারা এ সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিয়েছে।
রাসকিন ফিফার টিকিট বিক্রির নীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এবার ‘ডাইনামিক প্রাইসিং পদ্ধতি’তে টিকিট বিক্রি করেছে ফিফা, যে পদ্ধতিতে টিকিটের দাম সাধারণের নাগালে আর থাকেনি। বিশ্বকাপ হয়ে গেছে শুধুই বড়লোকদের দেখার সুযোগ করে দেওয়া টুর্নামেন্ট! এই প্রাইসিং পদ্ধতির ব্যবহার এবং বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ফিফার যোগাযোগের সব নথি চেয়েছেন রাসকিন।
তবে হোয়াইট হাউস এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, ট্রাম্পের নেতৃত্বের কারণেই ইতিহাসের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হয়েছে!