মধ্যপ্রাচ্য পুনরায় একটি চরম সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং এই পরিস্থিতি আর কোনো অনুমিত সম্ভাবনার জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থিত গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে মোখার দিকে অগ্রসর হয়েছে, যা দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। এর মাধ্যমে গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে মক্কায় স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কার্যকরের মাত্র এক মাসের মাথায় একটি জটিল পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। আল-সাফা প্রাসাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির মূল ধারা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, যেখানে বলা হয়েছে— চুক্তিবদ্ধ কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে বাকি সব সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বারবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই চুক্তিটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের অংশ, কোনো যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদকে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সেই কথার প্রকৃত অর্থ আসলে কী।
ইয়েমেন সংকট বর্তমানে দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। হুতিদের আগ্রাসনের জবাবে সৌদি আরব পাঁচ দিনে প্রায় তিন শ বিমান হামলা চালিয়েছে এবং নিজ ভৌগোলিক ভূখণ্ডে যেকোনো আঘাতের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ইয়েমেনি ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে এবং ১৫০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে, এই অস্থিতিশীলতা বিশ্বব্যাপী সৌদি তেল বাজারে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। চরম উত্তেজনা তৈরি হয় যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মক্কার দিকে ধেয়ে আসা একটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করে। এই শহরটি পবিত্রতা ও মর্যাদার প্রতীক হওয়ায় সৌদি আরব একে তাদের লাল রেখা হিসেবে বিবেচনা করে। ঘটনার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান যে পাকিস্তান চুক্তির আওতায় তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং মক্কা চুক্তি তাদের জন্য প্রযোজ্য বলেই তারা এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।
তবে মিডিল ইস্ট মনিটরে মনসুর কায়সার তার লেখায় বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন যে, পাকিস্তানের এই জোরালো বক্তব্যের সাথে তাদের বাস্তব পদক্ষেপে একটি স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। খাজা আসিফের এই হুশিয়ারির পরেও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটিকে সামরিক স্তরে সক্রিয় করেনি। ইসলামাবাদ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল যে, তারা তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করছে না এবং আপাতত তাদের কৌশল হবে কূটনীতিকেন্দ্রিক।
এমনকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্যমতে, সৌদি আরব তাদের প্রতিরক্ষার জন্য ভিন্ন পথের সন্ধান করলেও পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক সাহায্য চায়নি। বর্তমানে ওমান ও মিশর এই সংকটের কূটনৈতিক সমাধানে প্রধান ভূমিকা রাখছে এবং রিয়াদ সামরিক ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার আগে কূটনীতিকে একটি সুযোগ দিতে চাইছে। অন্যদিকে, তুরস্কের নিজস্ব জটিলতা রয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টে এই চুক্তি অনুমোদন পেতে হয়তো অক্টোবর পর্যন্ত বিলম্ব হতে পারে, যা এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথকে আরো ধীরগতির করে তুলেছে।
এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ধীরগতির ফলে সৌদি আরব তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের দিকে ঝুকছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে যোগাযোগ করলেও ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক হামলার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কেবল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের আশ্বাস দেয়। এছাড়া রিয়াদ একই কারণে ইসরায়েল ও ব্রিটেনের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে।
কৌশলগত বিশ্লেষক স্টিভেন এ. কুক প্রশ্ন তুলেছেন যে, মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনো বাস্তব সামরিক পদক্ষেপে না যাওয়ার কারণে এই চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে কি না। ইসলামাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে যা দায়িত্বশীল আত্মসংযম, রিয়াদের কাছে তা চরম সংকটের মুহূর্তে একা হয়ে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে।
হুতিরা ইরানের সবচেয়ে ভয়ংকর মিত্র। ছবি: রয়টার্স
মানসুর কায়সারের মতে, পাকিস্তান যে একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছে তা বলা ভুল হবে। আল জাজিরার সূত্র ধরে নিবন্ধে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ইতিমধ্যে তাদের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, নির্দিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বেশ কিছু সৈন্য সৌদি আরবে মোতায়েন করে রেখেছে, যা এই সংকটের আগেই একটি দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সেখানে ছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।
