দিনটি ছিল ঈদের ঠিক আগে আগে। এ দেশের মানুষ অপেক্ষা করছিল উৎসবকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতিতে। আমাদের এই বাংলাদেশে এমনিতেই সব মানুষের আন্দোলিত হওয়ার মতো উপলক্ষ কম আসে। তাই ঈদ আসে সাধারণ মানুষের কিছুটা খুশি থাকার, একটু নির্ভার থাকার নিশ্চয়তা নিয়ে।
অথচ, মাসদুয়েক আগের ওই ঈদের সকালটি শুরু হয়েছিল ৬ নবজাতক শিশুর অকালমৃত্যুর ভার মনে চেপে। ঈদের আনন্দ অনেকটাই মাটি করে দিয়েছিল সেই ঘটনা। আর ওই ৬ নবজাতকের পরিবার ও স্বজনদের হৃদয়ের ভারের কথা নাইবা তুলি। শিশু হারানোর বেদনার সাথে আর কোনো দুঃখের তো তুলনা চলে না।
৬টি শিশু মারা গিয়েছিল কীভাবে? একটু সবিস্তারে স্মরণ করে নেওয়া যাক। রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঈদের আগের দিন তথা গত ২৭ মে ভোরে একসঙ্গে ছয় শিশু মরে গিয়েছিল। হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এই শিশুদের মৃত্যু হয়। হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন তখন জানিয়েছিলেন, ১১ শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ জন মারা যায়। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো অভিযোগের আঙুল তোলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দিকে। আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সঠিক কারণ জানা যাবে তদন্তের পর।
পরে তদন্ত সরকারের তরফেই হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর মগবাজারের আদ–দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আদ-দ্বীন হাসপাতালের গাফিলতিতেই ৬ শিশু মারা গেছে। পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার প্রমাণ পায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ওই সময় তদন্ত কমিটির বরাত দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ২ নম্বর পোস্ট অপারেটিভ কক্ষটি মোটেও হাসপাতাল পরিচালনার উপযোগী ছিল না। ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ উপস্থিত ছিল। দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন না থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড়ে যায়, যা নবজাতকদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে সেই ৬ নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে ছিল হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ২ নম্বর পোস্ট অপারেটিভ কক্ষটি মোটেও হাসপাতাল পরিচালনার উপযোগী ছিল না। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
পরে এ ঘটনায় আদ্–দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে সরকার। এই ঘটনায় খুবই আশ্চর্যজনকভাবে শুরু হয় রাজনৈতিক বাহাস। আশ্চর্যজনক– এই শব্দটি ব্যবহার করতে হচ্ছে এই কারণেই যে, সরকারি তদন্তের পর একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করায় এ দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নাহ, আরও কঠোর শাস্তির দাবিতে নয়। বরং এই লাইসেন্স বাতিল করা কেন অনুচিত, সেই মর্মে! লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত মোটেই সঠিক হয়নি—এমন মন্তব্যও পাওয়া গিয়েছিল বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে।
তো, ৬ শিশুর মৃত্যুর এই ঘটনায় মামলা হয়। অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগ এনে রমনা থানায় মামলা করেন মৃত এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান। মৃত নবজাতকদের পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছিলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে মারা যাওয়া ৬ শিশুর পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে দিতে সম্মত হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এরপর থেকে আদ্–দ্বীন হাসপাতাল বন্ধই ছিল, লাইসেন্স বাতিল অবস্থাতেই ছিল। অবশেষে গত ২৭ জুলাই তিনটি শর্তে লাইসেন্স ফেরত পায় রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দেওয়া অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। সরকারি তরফে বলা হচ্ছে, লাইসেন্স বাতিলের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করা আপিলের প্রেক্ষিতে একটি কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেয়। কমিটির দেওয়ার প্রতিবেদন সন্তোষজনক হওয়ায় তিন শর্তে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করে পুনরায় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত ৩টি হলো—১. দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস অর্ডিন্যান্স ১৯৮২-এর নির্দেশনা প্রতিপালন অব্যাহত রাখতে হবে, ২. লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ডিউটি ডাক্তার ও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে এবং ৩. লাইসেন্সের শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এতটুকু জানার পর মনে হতেই পারে যে, নিশ্চয়ই গত ২ মাসে এমন কোনো বৈপ্লবিক উন্নয়ন ওই হাসপাতালটিতে ঘটেছে, যাতে করে অব্যবস্থাপনা আর থাকবে না বলেই মনে করে সরকারি কমিটি। হ্যাঁ, সদিচ্ছা থাকলে তো হতেই পারে। তবে হাসপাতালটির অব্যবস্থাপনা নিয়ে যে ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল, সেগুলো যে আবার উঠবে না, তার কি গ্যারান্টি আছে? যে অর্ডিন্যান্সের নির্দেশনা প্রতিপালনের শর্ত দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে, সেটি যে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরি স্থাপনের পূর্বশর্ত মূলত। ওটি না মানলে কেউ বেসরকারি হাসপাতাল বা ল্যাবরেটরি চালুই করতে পারবে না। অর্থাৎ একেবারে ন্যূনতম মান্যতা। তা সেটি কাগজে–কলমে মানার ঘোষণা দিয়েও তো মানছিলই না হাসপাতালটি। ওই কারণেই যে ৬ শিশুর মৃত্যু হলো, তা তো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই বোঝা যায়। তাহলে, শিশুদের মৃত্যুর মতো অপরাধের বিপরীতে কতটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো আসলে? কেবলই দুই মাসের জন্য লাইসেন্স বাতিল? তাতেই ৬ ‘খুন’ মাফ?
আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ এন্তার। চিকিৎসক নিয়ে আছে, চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে আছে। রোগীদের প্রতি অবহেলা নিয়ে তো আছেই। আবার এই দেশে জনসংখ্যা বেশি, জনপ্রতি চিকিৎসকের সংখ্যা ও অন্যান্য সুবিধাও অপ্রতুল বটে। বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবাকে দেওয়ার অর্থ হলো, অন্তত যাদের পকেটের জোর কিছুটা হলেও আছে, তারা যেন সেটি পেতে পারে। এখন সেই খাতের মান বজায় রাখার স্বার্থেই সরকার অর্ডিন্যান্স করেছে। সেটিও না মেনে যখন অব্যবস্থাপনার কারণে নবজাতক শিশুদের প্রাণ যায়, তখন কি বেসরকারি স্বাস্থ্যকাঠামোর অতি লোভকেই দায়ী করা উচিত না? নাহলে টাকার বিনিময়েও কেন সঠিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য করুণাপ্রার্থী হতে হবে নাগরিকদের?
কিন্তু সেটিই হয়ে চলেছে। সরকার বেসরকারি স্বাস্থ্যকাঠামোকে নিয়মে বাঁধতে পারেনি, মান রক্ষায় কঠোরও হতে পারেনি। যদি হতে পারত, তাহলে এভাবে জন্ম নেওয়ার পর পরই বেসরকারি হাসপাতালে ওই ৬ শিশুর মৃত্যু হতো না। এখন এই ৬ শিশুর মৃত্যুর পরও যদি সরকার কঠোর হতে না পারে সেভাবে, অব্যবস্থাপনা হলে কঠোর ব্যবস্থার মুখোমুখি করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারে, তাহলে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা থামবে কীভাবে? বেসরকারি উদ্যোক্তারা দেখতেই তো পাচ্ছেন যে, মাত্র জন্ম নেওয়া শিশুদের মেরে ফেললেও দুই মাসের মধ্যেই আবার ব্যবসায় ফিরে আসা যায়! তাহলে আর তারা ‘সিরিয়াস’ হবে কেন?
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আসলে সরকারি তরফ থেকে এই বার্তাই এলো যে, ‘গায়ে জোর’ থাকলে স্বাস্থ্যখাতের বেসরকারি উদ্যোক্তারা যা খুশি তাই করেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে! সুযোগ তাদের জন্য অবারিত ও অসংখ্য। সাধারণের ভোগান্তি কিংবা অকালে স্বজন হারানো সেখানে কোনো বাধা হতে পারবে না।
তা ‘যেমন খুশি তেমন চালানো’র এমন নীতির এই দেশে তবে কীভাবে স্বাস্থ্যকাঠামোয় শৃঙ্খলা আসবে? কোনো কিছুই তো আর আকাশ থেকে টুপ করে পড়বে না বা আলাদীনের চেরাগের দৈত্য ‘চাহিবামাত্র’ সরবরাহ করবে না, তাই না?
হয়তো আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা সেই ভরসাতেই আছেন। আর বাচ্চা হারানো ওই ৬ মা আছেন কেবলই চোখের জলের ভরসায়। একমাত্র অবিরত কান্নাই যে তাদের মনের ক্ষততে কিছুটা হলেও উপশমের সঞ্চার করতে পারে। সব সম্ভবের এই দেশে তাদের আর কিইবা করার আছে, শুধু কাঁদা ছাড়া?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা