২৩ আগস্ট রাতে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পুরো পরিবারের শেষ হয়ে যাওয়ার খবরটা প্রথম শুনে বুঝিনি যে এই ঘটনা সামনে অনেক চমক তৈরি করে রেখেছে। হত্যা রহস্য উন্মোচনের জন্য গোলকধাঁধা অপেক্ষা করছে–কে জানত? রাতে ঘুমিয়ে সকালে উঠেই শুনি দুই আসামি ধরা পড়েছে, এমনকি হত্যার দায়ও স্বীকার করে নিয়েছেন তারা। স্বস্তির বদলে চমকে গেলাম এই খবরে। কারণ, পুলিশের এমন সাফল্য শেষ কবে দেখেছি, তা স্মৃতিতে ধরা দেয় না।
এরপর আবার দুপুর গড়াতেই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদের ব্রিফিংয়ের ডাক। আগ্রহ নিয়ে কিছুটা দেখলাম, শুনলাম সেই ব্রিফিং। কিন্তু বুঝলাম না যেন কিছুই। ব্রিফিংয়ে সাবেক এই কমিশনারের কান্নায় ভেঙে পড়ার চিত্র কাউকে স্পর্শ করেছে কি না জানি না, তবে আমাকে করেনি তা নিশ্চিত। কারণ, চার চারটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য আসামিদের যে মোটিভ তিনি তুলে ধরলেন, তারপর আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। ভাবনার পুরো জগৎজুড়ে শুধু একটাই প্রশ্ন–ইয়াবা সেবন কি এত বড় অপরাধ, যা দেখে ফেলায় পুরো পরিবারকে শেষ করে ফেলা যায়? অন্যরা দেখলাম অনেক প্রশ্ন তুলছেন ব্রিফিং ঘিরে, কিন্তু আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। সত্যি বলতে মোটিভের কথা উল্লেখের পর ব্রিফিংয়ের আর কিছুই আমি ঠিকমতো শুনিনি, শোনার আগ্রহ হয়নি।
রাতে দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে দিলেন–এটাও স্বাভাবিক ঠেকল না। কারণ, আমার ক্যারিয়ারের বড় অংশই কেটেছে অনুসন্ধান করতে গিয়ে। সেই অনুসন্ধানের খাতিরে বহু আসামি দেখেছি, বহু ইন্টারোগেশন দেখেছি, বহু জবানবন্দি দেখেছি। কিন্তু এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এত দ্রুত আসামিদের আদালতে উপস্থাপন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়েছে পুলিশ, সেটাও স্বাভাবিক ঠেকেনি আমার কাছে।
কারণ, স্বীকারোক্তিতে আসামিরা সত্য-বলছে, না মিথ্যা বলছে–তা ক্রসচেক করার মতো বড় কাজটিই তো বাকি। স্বীকারোক্তি মানেই তাদের জেলে পাঠাতে হবে–এটা তো নির্ধারিত। এত তাড়াতাড়ি আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া মানে হলো–পুলিশের কাছে সব তথ্যপ্রমাণ চলে এসেছে, তাই আসামিদের আর হাতের কাছে না পেলেও চলবে। ঘটনা সামনে আসার পর থেকে আসামি ধরা, স্বীকারোক্তি নেওয়া, লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার, আদালতে জবানবন্দি নেওয়া–এতগুলো কাজ হয়ে গেল চোখের পলকেই মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে। এ যেন আরেক চমক। কারণ, এর মধ্য দিয়ে আমরা প্রথমবারের মতো ‘সুপার কপ’ দেখলাম।
আসামি ধরা, স্বীকারোক্তি নেওয়া, লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার, আদালতে জবানবন্দি নেওয়া–এতগুলো কাজ হয়ে গেল চোখের পলকেই মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে। ছবি: চরচা
এই ভাবনা নিয়ে যে রাত কাটিয়ে দেব, তার উপায় নেই। কারণ, ঘটনার সাসপেন্স মাত্র শুরু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হলো আলোচনা–আসামি ও পুলিশের গায়ে একই শার্ট! সুপার পুলিশিংয়ের বিষয়ে যে শুধু আমার একার খটকা লেগেছে তেমনটা যে নয়, তা বুঝলাম। সরাসরি প্রশ্ন উঠল তদন্ত নিয়ে। একসুরে সবাই বলে উঠল–বিচার কোথায় এ তো ‘সাজানো নাটক’! এখান থেকে আমার এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ঢাকায় বসেই।
সকালে ফোনে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলাম এই শার্টের ঘটনা কী, তা বুঝতে। কিন্তু অনলাইন ঘেটে কোনো নিউজ পোর্টালে কোনো খবর পেলাম না শার্টের মিল নিয়ে। তবে এ-সংক্রান্ত খবরটির অধিকাংশ শিরোনাম দেখলাম–পোড়া সোনার আলামতেই আসামি শনাক্ত। কয়েকটি রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে দেখলাম কমিশনারের সেই ব্রিফিংয়েই এমনটা দাবি করা হয়েছিল যে, রান্নাঘরে সোনার চুড়ি পোড়ানো হয়েছিল, সেই সূত্র ধরে আসামি শনাক্ত হয়। আগেই বলেছি সেই ব্রিফিং পুরোটা আমি শুনিনি, শোনার ইচ্ছেও হয়নি।