পাকিস্তান একদিকে ইরানকে অনুরোধ করছে যাতে তারা হুতিদের নিবৃত্ত করে, অন্যদিকে রিয়াদের প্রতি পাকিস্তানের যে প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার রয়েছে তাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই আড়ালে চলা পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়তো মাঠে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।
পাকিস্তান মূলত তাদের সুরক্ষামূলক সহায়তা, তথ্য আদান-প্রদান এবং সৌদি ভূখণ্ডে অবস্থানরত বর্তমান সেনাদলকে ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানের অংশ হওয়া থেকে পৃথক একটি বিষয় হিসেবে দেখছে। মক্কা চুক্তির মূল লক্ষ্যও ছিল যৌথ প্রতিরোধ তৈরি, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদার করা—যা কোনো আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অংশ না নিয়েও পূরণ করা সম্ভব।
পাকিস্তানকে এই মুহূর্তে একটি অত্যন্ত কঠিন কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। একদিকে সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে পাশেই অবস্থান করছে প্রতিবেশী ইরান, যার সাথে ইসলামাবাদ বছরের পর বছর ধরে একটি সহনশীল সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। ইয়েমেন সংকটকে কেন্দ্র করে সৌদি-ইরান একটি বড় ধরনের সরাসরি সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হোক—তা কোনোভাবেই পাকিস্তানের কাম্য নয়। সে কারণেই পাকিস্তান সেনাপ্রধানের এই পরোক্ষ কূটনৈতিক চ্যানেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের ভূমিকাও লক্ষণীয়। পূর্বে লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা রুখতে চীন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। চীন-সৌদি-ইরান সমঝোতার যে অগ্রগতি চীনা মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছিল, বেইজিং এখনো সেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বজায় রাখতে আগ্রহী, কারণ তাদের বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত রাখা তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এই সব জটিল আঞ্চলিক মেরুকরণের ফলে স্পষ্ট যে প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ থাকলেও কেউই সরাসরি যুদ্ধের দিকে যেতে চায় না।
এই সংকটের সাথে আরব সাগরের একটি গভীর আঞ্চলিক যোগসূত্র রয়েছে, যা সাধারণত আলোচনায় আসে না। বাব আল-মানদেব প্রণালি আরব সাগরে এসে মিশেছে, যা পাকিস্তানের করাচি ও গাওদার বন্দরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে লোহিত সাগরে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা দেখা দিলে তা নৌ-পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং বাণিজ্য পথ পরিবর্তনে বাধ্য করবে। এটি চীনের সিপেক প্রকল্পের জন্য যেমন নতুন গুরুত্ব বয়ে আনতে পারে, তেমনই গাওদার বন্দরের জন্য বাড়তি ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ও কঠিন সিদ্ধান্ত আসবে তখন, যখন রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনের মাটিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য ইসলামাবাদকে অনুরোধ করবে। যদিও এখন পর্যন্ত রিয়াদ এমন কোনো অনুরোধ পাকিস্তান সরকারকে জানায়নি।
ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করা আর সৌদি ভূখণ্ডের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তান যদি ইয়েমেনের ভেতরে তাদের বাহিনী পাঠায়, তবে তা ইরানের সাথে সীমান্ত উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে, অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ঝুঁকিতে ফেলবে এবং এই প্রতিরক্ষামূলক চুক্তিটিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অংশ বানিয়ে তুলবে। এতে পাকিস্তান বর্তমানে যে কূটনৈতিক সেতুর ভূমিকা পালন করছে, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে যে তিনটি বিষয়কে আলাদাভাবে বোঝা দরকার—সৌদি ভূখণ্ড রক্ষা করা, চুক্তিভূক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে আক্রমণ ঠেকানো এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুদ্ধ করা। প্রথম দুটি কাজ পাকিস্তান বর্তমানে সফলভাবেই করছে, কিন্তু তৃতীয় বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল, যা পাকিস্তান এড়িয়ে যেতে চাইছে।
লেখক মনসুর কায়সার তার বিশ্লেষণে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মক্কা চুক্তির মূল পরীক্ষা আসলে ইয়েমেনের মাটিতে পাকিস্তানি সেনার উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং সৌদি আরবে থাকা বর্তমান যুদ্ধবিমান, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পাকিস্তান কতটুকু কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে—তার ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করবে। ইসলামাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এই দূরত্ব বজায় রাখাকে সুশৃঙ্খল কৌশল হিসেবে দেখা হলেও, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সংকটে পড়া রিয়াদের কাছে তা অনুপুস্থিতি বলে মনে হতে পারে। এই ভাবমূর্তির ব্যবধানটি কীভাবে পূর্ণ করা হবে তার ওপরই নির্ভর করবে মক্কা চুক্তিটি ইতিহাসে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে স্মরণীয় থাকবে নাকি কেবল কাগজে-কলমে থাকা একটি ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি হিসেবে থেকে যাবে।