নেদারল্যান্ডস এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ থেকে কয়েক শ কোটি ডলার মূল্যের স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে এবং সেটা রেখেছে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে। নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিএনবি জানিয়েছে, এভাবে স্বর্ণ স্থানান্তর করে তারা নিজেদেরকে ‘ঘোরতর কোনো বিপদের মুহূর্ত সামলানোর জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত রাখছে।’
কী ধরনের বিপদের কথা বলছে নেদারল্যান্ডস? তাদের ব্যাখ্যা, ‘ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যেভাবে বাড়ছে, সেদিকে নজর রেখে’ তারা উজ্জ্বল ধাতুটি সরিয়ে নিচ্ছে, যাতে সেটা ‘সংকটের সময়ে খুব দ্রুত কাজে লাগানোর মতো অবস্থায় থাকে।’ বিবিসি জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নেদারল্যান্ডসের মোট স্বর্ণের রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১৩ টন, সেখান থেকে ৮৬ টনের কাছাকাছি স্বর্ণ সরিয়ে যুক্তরাজ্যে নিয়ে গেছে ডাচরা।
নেদারল্যান্ডসের এই পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ডাচরা এমন সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছে? তারা কি সামনের দিনগুলোতে কোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা আসবে বলে অনুমান করছে?
তেমন কিছু মনে হচ্ছে না–বিবিসিতে লিখেছেন তাদের বাণিজ্য প্রতিবেদক মাইকেল রেস। তাহলে কারণটা কী? রেস লিখেছেন, বিশ্ব দিনে দিনে যেভাবে অস্থির ও অনিশ্চিত অবস্থার দিকে যাচ্ছে, নেদারল্যান্ডসের এই পদক্ষেপ স্পষ্টতই সেটার প্রতিক্রিয়া। বিভিন্ন দিকের বাণিজ্য ও সামরিক যুদ্ধের কারণে স্বর্ণের বড় রিজার্ভ রাখা দেশগুলো আরও সতর্ক হয়ে উঠছে এবং স্বর্ণের রিজার্ভটা তাদের দেশের কাছাকাছি রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে।
এ বছরের শুরুর দিকে ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ সরিয়ে নিজ দেশে নিয়ে এসেছে। জার্মানির বুন্দেসবাংক একই কাজ ২০১৬ সালেই করেছে। এর আগের কয়েক বছর ধরে তারা অন্য দেশে থাকা রিজার্ভের মধ্যে ২১৬ টনেরও বেশি স্বর্ণ নিজ দেশে সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে সরিয়ে নিয়েছিল ১১১ টন, প্যারিস থেকে ১০৫ টন।
এই ধরনের কৌশল নতুন নয়, সাধারণত বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার সময়ে অনেক দেশ এই কৌশল নেয়। আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের রিসার্চ অ্যানালিস্ট লিনা থমাস ও ড্যান স্ট্রাইভেন বিবিসিকে বলেন, “স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও ইউরোপের কয়েকটি সেন্ট্রাল ব্যাংক নিউইয়র্কে থাকা তাদের স্বর্ণের রিজার্ভের কিছু অংশ সরিয়ে এনেছিল।”
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট জোসেফ কাভাতোনি অবশ্য বলছেন, দুনিয়ার নানা দিকে চলতে থাকা যুদ্ধ আর বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনা এভাবে বিভিন্ন দেশের স্বর্ণের রিজার্ভ সরানোর ‘সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব রাখতে পারে ঠিকই’, তবে প্রভাব বিস্তার করা ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে ‘এগুলোই সবচেয়ে বড় কারণ নয়’।
মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার কিংবা শুধুই স্বর্ণের রিজার্ভকে এমন কোনো জায়গায় রাখা, যেখান থেকে তা চাইলেই বিক্রি করা যাবে–এই ব্যাপারগুলোও রিজার্ভ সরানোর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে। “ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় ঘনিয়ে এসেছে–এমনটা আমার অন্তত মনে হচ্ছে না। আমার যেটা মনে হচ্ছে, তা হলো–রিজার্ভে থাকা সম্পদকে কীভাবে আরও ভালোভাবে দেখভাল করা যায়, কীভাবে এই সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়ানো যায়–এসব এখন মানুষ অনেক ভালো জানে। কীভাবে এই রিজার্ভের সম্পদকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটা নিয়েও মানুষ এখন গভীরভাবে ভাবে”, বিশ্লেষণ কাভাতোনির।
বিশ্বে স্বর্ণ গচ্ছিত রাখার সুবিধা দেওয়া সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। সেন্ট্রাল লন্ডনের ৩০০ বছরের পুরনো এই প্রতিষ্ঠানের নিচে প্রায় ৪ লাখ স্বর্ণের বার সংরক্ষিত আছে, যার দাম ২০ হাজার কোটি পাউন্ডেরও বেশি।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি) জানিয়েছে, এই বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে স্বর্ণের যে রিজার্ভ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো এখন রাখা হয়েছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে। ডিএনবির গভর্নর ওলাফ স্লাইপেন বলেছেন, “আমরা তো চাই যেন এগুলো (ভল্টে থাকা স্বর্ণের রিজার্ভ) আমাদের কখনো কাজে লাগানোর দরকারই না পড়ে, তবে বিপদের সময়ের জন্য আমাদের প্রতিরোধ আর প্রস্তুতি তো জোরদার করে রাখতে হবে!”
