গত জুনের বিদ্যুৎ বিল দেখে চমকে উঠেছেন অনেকে। একই ধরনের অভিযোগের পাহাড়ে গণমাধ্যম অফিস আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছয়লাব হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিলের নানা খবরে একসময় ছেয়ে গিয়েছিল পত্রিকার পাতা।
তখন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছিলেন, এসব অভিযোগের বেশির ভাগের কোনো ভিত্তি নেই। বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ দাবি করেছিলেন, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রাহক হয়রানির জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মিটারের কোনো ত্রুটির কারণে নয়, বরং বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণেই বাড়তি বিল গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
তবে এক মাসের ব্যবধানে বিলের মাস ‘জুলাইতে’ এসেও একই অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। প্রিপেইড কিংবা পোস্টপেইড–দুই শ্রেণির গ্রাহকই বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। খোদ রাজধানী ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, গাজীপুর ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এই অভিযোগ আসছে।
প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যবহার না বাড়লেও আগের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি বিল দিতে হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, মাস শেষে স্ল্যাব পরিবর্তন না হয়েই আগের ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন উচ্চহারে বিল কাটা হচ্ছে।
তবে এবারও যথারীতি গণহারে বাড়তি বিলের বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম চরচাকে জানিয়েছেন, ব্যাপকভাবে অতিরিক্ত বিল করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে হয়তো দু-একটি ভুল থাকতে পারে।
পিডিবি চেয়ারম্যান জানান, প্রতিটি বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিকে নিজ নিজ এলাকার গ্রাহকদের বাড়তি বিলের অভিযোগ যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি ইউটিলিটি আলাদাভাবে বিষয়টি দেখছে এবং অধিকাংশ অভিযোগ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যেভাবে অতিরিক্ত বিল করার দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, জুনে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। মে মাসে দেশের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা জুনে দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। পিডিবি চেয়ারম্যান জানান, জুনে তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছিল। আগে যেখানে সিস্টেমের লোড সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো ছিল, তা বেড়ে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠে। এই বিদ্যুৎ তো গ্রাহকরাই ব্যবহার করেছেন, ফলে বিল তো স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
বিপিডিবি কীভাবে বিল তৈরি করে?
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিল তৈরির পদ্ধতির দিকে তাকালে দেখা যায়, বাণিজ্যিক পরিচালন পদ্ধতিতে কম্পিউটার সেন্টারে বিল তৈরির পর তা চূড়ান্ত করার আগে ‘বিলিং এক্সেপশন’ বিবরণী প্রস্তুতের নিয়ম রয়েছে। অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী বিলের তালিকা সংশ্লিষ্ট বিক্রয় ও বিতরণ দপ্তরে পাঠিয়ে তা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া আছে। বিল চূড়ান্ত হয়ে গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তত ১০ শতাংশ বিল পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। সেখানে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে কম্পিউটার সেন্টারের মাধ্যমে তা সংশোধন করা হয়। তবে কোনো মাসে মিটার রিডিং নেওয়া সম্ভব না হলে আগের ছয় মাসের গড় ব্যবহারের ভিত্তিতে আনুমানিক বিল করার সুযোগ পিডিবির বিধিতেই আছে, যদিও টানা দুই মাসের বেশি এভাবে বিল দেওয়ার সুযোগ নেই।
বুঝতে হবে বিদ্যুতের স্ল্যাব
বিদ্যুৎ বিল-সংক্রান্ত ঝামেলা বুঝতে হলে বিদ্যুতের স্ল্যাব সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। সচেতন গ্রাহক না হলে এ সংক্রান্ত অযাচিত ভোগান্তির বিষয়টি সহজে ধরা পড়ে না। বিভিন্ন স্ল্যাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য গ্রাহকদের নির্ধারিত দরে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
বিষয়টি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীকে বিল দিতে হয় প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ১৮ পয়সা দরে। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম ধরা হয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৫০ পয়সা। আর ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত দাম পড়ে প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ১০ পয়সা। এভাবে মোট ছয়টি স্ল্যাবে বিদ্যুতের দর ভাগ করা রয়েছে।
ধরা যাক, একজন ভোক্তা মাসে ১৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্রথম স্ল্যাবের ৭৫ ইউনিটের দাম দেবেন ৬ টাকা ১৮ পয়সা করে এবং পরের ১০০ ইউনিটের দাম দেবেন ৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে। পরবর্তী মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার শূন্য ইউনিট থেকে তার নতুন বিলিং শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু কিছু গ্রাহকের অভিযোগ, নতুন মাস শুরুর পরও আগের মাসের ধারাবাহিকতায় বিল কাটা হচ্ছে। ফলে তা বর্ধিত দামের পরবর্তী উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যাচ্ছে এবং গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
একই সঙ্গে মিটার রিডিং যাচাই না করে অনুমাননির্ভর বিলিং, স্ল্যাব পরিবর্তন না করেই নতুন উচ্চহারে বিল কাটা, প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ ও টোকেন জটিলতা, মিটার রিডারদের ঘুষ দাবি করা, অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়া এবং হটলাইনে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এ ছাড়া বছরের শেষে সিস্টেম লস কম দেখাতে গিয়ে কৃত্রিমভাবে বাড়তি বিল করার প্রবণতার কথা জানিয়েছে কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত প্রতিকারের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনিয়মের বিষয় অস্বীকার করে বলা হচ্ছে, অযাচিত বা ভুতুড়ে বিল যেন না হয়, সে জন্য একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নির্দেশিকা অনুসরণ করে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
গত জুনের বিদ্যুৎ বিল দেখে চমকে উঠোছেন অনেকে। ছবি: বাসস
এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের করণীয় কী, তা জানা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিধিমালা ২০২০ অনুযায়ী, কোনো বিলে আপত্তি থাকলে দাবিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা যায়। স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সেসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করবেন। সেক্ষেত্রে সংশোধিত বিলকে নতুন বিল হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার ওপর কোনো বিলম্ব মাশুল বা সারচার্জ নেওয়া যাবে না।
ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিটি গ্রাহকেরই উচিত ভুতুড়ে বিলের বিষয়টি উপেক্ষা না করে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা। তবে অভিযোগ জানালেই যে প্রতিকার মিলবে, সে বিষয়ে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা খুব একটা নেই। এই অবস্থায় বিদ্যুতের ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও কৌশলী হওয়াই গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।