ঢাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের দৈনন্দিন জীবনে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম গ্যাস সংকট। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না থাকার সুযোগ নিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তার পকেটে। অথচ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না পেয়েই দাম মেটাতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার চাওয়ার বা গ্যাস বিল মওকুফের বিধান থাকলেও সে বিষয়ে তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে কোনো ভাষ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
তিতাসের পাইপলাইনে গ্যাস না থাকা এবং বাজারে চড়া দামে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বিদ্যুচ্চালিত চুলা কেনার আকস্মিক ধাক্কায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর পারিবারিক বাজেট একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। গ্রাহক পর্যায় থেকে শুরু করে শিল্প কলকারখানা সবখানেই এখন হাহাকার।
আইন অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়ার কথা থাকলেও মাসের পর মাস সেবা না পেয়েও বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসী, যা তৈরি করছে গভীর এক আইনি ও সামাজিক বৈষম্য।
অথচ গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি সেবায় বৈষম্য বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো সমর্থন করে না। গ্যাস সরবরাহে বৈষম্য সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২ অনুযায়ী কমিশন জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে বাধ্য। অথচ এ নিয়ে সম্প্রতি তিতাস গ্যাস কার্যালয়ের সামনে নাগরিক পরিসর থেকে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তারা এই বৈষম্য নিরসন এবং গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এক মাসের বিল মওকুফের আহ্বান জানালেও তিতাসের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই মহানগরে বসবাসকারী মানুষের হেঁসেলে একটু উঁকি মারলেই এই দাবির স্বপক্ষে অজস্র যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে। মোহাম্মদপুরের আদাবরের বাসিন্দা আরিফুল ইসলামের গল্পটা নগরীর হাজারো পরিবারের প্রতিচ্ছবি। একটি বেসরকারি সংস্থার সহকারী হিসাবরক্ষক আরিফুল সাত সদস্যের পরিবার সামলাতে এমনিতেই হিমশিম খান। ঘরে বৃদ্ধ মা-বাবা এবং নিজে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রিকের রোগী হওয়ায় বাইরের তেল-ঝোল খাবার খাওয়া নিষেধ। অথচ গত দশ দিন ধরে বাসায় রান্নার জন্য রাখা সাময়িক গৃহপরিচারিকা কাজ না করেই ফিরে যাচ্ছেন চুলায় গ্যাস না থাকায়। ফলে ঘরে বাজার থাকলেও বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বাড়তি দামে কিনে খেতে হচ্ছে খাবার। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাজার করতে গিয়ে নিজেই রিকশায় করে সিলিন্ডার কিনে এনেছেন।
টাউন হল বাজার থেকে রিকশায় এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে বাসায় ফেরার সময় আরিফুল ইসলাম বলেন, “এই যে আরেকটা বাড়তি খরচ টেনে নিয়ে যাচ্ছি বাসায়। ডেলিভারি নিলে আলাদা চার্জ দিতে হতো। তাই বাজার করতে এসে এক খরচে দুই কাজ করলাম।”
তিনি বলেন, “শনিবার নতুন চুলা কিনেছি। পাইপলাইনের চুলায় সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ–অনেকেই সেটা জানেন না।”
আরিফুলের হিসাব অনুযায়ী, শুধু আগস্ট মাসেই বাড়তি অন্তত ৫ হাজার টাকা ব্যয় হবে। অথচ স্বাভাবিক সময়েও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। তার ভাষায়, “বেঁচে থাকতে হলে এই বাড়তি চাপ সামাল দিতেই হবে।”
বিইআরসি নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫২৮ টাকা হলেও বাস্তবে বাজারে তাকে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। পাশাপাশি তিতাসের চুলায় সিলিন্ডার ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতে কিনতে হয়েছে নতুন চুলা। আগস্ট মাসে শুধু রান্নার খরচ সামলাতেই তার বাড়তি গুনতে হচ্ছে অন্তত ৫ হাজার টাকা।
এমন পরিস্থিতি শুধু আরিফুল ইসলামের নয়। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের গৃহিণী সানজিদা বলেন, “সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর আগে না নাস্তা তৈরি করে দিতে পারি, না টিফিন দিতে পারি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, রাত নেমে আসে, কিন্তু চুলায় নিভু নিভু আগুনও আসে না। আগে আধা ঘণ্টার মধ্যে রান্না শেষ করে অন্য কাজে মন দিতে পারতাম। এখন ৩-৪ ঘণ্টা চেষ্টা করেও ভাত ফোটানো যায় না।”
