দেশে আবারও একটি সপরিবারে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এবারের স্থান মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বারাহী জান্নাকান্দি গ্রাম। এই তিন মরদেহের মধ্যে রয়েছে ১৮ মাসের এক শিশুও। আর রংপুরের ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। সিলেট বা লক্ষ্মীপুরের ঘটনা মনে করতেও খুব একটা কষ্ট করার প্রয়োজন পড়ে না।
দেশে গত ৬ মাসে এমন পৃথক ১৪টি ঘটনায় মোট ৪৩ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ মরদেহ ছিল ১৪টি পৃথক পরিবারের। আর একটি মরদেহ ছিল এসব পরিবারের একটির গৃহকর্মীর।
এসব ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বিষপান, দুর্ঘটনা ও ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুও রয়েছে।
একটি পরিবারের সদস্যরা সাধারণত একই ছাদের নিচে থাকেন, একসঙ্গে চলাফেরা করেন এবং একে অন্যের ওপর নির্ভর করেন। সেই পরিবারের একাধিক সদস্য যখন একই ঘটনায় মারা যান, তখন তা কেবল মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা এবং ঘটনার পেছনের নানা প্রশ্ন।
এপ্রিলের মৃত্যুরহস্য এখনো অমীমাংসিত
২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল নওগাঁর নিয়ামতপুরের এক বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ মৃত্যুর কারণ এখনো উদঘাটিত হয়নি। তদন্ত চলমান। তবে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা-ঘটনাটি জমিজমা-সংক্রান্ত। আর সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে সংবাদমাধ্যমে।
এ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে একই পরিবারের দুই বা ততোধিক সদস্যের প্রাণহানির অন্তত ১৪টি ঘটনা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় একই পরিবারের অন্তত ৪২ জন মারা গেছেন এবং মোট ৪৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে এই হিসাব কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়। নির্দিষ্ট সময়ে সংবাদমাধ্যমে আসা খবর থেকে পাওয়া তথ্যের একটি সংকলন। ফলে যে ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমে আসেনি, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে থেকে গেছে।
একই পরিবারের সর্বোচ্চ মৃত্যু কাপাসিয়ায়
সপরিবারে মৃত্যুর ধরন বিবেচনায় গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। গত ৯ মে একটি বাড়ি থেকে একই পরিবারের পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন এক নারী, তার ভাই ও তিন সন্তান।
একই পরিবারের চারজন করে মারা যাওয়ার ঘটনা রয়েছে তিনটি। এপ্রিল মাসে নওগাঁর নিয়ামতপুরে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জুনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি আরেকজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। আগস্টে রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে বাবা, মা, ছেলে ও মেয়ের মরদেহ পাওয়া যায়। এই গণপতি চক্রবর্তীর সপরিবারে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। তবে এ তদন্ত নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
গ্রেপ্তারকৃত আসামি বাবুল। ছবি: ফাইল ছবি
বাকি ঘটনাগুলোতে একই পরিবারের দুই বা তিনজন করে মারা গেছে।
মাসভিত্তিক ধরন ও ঘটনার ভিন্নতা
এসব ঘটনা ছয় মাসে সমানভাবে ঘটেনি। এপ্রিল ও মে মাসে একাধিক পরিবারের সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের খবর বেশি এসেছে। জুনেও এমন ঘটনা দেখা গেছে। আবার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তালিকায় বেশ কয়েকটি ঘটনা যুক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘটনাগুলোর ধরন একই রকম নয়। কোনটি হত্যাকাণ্ড, কোনটি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহে তদন্তাধীন, আবার কোনটিতে মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোথাও বিষপান বা বিষ খাওয়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তাই একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুকে কেবল ‘পারিবারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয় না।
একাধিক প্রজন্মের একসঙ্গে প্রাণহানি
ছয় মাসের তথ্যে গাজীপুরের কাপাসিয়ার পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনাটিই সবচেয়ে বড়। সেখানে মা, তার তিন সন্তান ও ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর চারজন করে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে নওগাঁ ও রংপুরে। নওগাঁয় স্বামী, স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং রংপুরে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বাবা, মা, ছেলে ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসব ঘটনায় কখনো একই পরিবারের একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে। কোথাও বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তান, আবার কোথাও নানি বা দাদার সঙ্গে নাতি-নাতনির মৃত্যু হয়েছে।
গৃহকর্মীসহ মোট মরদেহ ৪৩
তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে সিলেটের ঘটনায়। গত ১২ আগস্ট সিলেটের রায়নগরে একটি বাসা থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তাদের সবাই একই পরিবারের সদস্য ছিলেন না। নিহতদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী একই পরিবারের হলেও তৃতীয় ব্যক্তিটি ছিলেন তাদের গৃহকর্মী।
ফলে ঘটনাটিতে মোট উদ্ধার হওয়া মরদেহ তিনটি হলেও একই পরিবারের মৃতের সংখ্যা ধরা হয়েছে দুজন।
এই পার্থক্যের কারণেই সার্বিক তথ্যে একই পরিবারের মৃতের সংখ্যা ৪২ হলেও মোট উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ৪৩।
হত্যাকাণ্ড, বিষপান নাকি আত্মহত্যা?
সংগৃহীত তালিকায় যেমন হত্যাকাণ্ডের তথ্য রয়েছে, তেমনি কিছু ঘটনার কারণ এখনো তদন্তাধীন। কয়েকটি ঘটনায় বিষপান বা বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও অন্যান্য পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।
যেমন, ১৯ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জে একই ঘর থেকে স্বামী, স্ত্রী ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার পর স্বামী আত্মহত্যা করেছেন। একই দিনে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে তিন সন্তানের মরদেহ উদ্ধার হয়। সেখান থেকে তাদের বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে সন্তানদের বিষ খাওয়ানোর অভিযোগ ওঠে।
এই দুটি ঘটনা একই দিনে ঘটলেও সেগুলোর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে কেবল ‘একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু’ বলে সংখ্যা যোগ করলে ঘটনাগুলোর আসল তফাত ঢাকা পড়ে যায়।
পরিসংখ্যানের আড়ালে অগণিত প্রশ্ন
৪২ জনের মৃত্যুর এই হিসাব একটি প্রাথমিক পরিসংখ্যান মাত্র। তবে এই সংখ্যার আড়ালে রয়েছে ১৪টি পৃথক ঘটনা, আলাদা পরিবার এবং ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট। একই ঘটনায় কেন একটি পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারাচ্ছে?
এ ১৪টি পৃথক ঘটনার মধ্যে ১৩টিকে হত্যাকাণ্ড বা হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১২টি ঘটনায় প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।