গত রোববার জাতীয় সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে বহুলালোচিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ নিয়ে পরে আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। এখানে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬’ নিয়ে কথা বলব। এই আইনের উদ্দেশ্য–বাবা–মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন।
বাবা–মা জীবিত থাকতে সন্তানদের কাছে জমি বা স্থাবর সম্পদ কেন হস্তান্তর করেন? কখনো স্বেচ্ছায় করেন, কখনো পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে। আগে থেকে লিখে না দিয়ে গেলে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি দখল করে নিতে পারেন–এমন আশঙ্কাও থাকে। আবার লিখে দেওয়ার পরও সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা আছে। যেমন ধরুন–বাবা কন্যা সন্তানকে কোনো সম্পত্তি লিখে দিলেন, বিয়ের পর সেই সন্তানের বিয়ের পর স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির লোকজনও সম্পদ লিখিয়ে নিতে পারেন। তখন সম্পত্তি দাতার কিছু করার থাকে না।
সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রাচ্যের দেশগুলোতে যত উদ্বেগ–দুশ্চিন্তা, মারামারি–কাটাকাটি, পশ্চিমে তা দেখা যায় না। সেখানকার বাবা–মায়েরা জমি–সম্পদের চেয়ে সন্তানকে গড়ে তোলাকেই বড় সম্পদ মনে করেন। অনেক বিত্তবান ব্যক্তি সমুদয় স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ জনগণের কল্যাণে দিয়ে যান; হাসপাতাল–শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেন।কিন্তু প্রাচ্যের বাবা–মায়েরা ভাবেন সন্তান যত লেখাপড়া করুক না কেন, তার জন্য বাড়ি-গাড়ি তাকেই করে যেতে হবে। সন্তানদের নামে সবকিছু লিখে দিয়ে অনেক বাবা–মা বিপদেও পড়েন। একাধিক সন্তান থাকলে কে বাবা–মাকে দেখবেন, তা নিয়ে ঝগড়াঝাটি চলতে থাকে। এই ঢাকা শহরে এক বাবার গল্প জানি, যিনি ধানমণ্ডির একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে একাকি থাকতেন। অথচ তার চার ছেলে শহরের বিভিন্ন অভিজাত পাড়ায় থাকতেন, কেউ বাবার দায়িত্ব নিতেন না। এ রকম হাজারও বাবা আছেন। আবার অনেকের সন্তান দেশেও থাকেন না। কিন্তু তাদের নামে জমি–ফ্ল্যাট আছে।
প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে সংবাদমাধ্যমগুলোতে অসহায় বাবা–মার কাহিনি আমরা গণমাধ্যমে পড়ি। টেলিভিশনে দেখি। অনেকে বৃদ্ধাশ্রমকে শেষ আশ্রয় হিসেবে নিলেও বিত্তবান সন্তানদের কাছে যান না বা যেতে পারেন না।
নতুন আইন করার পেছনে আরও একটি যুক্তি আছে। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার আগে সন্তানেরা প্রবল উৎসাহে বাবা-মার সেবাযত্ন করে থাকে। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর করার পর কেউ দেখে না। ফলে বুড়ো বাবা–মার অসহায়ত্ব প্রকট হয়। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি পাস হয়েছে, তাকে প্রতিটি বিবেকবান মানুষই স্বাগত জানাবেন।
এই আইনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো:
আজীবন ভোগদখল: বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি বা স্বামী-স্ত্রী নিজেদের সম্পত্তি সন্তান, নাতি-নাতনি বা সঙ্গীর নামে দান বা হস্তান্তর করলেও দাতা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনি অধিকার বজায় থাকবে।
নতুন ধারা: আইনে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় নিরপেক্ষতা: এই বিধান সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এটি প্রচলিত সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের অধীন ‘হেবা’ কিংবা অন্যান্য স্বীকৃত আইনি পদ্ধতিকে প্রভাবিত বা ক্ষুণ্ন করবে না।
গ্রহীতার মৃত্যু হলে: দাতার জীবিত থাকা অবস্থায় যদি গ্রহীতা (সন্তান বা স্বজন) মারা যান, তবে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে, তবে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে।
দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে এবং রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে এই অধিকার পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করা যাবে। কোনো পক্ষ অক্ষম বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে জেলা জজ বা আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