লন্ডন কেন? কারণ, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি। সংকটের সময়ে আপনি যদি খুব দ্রুত স্বর্ণ কিনতে বা বেচতে চান, তাহলে লন্ডনই সবচেয়ে সেরা জায়গা। এই কারণেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ড স্বর্ণের রিজার্ভ রাখার জনপ্রিয় জায়গাগুলোর একটি।
বিশ্বে স্বর্ণ গচ্ছিত রাখার সুবিধা দেওয়া সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। সেন্ট্রাল লন্ডনের ৩০০ বছরের পুরনো এই প্রতিষ্ঠানের নিচে প্রায় ৪ লাখ স্বর্ণের বার সংরক্ষিত আছে, যার দাম ২০ হাজার কোটি পাউন্ডেরও বেশি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জরিপ বলছে, স্বর্ণ গচ্ছিত রাখার ভল্টগুলোর মধ্যে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, তবে যত দিন যাচ্ছে, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ততই তাদের এই দামি ধাতুর রিজার্ভ গচ্ছিত রাখার জায়গার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনছে। অর্থাৎ, একই জায়গায় সব স্বর্ণের রিজার্ভ না রেখে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের থমাস ও স্ট্রাইভেন জানান, নিজ দেশের স্বর্ণের রিজার্ভ কোথায় গচ্ছিত রাখা উচিত, এটা “যত দিন যাচ্ছে, ততই রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভাবনার কেন্দ্রে চলে আসছে।”
উদাহরণ হিসেবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে নেদারল্যান্ডসের রিজার্ভের কতটুকু কোথায় আছে, সে বর্ণনা তুলে ধরা যায়। নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণের রিজার্ভ ছড়িয়ে রাখা আছে চারটি জায়গায়–নেদারল্যান্ডসেরই শহর জাইস্টের ক্যাশ সেন্টারে, আর এর বাইরে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। আমেরিকার মাটি থেকে ইউরোপে স্বর্ণের রিজার্ভের একটা অংশ সম্প্রতি সরিয়ে আনার আগে এই চার জায়গায় রিজার্ভ রাখার হার ছিল এমন–জাইস্টে ৩০.৮ শতাংশ, নিউইয়র্কে ৩১.৩ শতাংশ, লন্ডনে ১৮.১ আর কানাডার অটোয়ায় ১৯.৭। কিন্তু ৮৬ টন স্বর্ণ স্থানান্তরের পর এই হার দাঁড়িয়েছে–জাইস্টে ৩০.৮ শতাংশ, লন্ডনে ৩২.১ এবং নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় ১৮.৫ শতাংশ করে।
তা নেদারল্যান্ডস যে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ আমেরিকার মাটি থেকে লন্ডনে নিয়ে গেছে বলা হচ্ছে, এই স্থানান্তর কীভাবে ঘটেছে? একটা দেশ তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ কীভাবে অন্য একটা দেশ থেকে তৃতীয় আরেকটা দেশে নিয়ে যায়? আধুনিক বিশ্বে একটা দেশের সম্পদ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের অনেকগুলো উপায়ই আছে।
সারা বিশ্বেই রিজার্ভে এক ধরনের বদল দেখা যাচ্ছে। ডলার রিজার্ভের পরিমাণ মোট রিজার্ভের ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর এর বিপরীতে স্বর্ণের রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চার বছর আগেও এ হার ছিল ১৫ শতাংশের আশপাশে।
বিবিসির প্রতিবেদন জানাচ্ছে, নেদারল্যান্ডস উত্তর আমেরিকায় থাকা তাদের স্বর্ণের রিজার্ভের মধ্যে প্রায় ৫৯ টন নিউইয়র্কে বিক্রি করেছে, এরপর লন্ডনে সে পরিমাণ স্বর্ণ কিনে নিয়েছে। অর্থাৎ, ওই ৫৯ টন স্বর্ণ আটলান্টিকের ওপর দিয়ে পরিবহন করার দরকার পড়েনি–সেটা যে জায়গায় ছিল সেখানেই আছে, শুধু মালিকানায় হাতবদল হয়েছে কাগজে-কলমে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কাভাতোনির কাছে এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে একটা ধারণা পাওয়া যায়, “ধরুন, আমার স্বর্ণ আছে লন্ডনে, আমি সেগুলো নিউইয়র্কে নিয়ে যেতে চাই। আমি লন্ডনে সেগুলো বিক্রি করে দিতে পারি, এবং নিউইয়র্কে কিনতে পারি–একই দিনে, একই সময়ে। অর্থাৎ, কার্যত শুধু হিসাবের বইয়েই স্বর্ণ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে গেল, অন্য কোনো লজিস্টিক্যাল অদলবদলের দরকার পড়ল না।”
তবে নেদারল্যান্ডস এভাবে শুধু হিসাবের বইয়ে অদলবদলের মাধ্যমে ৫৯ টন স্বর্ণ তো স্থানান্তর করেছেই, এর বাইরে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ‘বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে’ জাইস্টে। আর একই পরিমাণ স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয় বলে ডিএনবি-কে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে আল জাজিরা।
এভাবে স্বর্ণ বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে যে প্রতিষ্ঠানগুলো, তারা এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলতে রাজি হয়নি বলে জানাচ্ছে বিবিসি। তবে তারা লিখেছে, এতটুকু ধরেই নেওয়া যায় যে, ‘দ্য ইটালিয়ান জব’-এর মতো কিছু যাতে বাস্তবে ঘটে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে এভাবে স্বর্ণ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে উঁচু স্তরের নিরাপত্তার পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্বর্ণ পরিবহনের কাজ করে–এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতেগোনা। এর মধ্যে একটি হলো ব্রিঙ্ক’স গ্লোবাল সার্ভিসেস। তারা বিবিসিকে বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দিক থেকে এভাবে স্বর্ণ পরিবহনের ‘চাহিদা বেড়ে গেছে’। কী কারণে সেটা হচ্ছে? প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তারের বিশ্লেষণ, “একদিকে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে, অন্যদিকে রিজার্ভে থাকার মতো কৌশলগত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বেড়েই চলেছে। দুটিই এই ট্রেন্ড (স্বর্ণ পরিবহনের চাহিদা বেড়ে যাওয়া) তৈরি হওয়ার পেছনে অবদান রেখেছে।”
স্বর্ণের রিজার্ভ কীভাবে রাখা উচিত–এ ব্যাপারে দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে ভাবনা বেড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দিন দিন স্বর্ণ কেনার পরিমাণ বাড়িয়ে চলেছে। গত এপ্রিলে ডয়েচ ব্যাংক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বেই রিজার্ভে এক ধরনের বদল দেখা যাচ্ছে। ডলার রিজার্ভের পরিমাণ মোট রিজার্ভের ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর এর বিপরীতে স্বর্ণের রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চার বছর আগেও এ হার ছিল ১৫ শতাংশের আশপাশে। এমনটা কখন ঘটে এবং সে সময় রিজার্ভ স্থানান্তরের প্রবণতাই–বা কেমন থাকে, তা নিয়ে সবিস্তার আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। সেটা অন্য কোনো লেখায় করা যাবে। তবে এটুকু বলে রাখা যেতে পারে যে, সংঘাত ও মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর অনাস্থার সঙ্গে যেমন, তেমনি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বে বদলের সঙ্গে এ বদলের সম্পর্ক রয়েছে।
“আমরা তো চাই যেন এগুলো (ভল্টে থাকা স্বর্ণের রিজার্ভ) আমাদের কখনো কাজে লাগানোর দরকারই না পড়ে, তবে বিপদের সময়ের জন্য আমাদের প্রতিরোধ আর প্রস্তুতি তো জোরদার করে রাখতে হবে!” - ডিএনবির গভর্নর ওলাফ স্লাইপেন
এবার আসা যাক এই রিজার্ভের পুরোটাই নিজের দেশে রাখে না কেন–সে প্রসঙ্গে। গোল্ডম্যান স্যাকসের থমাস ও স্ট্রাইভেন তুলে ধরেছেন স্বর্ণ নিজ দেশেই গচ্ছিত রাখার খরচের দিকটির কথা। বিবিসিকে তারা বলেন, “নিজ দেশেই স্বর্ণ গচ্ছিত রাখা মানে বাহ্যিক (ফিজিক্যাল) নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেগুলো সময়ে সময়ে নিরীক্ষা করে দেখার অবকাঠামো তৈরি করা, বীমার ব্যবস্থা করা…এই খরচগুলো অপেক্ষাকৃত কম ধনী দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকের জন্য অনেক বেশি মনে হতে পারে।”
তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যে স্বর্ণ কেনার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলা হচ্ছে, আসলে কেমন হারে বাড়িয়েছে? ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব বলছে, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে ১ হাজার টন স্বর্ণ কিনেছে; যেখানে এর আগের দশ বছরের চক্রে বার্ষিক গড় অঙ্কটা ছিল ৫০০ টন।
এই ট্রেন্ডটা কবে থেকে শুরু হয়েছে, সে হিসাব করতে গেলে বিশ্বজুড়ে ২০০৮ সালে হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে হবে। আগামী বছর এই গড়টা আরও বাড়বে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে স্বর্ণের চাহিদা ব্যাপক হারেই বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এতে স্বর্ণের দামও বেড়েছে। একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছে, গত জানুয়ারিতে এক আউন্সের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৫ হাজার ডলারও ছাড়িয়ে গেছে।
এভাবে দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। তবে একটা বড় কারণ হচ্ছে–মানুষ এই দামি ধাতুটাকে একটা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখে। বাণিজ্যিক বা সামরিক যুদ্ধের কারণে যখন অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়, মানুষ তখন স্বর্ণকেই বিনিয়োগ করার মতো সম্পদ মনে করে।
মুদ্রাস্ফীতি আর সুদের হারের কারণেও স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। এই ধাতুটি চাইলেই আপনি বাড়ির পাশে পাবেন না, হাজারো বছর ধরে মানুষ ধাতুটিকে অনেক মূল্যবান কিছু হিসেবেই দেখে আসছে। ফলে, নিত্যদিনের জিনিসপত্রের দামের ওঠা-নামার কারণে স্বর্ণের দাম অতটা ওঠে-নামে না। সে কারণেই স্বর্ণে বিনিয়োগকে সব সময়ই ভালো কিছু ধরে নেওয়া হয়।
বিনিয়োগ ব্যাংক চার্লস শোয়াব জানাচ্ছে, “মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সূচক কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্সের (সিপিআই) চেয়েও গত আধা শতাব্দীতে স্বর্ণের দাম অনেক বেশি গতিতে বেড়েছে।”
স্বর্ণের দাম এই বছরের শুরুতে যে রেকর্ড চূড়ায় উঠেছিল, তার চেয়ে কিছুটা কমে এসেছে ঠিকই; তবে এর ইতিহাসে তাকালে দেখা যাবে, দামটা এখনো উঁচুতেই আছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬-এর শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১০৩ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ৪৯০০ ডলার দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা হবে মাত্রই শেষ হওয়া মাস আগস্টের দামের চেয়ে ৩০০ পাউন্ড বেশি।
থমাস ও স্ট্রাইভেন বলছেন, স্বর্ণের দাম এভাবে বাড়তে থাকার একটা মূল কারণ দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যাওয়া।