অন্য কিছু নয় আমার শুধু আগ্রহ কাজ করছিল আসামি-পুলিশের শার্ট এক হলো কী করে, তা নিয়ে। তাই পুলিশ ফোনবুক থেকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনারের সরকারি নম্বরে ফোন করলাম। আমি তখনো জানি না, তিনিই সনাতন চক্রবর্তী, যার গায়ের শার্ট নিয়েই বিতর্ক। আমি ঘটনা বা মামলা সম্পর্কিত কোন প্রশ্ন না করেই শার্ট পরা সেই কর্মকর্তা কে ছিলেন–জানতে চাইলাম। তিনিও কোন ভনিতা না করেই সরাসরি জানালেন, তিনিই সেই ব্যক্তি। তার গায়ে এখনো সেই শার্ট; আসামি ও তার শার্ট আলাদা, আর ঘটনা পুরোটাই কাকতালীয়। সেই শার্ট দেখার আগ্রহ থেকে ভিডিও কলে কথা বলে নিশ্চিত হই। সেসময় কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইলাম, আসামি ধরার অভিযান সম্পর্কে। সনাতন চক্রবর্তী দিলেন সম্পূর্ণ নতুন এক তথ্য, যেখান থেকে মূলত এই ঘটনার অনুসন্ধানে আমার জড়িয়ে যাওয়া। তিনি বললেন, একজন প্রতিবেশীর দেওয়া তথ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে প্রথমে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। আবার সিদ্ধার্থের তথ্যে পাওয়া যায় মুগ্ধকে, পরে দুজনই সব স্বীকার করে নেয়। কিন্তু আগের দিনের প্রেস কনফারেন্সের রেফারেন্সে একটু আগেই যে দেখলাম–সংবাদ শিরোনামে লেখা ‘আগুনে পোড়া চুরি দেখেই আসামি শনাক্ত’–সেটার যুক্তি কী?
তারচেয়েও বড় ধাক্কা লাগল, যখন সনাতন চক্রবর্তী স্পষ্ট জানান, আসামিরা বলছে অতিরিক্ত ইয়াবা সেবনে তাদের মাথা কাজ করেনি, তাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে এই হত্যাকাণ্ড। কিন্তু এই গোয়েন্দা কর্মকর্তার মনে হয়েছে–এটি পরিকল্পিত এবং এর পেছনে আরও কেউ আছে। আর মোটিভও ইয়াবা নয়, সত্য বের করতে তদন্তের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
আমাদের চরচার ওয়েবসাইটেও প্রথম ব্রিফিংয়ের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল–ওই পোড়া সোনা ধরে আসামি শনাক্ত। সনাতন চক্রবর্তীর রেফারেন্সে আমার পরের রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করি–কীভাবে আসামি ধরা পড়ল, সে বিষয়টি। কারণ ব্রিফিংকারীর চেয়ে অভিযানে সরাসরি অংশ নেওয়া কর্মকর্তার বক্তব্য আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক মনে হয়েছে। এদিনই রংপুর যাওয়ার কথা মাথায় আসে প্রথম। তখনো জানি না, পরদিন সকালে আরও বড় চমক অপেক্ষা করছে! একটি স্বনামধন্য বেসরকারি সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডোমের বক্তব্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচার করছে–দুই নারী ভিকটিমকে ধর্ষণের আলামত মিলেছে। যদিও ডোম বলছিলেন ভ্যাজাইনাল সোয়াপ নামের ধর্ষণের আলামত সংগ্রহের প্রক্রিয়ার কথা, সেটিকে রিপোর্টার পুশ করে ধর্ষণ পর্যন্ত নিয়ে যান। এরপর আর ঢাকায় বসে ঘটনা ফলো করার কোনো সুযোগ নেই। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে অফিস আমাকে রংপুর পাঠাল।
আগামী চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত
যাত্রাপথে মৃত্যুর প্রায় দুদিন পর ভিকটিমের যৌনাঙ্গ থেকে তাজা বীর্য পাওয়ার বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী, তা জানার চেষ্টা করি। ফোনে কথা বললাম অন্য দুজন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে। তাদের ব্যাখ্যা জেনে বুঝলাম ওই টিভি সাংবাদিক যা করেছেন, তা একেবারেই সাংবাদিকতার রীতির বাইরে। সারা রাতের জার্নি, রংপুর নিয়ে যতদূর সম্ভব তথ্য মাথায় নিচ্ছি অনলাইন এবং সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ঘেঁটে। সেসময় নোট করলাম অনেকগুলো মোটিভ ভেসে বেড়াচ্ছে, মানুষের ওয়ালে। এর মধ্যে আছে চাঁদাবাজি, নিহত আগামী চক্রবর্তীর প্রেম-সংক্রান্ত বিরোধ, পুলিশের সঙ্গে বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা কিছু। এ ছাড়া আগামী চক্রবর্তীর বান্ধবীদের সঙ্গে চ্যাটের রেফারেন্সে অনেকেই বলছিলেন হুমকি পেয়ে জিডি করতে চাইছিলেন আগামী। আবার সারারাত অন্যদের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও শুধু ছিল না তাদের বাড়িতে–ঘটনার দিন আগামীর সঙ্গে বান্ধবীর শেষ চ্যাটের এই স্ক্রিনশট ঘুরে আমার সামনেও এসেছিল।
রংপুর পৌঁছে সকালেই আগে যোগাযোগ করি ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে। অল্প সময় সামনা-সামনি কথা বলার সুযোগ পাই। ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি থাকলেও এদিন তারা ছিলেন খুব ব্যস্ত। কারণ, মামলাটির তদন্তভার অফিশিয়ালি ডিবিকে দেওয়া হয়েছে। তারা তখন থানা থেকে সব ডকেট আর সিআইডি থেকে ফরেনসিক আলামত বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। তাছাড়া এদিন আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছিল, তা হলো–ওই যে দক্ষিণঘাট শ্মশানের ডোমের কাছে আশ্রয় চাওয়ার সময় মুগ্ধ আটক হয়েছিলেন, সেই ডোম বিদ্যুতের স্বাক্ষ্য আদালত গ্রহণ করেন। তাই ডিবির ছোট টিমটা ছিল অসম্ভব ব্যস্ত। অল্প সময়ের সুযোগেই আমি আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করি সনাতন চক্রবর্তীকে। তার কথায় বুঝলাম, তারা তখনো তদন্তকাজ শুরুই করেননি। কারণ, তারা অফিশিয়ালি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে মাত্র আগের রাতে। অন্যদিকে তাৎক্ষণিকভাবে আসামি মিলে যাওয়ায় তাদের স্বীকারোক্তি আদালতে রেকর্ডের প্রক্রিয়ায় কেটেছে মাঝের দুদিন।
আসামি সিদ্ধার্থের তথ্যে তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। ছবি: চরচা
অগত্যা আমি নিজের মতো কাজ শুরু করি। ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমেই যা বুঝলাম, আসামিরাই ভিকটিমদের নিকটতম প্রতিবেশী। তাই ঘটনার পর তা সামনে না আসা যৌক্তিক। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা বলতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির উল্টো দিকের মন্দিরে একটি আছে, যা গত ৫ মাস ধরে অকার্যকর। বোঝা গেল–কেন ক্লুলেস। তারপর ধারাবাহিকভাবে কাজ করে গেছি একটা অন্তত ক্লু খুঁজে পেতে। শুরুতেই ক্রাইম সিন ভিজিট করতে চেয়েছিলাম। কারণ, অনুসন্ধানের নিয়ম অনুযায়ী ঘটনা যতই ক্লুলেস হোক না কেন, প্লেস অব অকারেন্স বা PO কোনো না কোনো ক্লু দেবেই। কিন্তু ক্রাইম সিন সিকিউর করা, পুলিশের অনুমতি মিলল না। বাধ্য হয়ে আগামী চক্রবর্তীর বন্ধুদের খুঁজে বের করি, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে তার কথোপকথনের নানা স্ক্রিনশট ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। রয়েছে জিডির বিষয়টিও। আগামির বন্ধুসহ নানা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল–আগামি চক্রবর্তী জিডি করতে চেয়েছিলেন তার প্রেমিকের এক বিবাহিতা বান্ধবীর বিরুদ্ধে। সেটিও গত ২১ মে-এর কথোপকথন। এ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আছে চরচাতেই।
এর পর আবার দেখলাম আরেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির হয়েছে ক্যারেক্টার ইভা রহমান নাম নিয়ে। এই চরিত্র কখনো প্রীতিলতার বান্ধবী, আবার কখনো প্রিয়মের গৃহশিক্ষিকা হিসেবে দৃশ্যপটে হাজির। ইনিই নাকি আবার সাবেক কমিশনার আবদুল মাবুদের প্রেমিকা। এত টুইস্টে আমার জড়াতে ইচ্ছে করেনি, যখন দেখলাম ইভা রহমান নামে কাউকে হাজির করতে পারছি না। প্রিয়মকে তার বাবা নিজেই পড়াতেন। তাই এই মেটিভও বাদ গেল আমার অনুসন্ধান থেকে।
আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা ও ভাই। ছবি: চরচা
আমি রংপুরে পা দিয়েই যে কয়েকটি মোটিভের সূত্র পেয়েছিলাম, তার মধ্যে অন্যতম হলো–গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির জমিটির আগের মালিক, যিনি সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষ। তাই ধারণা হয়েছিল, জমি-সংক্রান্ত বিরোধও হতে পারে। ক্রসচেক করতে গিয়ে সবার প্রথমে স্থানীয় এক সাংবাদিক এবং আমি নিশ্চিত হই যে, সিদ্ধার্থের বাবা এবং চাচা দুজন তাদের বাকি জমিটুকু ৩৫ লাখ টাকায় বিক্রি করতে বায়নার টাকা নিয়েছে। তাদের পরিবারের সবাই পাসপোর্ট করতে দিয়েছে জমি বিক্রি হলে ভারত চলে যাবে বলে। প্রশ্ন এল–জমির দলিল কোথায়? ডিবি জানাল, তারা তা পায়নি। এই মোটিভটি লাল কালি দিয়ে মার্ক করে রাখি। আর খোঁজ করি সেই বান্ধবীকে, যিনি দাবি করেছিলেন সবশেষ তার সঙ্গেই আগামীর কথা হয় ঘটনার দিন ভোরে। আর প্রথম ব্রিফিংয়ে সাবেক কমিশনার আবদুল মাবুদ তথ্য দিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে শুক্রবার মাঝরাতে। তাই এই বান্ধবীকে আমাদের খুব প্রয়োজন। তাকে খুঁজেও পাই। তার বক্তব্য এবং সেই চ্যাটের স্ক্রিনশটে আগামী চক্রবর্তীর শেষ রিপ্লাই অনুযায়ী, তখন ভোর ৫টা ৫৩ মিনিট। আর ৫টা ৫০ মিনিটের টেক্সটে আগামী বলেছিলেন সারারাত অন্যদের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও নেই শুধু তাদের বাড়িতে। তাই ঘুমোতে পারেননি তিনি।
এই তথ্য সঠিক হলে মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে–এক. আবদুল মাবুদের বলা হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সময় মধ্যরাত–ভুল; এবং দুই. শুধু আগামীদের বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়। ফলে মাবুদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবন দেখে ফেলার মোটিভ আর ধোপে টেকে না।
দুর্ভাগ্যবশত আগামীর ওই বান্ধবী মোবাইল ফোনটিতে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় আমি যাওয়ার দুদিন আগে সেটা রিপেয়ার করতে দোকানে দিয়েছিলেন। আমি নিজে রিকোয়েস্ট করিয়ে দোকান থেকে ফোনটি আনাই চেক করার জন্য। ততক্ষণে সফটওয়্যার ইস্যু সলভ করে ফোন রিসেট দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এদিকে ইমেইল পাসওয়ার্ড মনে না থাকায় ফেসবুকে লগইন করতেও পারছিলেন না তিনি। তবে আগামির বান্ধবী অনেক আগে তার ভাইয়ের ফোনেও ফেসবুক লগইন করে রেখেছিলেন। সেই চ্যাটে ঢুকে দেখা যায়, ২০২৩ সালের পর কোনো ম্যাসেজ শো করছে না। এটি হতে পারে ডিজঅ্যাপেয়ারিং ম্যাসেজ মুড অন থাকলে বা সিকিউর এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড থাকলে। আবার দীর্ঘদিন তার ভাইয়ের মোবাইলে লগইন থাকলেও তা নিয়মিত চেক না করার ফলেও এমনটা হতে পারে। কিন্তু ফোনের মেমোরি কার্ডে সংরক্ষণ করা দুটি স্ক্রিনশট আমাকে সরবারহ করেন তিনি। স্ক্রিনশট দুটির ইমেজ ডিটেইলে দেখা যায়, এটি ২৩ আগস্ট ২০২৬-এ ক্যাপচার করা এবং পরদিন তিনি মেবাইলটি রিপেয়ার করতে দেন। দীর্ঘ আলাপচারিতায় ওই বান্ধবী যে মিথ্যা গল্প সাজাবেন, তেমন কারণ আমি খুঁজে পাইনি।
বড় প্রশ্ন হলো–আসামিরা বিদ্যুৎ সংযোগ কখন এবং কোথায় কেটেছিল? ছবি: চরচা
তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়–আগামির ফোন সে সময় অন্য কারো হাতে থাকতে পারে কি? ২০২৩ সালের পুরনো চ্যাটগুলো মিলিয়ে দেখি–না কোনো পরিবর্তন নেই। আগামী ম্যাসেজ করতেন ইংরেজি হরফে বাংলা লিখে, স্ক্রিনশটও একই রকম, এমনকি বানানেও মিল রয়েছে।
ফলে আমার নজর যায় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগের দিকে। বড় প্রশ্ন হলো–আসামিরা বিদ্যুৎ সংযোগ কখন এবং কোথায় কেটেছিল? পুলিশ, স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ানসহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় নক করেও বিদ্যুৎ কাটার সময় এবং কোথায় তার কাটা পড়ল, তা নিশ্চিত হওয়া গেল না। সামনে এল শুধু শর্ট সার্কিটের বিষয়। বিদ্যুৎ এবং বাড়ির দলিল নিয়ে ধোঁয়াশার কারণ খুলে বলি ডিবির উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীকে। সেসময় তারা ব্যস্ত আসামিদের ফোনের প্রযুক্তিগত তদন্ত নিয়ে। সনাতন চক্রবর্তী দুটি বিষয় খুব গুরুত্ব দিলেন। আমিই প্রস্তাব করেছিলাম গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি নির্মাণের সময় যে ইলেকট্রিশিয়ান সবুজ বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করেছিলেন, তাকে দিয়েই বিদ্যুতের লাইনটি চেক করাতে, যেন ত্রুটিগুলো ভালোভাবে সামনে আসে। সেসময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বাড়ির দলিল খুঁজে দেখা আর বিদ্যুতের সংযোগ পরীক্ষার নির্দেশ দেন। ওই সময় সনাতন চক্রবর্তীকে অনুরোধ করে তাদের সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ পাই। পিও-তে বাড়ির দলিল মিলে যাওয়ায় এই মোটিভ আর কাজে দেয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগের কাটা তার দেখে হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত হিসেবে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ তৈরি হয়। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত টেক্সট ও ভিজ্যুয়াল স্টোরি চরচা আগেই তুলে ধরেছে।