সানজিদার স্বামী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শফিক আহমেদ বলেন, “মনে হচ্ছে পকেটের ছিদ্র দিন দিন বড় হচ্ছে। টাকাগুলো কোথায় যেন গায়েব হয়ে যাচ্ছে। অথচ কাউকে দোষও দিতে পারছি না।”
গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় নগরবাসী বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে ইন্ডাকশন (বিদ্যুৎচালিত) চুলা কিংবা চড়া দামের এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয় সীমিত আয়ের মানুষের পারিবারিক বাজেটকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। নতুন করে বৈদ্যুতিক চুলা কেনা কিংবা এলপিজি রিফিলের জন্য কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস না পেলে বিলও নয়
গত বৃহস্পতিবার তিতাস গ্যাসের কার্যালয়ের সামনে গ্যাসের দাবিতে বিক্ষোভ করেন ভোক্তারা। সেখানে সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স গ্যাস না পাওয়া মাসের বিল আদায় না করার দাবি জানান। তিনি বলেন, “ভোক্তা পণ্য পাবেন না, অথচ তাকে দাম দিতে হবে–এটি নৈরাজ্য।”
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, “ভোক্তার অধিকার আছে বিইআরসির কাছে বিল মওকুফের আবেদন করার। প্রয়োজনে তিতাসের সংযোগ বিচ্ছিন্নও করে দিতে পারেন, বিশেষ করে যারা মাসের পর মাস গ্যাস না পেয়েও বিল দিয়ে আসছেন।”
মিজানুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে বিইআরসির আইনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।”
আইন কী বলছে?
গ্রাহক পর্যায়ে জ্বালানি সেবায় বৈষম্য বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো সমর্থন করে না। গ্যাস সরবরাহে বৈষম্য সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২ অনুযায়ী কমিশন জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে বাধ্য। একই আইনের ধারা ৩৪ অনুযায়ী ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির গ্রাহক বৈষম্যের শিকার হলে কমিশনের কাছে আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া গ্যাস বিপণন বিধিমালায় বলা হয়েছে, বিতরণ কোম্পানি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য। সরবরাহ ব্যাহত হলে ওই সময়ের বিল মওকুফ দাবি করার আইনি অধিকার গ্রাহকের রয়েছে।
অর্থাৎ, গ্রাহকের আইনি অধিকার উপেক্ষা করেই পেট্রোবাংলা ও বিতরণ কোম্পানিগুলো বিল আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ না দিয়ে বিল আদায় করাকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রাহক এ বিষয়ে আইনি প্রতিকার চেয়েছেন বলে জানা যায়নি। প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় রান্নার কাজে অনেকেই বিদ্যুচ্চালিত চুলার দিকে ঝুঁকছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকায় চাহিদা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। অন্যথায় আরও বেশি লোডশেডিং করতে হতো। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানায়, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। গত ৩০ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। দিনের বেলায় অফ-পিক সময়েও লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট। তবে ঢাকার তুলনায় বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সংকটে রয়েছে সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্পকারখানা।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের হিসাবে, সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশে। চরচাকে তিনি বলেন, “মাসের প্রথম সাত কর্মদিবসের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হলেও উৎপাদন বন্ধ থাকায় সেই অর্থের জোগান নিয়ে মালিকরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।” পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে সফট লোন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সার্বিকভাবে, গ্যাস সংকট এখন আর কেবল রান্নার চুলার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিদ্যুৎ বিভাগ হয়ে ধাক্কা দিচ্ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায়। আইনের সঠিক প্রয়োগ, বিইআরসির কার্যকর নজরদারি এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর এই বাড়তি খরচের বোঝা নিকট ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে।