তিন বছরের মধ্যে মোট চারটি বোর্ডের অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর। কিন্তু অতীতে যা হয়নি কখনোই, সাম্প্রতিক সময়ে সেটারই সাক্ষী হতে হচ্ছে তাদের। বিনা নোটিশে বিসিবির পক্ষ থেকে কর্মীদের ফোন তল্লাশি করা হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জব্দও করা হচ্ছে। কেন নিজেদেরই কর্মীদের বিরুদ্ধে হঠাৎ বিসিবির এই চিরুনি অভিযান, তা নিয়ে সর্বমহলেই জেগেছে প্রশ্ন। একই সময়ে পুরো বোর্ডে ছড়িয়ে পড়েছে অদৃশ্ আতঙ্ক।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, বিসিবি কেন হঠাৎ এমন একটা কাজ করতে গেল? আইন অনুযায়ী এমন কিছু করার অধিকার কি তাদের আছে? একটি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের নিয়ম-কানুন মেনে কর্মীদের ফোন তল্লাশি করতেই পারে। এক্ষেত্রে বিসিবির নীতিমালা কি বলছে?
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে চরচা জেনেছে, বিসিবির নীতিমালায় এভাবে কর্মীদের ফোন তল্লাশি বা জব্দ করার আইন নেই। হয়ত এই কারণেই ফোন জব্দ করে চার-পাঁচদিন রেখে দেওয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়েও শঙ্কা বোধ করছেন অনেকেই।
এত বছরে যা করা হয়নি, তেমন একটা বিতর্কিত পদক্ষেপ কেন এখন এসে নিল বিসিবি? নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী চরচাকে বলেছেন সম্ভাব্য কারণ, “আমরাও তো কিছু খোঁজ-খবর রাখি। এই ফোন তল্লাশির কারণ একটাই, বিসিবির বড় স্যারদের অনেকেই মনে করেন, এই বোর্ডের অনেকেই আগের বোর্ডের পরিচালকদের তথ্য পাচার করে দিচ্ছেন। কারা করছেন, সেটা তারাও জানেন না। শুধুমাত্র শোনা কথায় কান দিয়ে তারা নিজেদের কর্মীদের যে হয়রানি করছে, এটার ফলাফল ভালো না-ও হতে পারে।”
বিসিবি নিজেদের কর্মীদের কাছে কিংবা সংবাদমাধ্যমে এখনো এই ফোন তল্লাশি বা জব্দের সুস্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেনি। ফলে একদিকে বাতাসে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ক্রমশ নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন ভুক্তভোগীরা। কেন এভাবে ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, এটার কারণ জানতে চান সবাই।
এই ফোন জব্দের তালিকায় আছেন বিসিবির টেন্ডার বিভাগের কাজের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি। সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, তার ফোনে কিছু ছবি থাকায় তাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলেছে বিসিবি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সম্প্রতি হয়ে যাওয়া একটি টেন্ডারের কিছু ছবি তুলে রেখেছিলেন কাজের সুবিধার জন্য। আর সেটাই কাল হয়েছে তার জন্য।
কেন ফোনে ছবি রেখেছিলেন, সেই প্রশ্নে চরচাকে তিনি বলেন, “এই যুগে এসে কেউই কিন্তু কাগজপত্র নিয়ে ঘুরে না। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনও আমরা ছবি তুলে দেখাই। কয়েকটি ছবি আমি তুলে রেখেছিলাম অনুমতি নিয়েই। তবুও আমাকে জেরা করা হয়েছে, ফোনও নিয়ে গেছে। আমি জানি না ভুলটা কোথায় হয়েছে।”
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য চরচা যোগাযোগ করেছিল বিসিবির নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম ফরহাদের সঙ্গে। তবে কয়েক দফার চেষ্টাতেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একটি সংবাদমাধ্যমকে এই ফোন তল্লাশির একটা ব্যাখ্যা অবশ্য দিয়েছেন কাজী শামীম, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি দাবি করেছেন, এটা তাদের রুটিন কার্যক্রমের অংশ এবং এখানে আগে থেকে ঘোষণা দেওয়ার কিছু নেই। সঙ্গে এ-ও বলেছেন, সরকারি সব জায়গায় এই চর্চা রয়েছে।
তবে বিসিবির ইতিহাসেই যেহেতু এমন কিছু অতীতে হয়নি, তাই এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘নিয়মিত কার্যক্রম’ বললে সেটার গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
২০১০ সাল থেকে বিসিবিতে কর্মরত একজন কর্মী তামিমের বোর্ডের এমন আচরণে বিস্মিত, “আমাদের বিভাগেও কয়েকজনের ফোন নিয়ে গেছে। এতগুলো বোর্ডে কাজ করলাম, ৫ আগস্টের পর দেশে এতকিছু হয়ে গেল, তখনও কিন্তু এমন কিছু দেখেন নাই আপনারা। আমাদের নাগরিক অধিকার বলেও তো একটা কথা আছে?”
বিসিবি নিজেই যেহেতু ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে, তাই ফোন তল্লাশির মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আপাতত উপসংহারে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।