আমাদের অনুসন্ধান বলছে জবানবন্দিতে আসামি সিদ্ধার্থ ভোরে আলো ফোটার পর তিনজনকে হত্যার পর বাড়ির সিঁড়িতে থাকা কাটিং প্লাস দিয়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার কথা বললেও তা মিথ্যা। বাড়ির নিচতলার উন্মুক্ত থাকা বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়ার সম্ভাব্য সময় হওয়া উচিত রাত ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে। কারণ, আগামীর বয়ফ্রেন্ড যখন সবশেষ ১টা ২০ মিনিটে কথা বলেন, তখনো আগামী বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি তাকে বলেননি। আবার ২টা ৪০ মিনিটে হোয়াটস অ্যাপে বোনকে কল করেছিলেন প্রীতিলতা, কিন্তু ঘুমে থাকায় তা রিসিভ করতে পারেননি পূজা চক্রবর্তী। এত রাতে কোনো জরুরি বিষয় ছাড়া ফোন করার কথা না। শুধু ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে যে বান্ধবীকে ম্যাসেঞ্জারে আগামী বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছিলেন, তাই বিদ্যুৎ কাটার সম্ভব্য সময় নিয়ে প্রশ্ন আসে জোরালোভাবেই।
রংপুরের ঘটনার পেছনে সম্ভাব্য সব মোটিভ যাচাই শেষে নিজের প্রতিবেদনে ২৮ আগস্ট যা নির্ধারণ করেছিলাম, এর বাইরে যাওয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না এখনো। সবশেষ খবর নিয়ে জানলাম আসামিদের ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড সিডিআর যাচাই করে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ শনাক্ত করে ডিবিও এখন সেই পথেই হাঁটছে। অর্থাৎ, সুপরিকল্পিত চুরি আর নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ২৯ আগস্ট সকালে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে, মোটিভের কথা জোর দিয়ে বলেছে চরচা, পুলিশের তদন্ত এখন সে পথেই। আমাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল–রংপুরে ৪ খুন: চুরিসহ নানা কারণে সন্দেহ গভীর হচ্ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি
রংপুরে পৌঁছে আমার প্রথম যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা হলো–ঢাকায় থেকে আমি ঘটনাটা যেমন অনুমান করছিলাম, বাস্তবতা ছিল একেবারেই তার বিপরীত। আবার এতদিনের অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতায় যা জানতাম, তারই প্রমাণ পেলাম আবারও–যেকোনো ক্লুলেস ঘটনার মূল ক্লু হলো–প্লেস অব অকারেন্স বা পিও। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্নের বিষয়টি ভালোভাবেই ইঙ্গিত করে যে, এটি স্পষ্ট পরিকল্পিত ঘটনা। আবার তাৎক্ষণিকভাবে যে আসামি দুজনকে ধরা হলো, তদন্তকাজ শুরুর পর প্রযুক্তিগত তদন্তে তাদের দুজনের সম্পৃক্ততাও স্পষ্ট। এখন বাকিটা ফরেনসিক রিপোর্ট আর সঙ্গে অন্য কেউ তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কি না, তা বের করে সামনে আনার বিষয়।
তদন্ত চলছে চলুক, কিন্তু একজন মাঠের সাংবাদিক হিসেবে এই ঘটনাকে ঘিরে আমার উপলব্ধি হলো মুহূর্তেই হারিয়ে যাওয়া গোটা পরিবারের জন্য বিচার চাওয়া, সেদিকে নজর রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব এড়িয়ে বরং দায় তুলে নিয়েছি কাঁধে। পুলিশ থেকে শুরু করে, সংবাদমাধ্যম কিংবা সাধারণদের পপুলিস্ট ধারণা কারোরই এ ক্ষেত্রে দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।
বাসার নিচতলার গেট। এটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ছবি: চরচা
প্রথমত, সাবেক কমিশনার শুধুই নিজের ক্রেডিট নিতে গিয়ে তদন্তের শুরুতেই একটি অসম্ভব ক্লুলেস ঘটনার তদন্তের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। এই ব্যক্তি ঢাকা থেকে রোববার সকালে গিয়ে আসামি দুজনের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নেন আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তির সবই ঠিক। এর পেছনে কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা নেই। প্রথম প্রেস কনফারেন্সে এত এত ক্যামেরার সামনে চোখের পানি ফেলে তিনি অতিরঞ্জিত এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে মামলার মোটিভ ঘুরিয়ে ফেলেন। যেটা পরিকল্পিত হত্যা, সেটাকে ইয়াবা সেবন করে আকষ্মিক হত্যা বানিয়ে সহজ করে ফেলেছেন। হত্যার সময়, জব্দ হওয়া আলামত নিয়েও দিয়েছেন ভুলভাল তথ্য। এই বড়কর্তা বলে দিলেন–স্বর্ণ পোড়ানোর ঘটনা দেখে গোয়েন্দাদের সন্দেহ হয় যে, এর সঙ্গে কোনো স্বর্ণকার জড়িত থাকতে পারে; তা দেখেই নাকি আসামিদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। অথচ আসল ঘটনা হলো, যিনি আসামিদের ধরেছেন, তিনি লিড পেয়েছিলেন প্রতিবেশীর কাছ থেকে। তার এই অপেশাদার সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক প্রেসব্রিফিংই প্রমাণ করে যে, তিনি আগে কখনো ক্রাইমে কাজ করেননি। আসামিদের বক্তব্য সঠিক কি না, তা যাচাই-বাছাই না করেই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনার হিসেব আমি কোনোভাবেই মেলাতে পারি না। দুদিন পর এই একই ব্যক্তি আবারও সেই ক্রেডিট ক্রেডিট খেলা খেলতে গিয়ে মিডিয়ার সামনে সরাসরি পড়ে দিলেন আদালতে দেওয়া দুই আসামি এবং অন্য দুই স্বাক্ষীর জবানবন্দি, যা একেবারেই বেআইনি। এখানে তার রিডিং পড়ার কারণে মাথায় আসেনি আসামি দুজন পুলিশের কাছে যা যা বলেছে, তার মধ্যে থেকে কিছু বিষয় আদালতের কাছে গোপন করেছে। যেমন বাড়ির ভেতর আলামত নষ্ট করার তথ্য। তাছাড়া আগের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন–মাঝরাতে হত্যা হয়েছিল। আর পরের ব্রিফিংয়ে আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড হয় ভোরের আলো ফোটার পর।
এই বড় কর্তার অপ্রাসঙ্গিক ইনভলবমেন্টের কারণে আরও কিছু প্রক্রিয়াগত ভুল হয় তদন্তে। তাছাড়া দুই আসামি ধরার সময় তাদের তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ না করায় প্রশ্ন তোলে মাঠের কর্মকর্তাদের দক্ষতা এবং পেশাদারত্ব নিয়েও। সব মিলিয়ে এত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে পুলিশের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সাবেক কমিশনার এবং বর্তমান রেঞ্জ ডিআইজি আবদুল মাবুদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের দরকার আছে। একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার স্পষ্ট মোটিভকে তিনি সাধারণ মাদক সেবনের ঘটনা থেকে হত্যা বানিয়ে দিলেন কেন–এর জবাব তার কাছ থেকে নেওয়া প্রয়োজন।
এরপরের সর্বোচ্চ দায় আমাদের; অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যম কর্মীদের। আমরা যারা সংবাদকর্মী আছি, তারা ঘটনার পর থেকে শুধু প্রশ্নের পর প্রশ্নই করে গেছি, কিন্তু উত্তর খুঁজিনি কেউ। টাইম ফ্রেম হিসেব করলে খুব ভালোভাবেই বোঝা যায় ঘটনার আকষ্মিকতায় পুলিশের হাতেও যথেষ্ট সময় ছিল না। যেমন–ঘটনা জানাজানি হয় ২৩ আগস্ট রাত ৯টার পর, ২৪ আগস্ট ভোর ৫টায় আসামি আটক, আর দুপুরে প্রেস কনফারেন্স। সন্ধ্যায় আদালতে জবানবন্দি দিয়ে আসামি জেলে। মাঝে শুধু কাজের কাজ এটুকুই–সিদ্ধার্থকে ভিডিও কলে রেখে তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা। আবার পুলিশের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আসামি দুজন ‘আসল নাকি নকল’–সেই চর্চা। তারপর থেকে বিরামহীন প্রশ্ন আলামতে শশা-খেজুর কেন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলল না কেন, আসামিদের সঙ্গে ভিকটিমদের ফোনে যোগাযোগ পাওয়া যাবে না কেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন, ডোপটেস্ট কোথায়, এটা কেন হয়নি, সেটা কেন হয়নি…? অথচ আমরা কেউ বুঝে উঠতে পারিনি যে, যাদের কাছে উত্তর খুঁজছি, তারা নিজেরাই জানেন না কিছু। তাই রংপুরে পা রেখে কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজিনি তদন্তকারীদের কাছে, নিজেই খুঁজেছি। সব যখন হাতে পেয়েছি, তারপর তাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। তিনদিন পর ঢাকায় ফিরে ফলোআপ করতে গিয়ে বুঝলাম অনেক সমীকরণের পর তারাও হাঁটছেন একই পথে–অর্থাৎ, মোটিভ হলো–পরিকল্পিত চুরির উদ্দেশ্যে হত্যা। তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী দাঁড়ায়, তা এখন দেখার অপেক্ষায়।