কয়েকদিন আগে এক ভিডিওতে দেখলাম, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাবার কাছ থেকে দলিলে সই নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তার মেয়ে। ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক তোলপাড় হয়।
কেন অসুস্থ বাবার কাছ থেকে মেয়ে দলিল লিখিয়ে নিতে চাইছেন? তিনি কি অন্য ভাইবোনদের বঞ্চিত করতে এই কাজ করেছেন, না নিজের অধিকার রক্ষা করতে? বাংলাদেশের মুসলিম মেয়েরা বাবা–মার সম্পদের ভাগ পান ছেলেদের অর্ধেক। সামাজিক বাস্তবতায় তাও ভোগ করতে পারেন না।
এই ঘটনার সঙ্গে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর কিছুটা হলেও সম্পর্ক আছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইনে সন্তানের নামে জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধনের পরও বাবা-মায়ের আজীবন ভোগদখল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিধান রাখার কথা আছে। কিন্তু বিরোধী দল কেন ধর্মের দোহাই দিয়ে এর বিরোধিতা করল, তা বোধগম্য নয়। ওই আইনে পরিষ্কার বলা আছে, এটি প্রচলিত সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের অধীন ‘হেবা’ কিংবা অন্যান্য স্বীকৃত আইনি পদ্ধতিকে প্রভাবিত বা ক্ষুণ্ন করবে না।
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনও এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি তখনই আসে, যখন পূর্বসূরি প্রয়াত হন। এখানে তো তিনি জীবিত আছেন।
বিরোধী দলের কেউ কেউ যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, ২০১৩ সালের ভরণপোষণ আইন দিয়েও সম্পত্তি হস্তান্তরকারী ব্যক্তির সুরক্ষা হতে পারে। এটি হলো অনেকটা নিজের সম্পত্তি অন্যকে দান করে তার কৃপা ভিক্ষা করা। কোনো আত্মমর্যাদাবান ব্যক্তি এটা করতে চাইবেন না।
বিরোধী দলের সদস্যদের যুক্তি খুব অস্পষ্ট। একজন তো বলেই ফেলেছেন, কাগজে মালিকানা দিয়ে বাস্তব দখল নিজের কাছে রেখে মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিধান মূলত ‘হেবা’র সংজ্ঞা বদলে দেয়। এতে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার পথ খুলে যেতে পারে।
পূর্বসূরি বেঁচে থাকতে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন আসে কেন?
বিলের ১২২অ ধারার সাব-সেকশন ৪ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইনটি বিদ্যমান হেবা, সাধারণ দান বা শরিয়াহ ল’-এর মাধ্যমে অন্য যেকোনো উপায়ে হস্তান্তরিত দলিলের কার্যকারিতাকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন, সীমিত বা প্রভাবিত করবে না।
২০১৩ সালের বাবা–মার ভরণপোষণ আইনে বলা আছে, কোনো সন্তান তার মা–বাবাকে অথবা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। সন্তানেরা তাদের মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন।
আইনের ৫ (১) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো প্রবীণ তার সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনেন এবং সে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এই আইনের ব্যবহার আমাদের দেশে কদাচিত হয়।
অনেক বাবা–মা অত্যন্ত কষ্টে থাকলেও সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। আবার করলে যে প্রতিকার পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
বাবা-মার অবহেলা রোধে কড়া বার্তা দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, “বাবা-মার সম্পত্তি জোরপূর্বক লিখে নিয়ে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেওয়ার মতো ঘটনা আমাদের আত্মাকে ভেঙে দেয়।” এই বাস্তবতায় তিনি বাবা-মার ভরণপোষণ আইন আরও কঠোর করার দাবি জানান ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানান।
আজ যে দলের সদস্যরা ধর্মের দোহাই দিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের বিরোধিতা করছেন, সেই দল পাকিস্তান আমলে আইয়ূব খানের পারিবারিক আইন সংশোধনেরও বিরোধিতা করেছিল। তাদেরই সহযোগী কোনো কোনো দল ও সংগঠন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, কমিশনের সদস্যদের বিচারও দাবি করেছিল। সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে চব্বিশের গণঅভ্যূত্থান সংগঠিত হয়েছিল। আর এখন নারী ও পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা