আবাসন সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করতে গিয়ে জনসমর্থন কমে আসা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সঙ্গে রাজধানীতে বিশাল একটি পার্ক গড়ে তুলতে চাওয়া সিউলের মেয়রের সবুজ এলাকা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
মেয়র ওহ সে-হুনের মতে, সিউলের ‘সবুজের ঘাটতি’ পূরণে ওই উন্মুক্ত এলাকা প্রয়োজন। এ জন্য পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে ৩০০ হেক্টর (৭৪০ একর) আয়তনের জায়গাটি সংস্কার ও পরিষ্কার করতে হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
রয়টার্সকে ওহ বলেন, রাজধানীর সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত পার্কের ‘এক সেন্টিমিটার জায়গাও’ প্রেসিডেন্ট লি প্রস্তাবিত আবাসিক ভবনের জন্য ছেড়ে দেবেন না। বাড়ির দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় তা প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার ওপরও চাপ তৈরি করেছে।
দুই দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরটির মেয়রের দায়িত্ব পালন করা ওহ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইয়ংসান পার্ক নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের জায়গা হিসেবে এটি ব্যবহারের বিষয়ে কোনো পরিস্থিতিতেই আমি একমত হতে পারি না।”
রাজনৈতিক মুখোমুখি অবস্থান নীতিগত দ্বন্দ্বও তুলে ধরছে
লি ও ওহের বিরোধ বিশ্বজুড়ে নগরনীতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তা হলো, তীব্র আবাসন সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে কীভাবে বড় শহরগুলোকে বাসযোগ্যতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট না করে এগোতে হবে।
প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ (প্রতি বর্গমাইলে ৪০ হাজার) বসবাস করায় লন্ডন, নিউইয়র্ক বা টোকিওর চেয়েও সিউল বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। এতে আবাসন ও সবুজ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যালাপ কোরিয়ার শুক্রবারের এক জরিপে দেখা গেছে, গত দুই মাসে লির জনসমর্থন কমে রেকর্ড ৩৭ শতাংশে নেমেছে। জনসমর্থন কমার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আবাসন ও রিয়েল এস্টেট নীতি। কোরিয়া রিয়েল এস্টেট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সিউলে অ্যাপার্টমেন্টের দাম টানা রেকর্ড ৮৬ সপ্তাহ বেড়েছে।
লির মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্রেটিক পার্টি জুনের স্থানীয় নির্বাচনে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেলেও সিউলের মেয়র পদে রক্ষণশীল ওহ সে-হুনের পুনর্নির্বাচন ছিল দলের জন্য উল্লেখযোগ্য ধাক্কা। ফলে প্রেসিডেন্টের নীতির বিরুদ্ধে নগর সরকারের সরাসরি প্রতিরোধ ও অচলাবস্থার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিরোধী দলের হয়ে দুবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ওহকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ২০৩০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত লি কেবল এক মেয়াদ (পাঁচ বছর) দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। পরবর্তী নির্বাচনে তার দলকে তার নীতির উত্তরাধিকার রক্ষার জন্য লড়তে হবে।
সিউলকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হান নদীর কাছে বিস্তৃত এই জায়গাটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর একটি উন্মুক্ত পার্কে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। প্রথমে জাপানের ঔপনিবেশিক শাসকেরা এবং পরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান যুদ্ধ-পরবর্তী মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছে।
তবে আগস্টে লি ওই এলাকার একটি অংশে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে রাজধানীতে আবাসনের জন্য ব্যবহারযোগ্য জমি বাড়াতে সিউলের গ্রিনবেল্ট এলাকা ও শহরতলির গলফ কোর্সগুলোর ওপর থাকা সুরক্ষা তুলে নেওয়ার প্রস্তাবও দেন।
পার্কের জায়গায় আবাসিক ভবন নির্মাণ করতে জাতীয় পরিষদের পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে, কারণ আইন অনুযায়ী এলাকাটি সুরক্ষিত।
‘পানি ও পাহাড়ের শহর’, তবু সবুজের সংকট
শুক্রবার লি তার রিয়েল এস্টেট নীতির ব্যাপারে তীব্র সমালোচনার কথা স্বীকার করলেও নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কোনো ঘোষণা দেননি।
ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে ওই এলাকার একটি অংশ ব্যবহারের বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবে। তবে জনমত তৈরি হওয়ার পরই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জোর দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় সেগুলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
লি সরকারের চালু করা বন্ধকি ঋণের বিধিনিষেধ ও বাড়তি করকে আবাসন সংকটের জন্য দায়ী করা অনেকের মধ্যে ওহও রয়েছেন। তার যুক্তি, ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ আবাসনের চাহিদা কমাতে পারেনি; বরং বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।
মেয়র বলেন, ঋণের বিধিনিষেধ তরুণ ও প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে চাওয়া ব্যক্তিদের ওপর বেশি চাপ ফেলছে। কারণ, “যাদের হাতে প্রচুর নগদ অর্থ আছে, তাদের জন্য বাড়ি কেনা আরও সহজ হয়ে যায়। অন্যদিকে, যেসব তরুণের হাতে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থ নেই, তারা নিজেদের প্রথম বাড়ি কেনার সুযোগ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন।”
ভূমি মন্ত্রণালয় বলেছে, অতিরিক্ত ঋণের প্রবণতা ঠেকাতে দেশটির বন্ধকি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি তরুণ ও প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে যাওয়া ক্রেতাদের জন্য ঋণ নেওয়ার নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
সিউলের বাসিন্দাদের কাছে পার্কটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—এমন প্রশ্নের জবাবে ওহ রাজধানীকে ‘পানি ও পাহাড়ের শহর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তার মতে, এই শহরে সবুজের জন্য মানুষের তৃষ্ণা রয়েছে। সিউলের ৬০ শতাংশ মানুষ অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বসবাস করেন।
নদীর পাশাপাশি সিউলকে ঘিরে রয়েছে চারটি অভ্যন্তরীণ ও চারটি বাইরের পাহাড়। ফলে শহরের বাসিন্দারা দূর থেকে সহজেই সবুজ দেখতে পান।
তবে প্রতিদিনের জীবনে—যেমন কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় যে সবুজ জায়গা মানুষ সরাসরি উপভোগ করতে পারেন, বিষয়টি ভিন্ন বলে মনে করেন ওহ। তার ভাষ্য, লন্ডনের বাসিন্দারা যে পরিমাণ সবুজের সুবিধা পান, সিউলের বাসিন্দারা তার মাত্র এক-চতুর্থাংশ পান।