বরাবরের মত এ ঘটনার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে আনুমাননির্ভর বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যাকে আমরা বলি পপুলিস্ট ধারণা। অথচ সংবাদমাধ্যমের বড় দায়িত্ব হল পপুলিস্ট ধারণাকে এড়িয়ে শুধুই সত্যের অন্বেষণ করা। সে সত্য যাকেই সুবিধা দিক না কেন, সংবাদমাধ্যম নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে সে সত্যকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু এখানে আমি এবং আমরা; অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমগুলো সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। কারণ পপুলিস্ট ধারণাকে পিছে ফেলে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের বদলে আমরা ব্যস্ত ছিলাম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ধরে শুধু প্রশ্ন তোলায়। সেসব তত্ত্বের সম্ভাব্যতা যাচাই করে সঠিক তথ্য তুলে ধরলেও সমাধান হতো অনেক প্রশ্নের। দুঃখের বিষয় আমাদের অধিকাংশই সে পথে হাঁটিনি।
নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ। ছবি: চরচা
এমনকি প্রশ্ন আছে সাংবাদিকতার রীতি মানা নিয়েও। এই যেমন ধর্ষণের অভিযোগটি যেভাবে সামনে এল, তা কি সাংবাদিকতার নীতি সমর্থন করে? ধরে নিলাম সংবাদকর্মী তার অনুসন্ধানের সুবিধার্থে তথ্যটি তুলে এনেছেন। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী কি ছিলেন না, যিনি প্রচারের আগে এই তথ্য যাচাই করবেন? একই প্রশ্ন রয়েছে ক্রাইম সিনের জব্দ না করা আলামত নিয়ে প্রশ্ন তোলা আরেকটি প্রতিবেদনকে ঘিরেও। সেখানে সংবাদকর্মী ক্রাইম সিনে গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন অনেক প্রয়োজনীয় আলামত জব্দ না করার বিষয়ে, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তিনি যদি সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতেন কোন আলামত কেন জব্দ করা প্রয়োজন ছিল, তবেই তা তদন্তে সহায়ক হতে পারত। ক্রাইম সিনে ওই সংবাদকর্মী যতটা মনেযোগ দিয়েছেন, তার খানিকটা বিদ্যুতের কাটা তারে দিলেই তিনি আরও গভীরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।
আবার আলামত যা জব্দ হয়েছে, সেটা ল্যাবে পাঠানোর আগে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ বিষয়। সহজ করি, আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিটি আলামত আলাদা আলাদা করে নিজে দেখেন, তারপর সেগুলো সিলগালা করার ব্যবস্থা করা হয়। যেন আলামতে কোনো টেম্পারিংয়ের সুযোগ না থাকে। তাই এই প্রক্রিয়া মেনে আলামত পাঠাতে খুব দেরি হলো কি না, সেটা ভেবে দেখা দরকার ছিল সংবাদমাধ্যমের। কারণ, আমার মাঠের অভিজ্ঞতা বলে সব প্রক্রিয়া শেষে আলামত পাঠাতে ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি সময় লাগার উদাহরণ আছে। কিন্তু এসব না খুঁজে সংবাদমাধ্যম প্রতিযোগিতায় নামল–অমুকের রিপোর্টের পর তমুক আলামত পাঠানো হল ল্যাবে।
তাছাড়া, বাড়ির ছাদে পানি ঢেলে আলামত ধুয়ে নষ্ট করার অভিযোগের বিষয়ে সঠিক তথ্য সংবলিত কোনো প্রতিবেদন চোখে পড়েনি আমার। কেন মোটরের সুইচ আর ঘরের বাতির সুইচ আলাদা করা গেল না, কেন পানির মোটর চালানোর পরও শব্দ কানে এল না তার ব্যাখ্যা পেয়েছি পরে ক্রাইম সিনে গিয়ে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা তুলে না ধরে আমরা শুধু প্রশ্নই তুলেছি ষড়যন্ত্র খোঁজার উদ্দেশ্যে। এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চরচায় আছে। আগ্রহীরা নজর বোলাতে পারেন।
শুধু তাই নয়, তদন্তে আসামির পরিবারের সুস্পষ্ট অসহযোগিতা চোখে দেখার পরও তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি কেউ। তদন্তের নিয়ম অনুযায়ী, অন্যদের মতো দুই আসামির পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে ডাকা হলেও সাড়া দেননি তারা। সেই সঙ্গে মামলার বড় আলামত দুজনের তিনটি মোবাইল ফোনও একাধিকবার চাওয়া স্বত্ত্বেও ডিবির কাছে হস্তান্তর করেননি অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা। আমার মতে, এখানে আসামির পরিবারকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছি আমরা সংবাদমধ্যমের কর্মীরা।
ব্যর্থ আসলে কারা?
যেকোনো বড় ঘটনায় মিডিয়ার চাপের সঙ্গে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে পপুলিস্ট ধারণা। এই বাস্তবতা যে শুধু আমাদের দেশেই তা কিন্তু নয়। বিশ্বের নানা দেশে বহু ঘটনার প্রমাণ আছে মিডিয়া ট্রায়াল আর পপুলিস্ট ধারণার চাপ মোড় ঘুরিয়ে দেয় মূল তদন্তের, এমনকি নিরপরাধ ব্যক্তির সাজার ঘটনাও মিলবে অনলাইন ঘটলেই। এ ক্ষেত্রে কলকাতায় বিখ্যাত ‘ধনঞ্জয় মামলা’র কথাটি স্মরণীয়। ১৯৯০ সালের ৫ মার্চ হেতাল পারেখকে (১৮) খুন করার অপরাধে ২০০৪ সালের ১৪ আগস্ট ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ফাঁসি হয়। ধনঞ্জয় বরাবর বলেছেন, তিনি নির্দোষ। কিন্তু পপুলিস্ট ধারণা এবং সংবাদমাধ্যমের চাপ বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে ধনঞ্জয়কেই। শেষ পর্যন্ত ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হয়। আর এ বছরের ১৪ আগস্টও ‘জাস্টিস ফর ধনঞ্জয়’ দাবিটি উঠল। এ নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। পপুলিস্ট দাবির মুখে কী হতে পারে–তার এক বড় উদাহরণ ধনঞ্জয়। কেউ আজও জানে না–ধনঞ্জয় অপরাধী, নাকি না। কিন্তু তার ফাঁসি কার্যকরের ২২ বছর হয়ে গেছে।
গণপতি চক্রবর্তীর স্বপরিবারে পরিকল্পিত হত্যার ঘটনায় এই পপুলিস্ট ধারণা এবং মিডিয়া ট্রায়ালের চাপ স্পষ্ট। এই যেমন আমি ডিবির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ার পর রিপোর্টে কিছুই আসবে না জেনেও দুই আসামির ডোপ টেস্ট করা হলো কেন? কোনো দ্বিধা ছাড়াই সরাসরি জবাব পেয়েছি ‘মিডিয়ার চাপে’।
যারা বুঝবার তারা ঠিকই বুঝবেন দায়টা কেন শুধু পুলিশকে না দিয়ে সবাইকেই দিলাম। যারা এই সংকট বুঝতে চাইবেন না, তারা হয়তো এই লেখাতেও নতুন কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজে বের করবেন। আমি একজন মাঠের সাংবাদিক হয়ে এটুকুই বুঝি যে, সত্য যাই হোক না কেন, আমার কাজ নির্মোহভাবে তার পাশে থাকা। তাই এই ঘটনায় সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়, তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশ–সবাই অপেশাদার আচরণ করেছে এবং করছে এখনো। সাধারণ মানুষকেও দায় না দিয়ে পারা যাচ্ছে না। কারণ, তার হাতে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নামের একটি অস্ত্র আছে–যেখানে যেকোনো জিনিস যে কেউ চাইলে ছড়িয়ে দিতে পারে। আবেগের বসে হোক বা না বুঝে হোক–অনেকে তা লাইক শেয়ার, কমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেন, যা দিনশেষে এমন সংবেদনশীল ঘটনার তদন্তে প্রভাব ফেলে। ফলে অপেশাদার আচরণের এ ব্যর্থতা আমাদের সবার। দুঃখিত গণপতি চক্রবর্তী, প্রীতিলতা চক্রবর্তী, আগামী চক্রবর্তী, আয়ুস চক্রবর্তী প্রীয়ম।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, চরচা