নরওয়ের সার্বভৌম ওয়েলথ ফান্ডের এক যুগান্তকারী বিনিয়োগ কৌশলের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এই ট্রিলিয়ন ডলারের ফান্ড পরিচালনাকারী সংস্থা নর্গেস ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট তাদের বন্ড বিনিয়োগ পুনর্গঠন ও ভালো আয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মার্কিন সরকারি ট্রেজারি বন্ডের ওপর তাদের নির্ভরতা ব্যাপকভাবে কমানোর সুপারিশ করেছে। ফান্ডটি তাদের বেঞ্চমার্ক বন্ড ইনডেক্সে সরকারি বন্ডের পরিমাণ ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, যদি এই প্রস্তাব অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হয়, তবে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ফান্ডে থাকা প্রায় ২১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড থেকে অন্তত ৮০ বিলিয়ন ডলার তুলে নেওয়া বা বিক্রি করে দেওয়া হবে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সম্প্রতি ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ঋণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বন্ড বাজারগুলোতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী ঋণের খরচ বৃদ্ধি করেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। নরওয়ের এই সিদ্ধান্তে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বেশ চাপে পড়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব অন্যদের ওপর পড়তে পারে এবং তারাও মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারেন।
ধারণা করা হচ্ছে, পৃথিবীর বৃহত্তম সার্বভৌম ওয়েলথ ফান্ড হিসেবে নরওয়ের এই সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। কারণ, বিশ্বজুড়ে সব তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় দেড় শতাংশ শেয়ার এককভাবে এই ফান্ডের অধীনে রয়েছে। ফলে এই ফান্ডের যেকোনো অ্যাসেট পুনরায় বরাদ্দের সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক ক্যাপিটাল ফ্লো বা পুঁজির প্রবাহকে সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। তবে বাজার যাতে আকস্মিক ধাক্কা না খায়, সে জন্য প্রস্তাবিত পরিবর্তনের যেকোনো পদক্ষেপ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের আগে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি এবং নর্গেস ব্যাংকের কৌশলগত লক্ষ্য
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ কৌশলের এই বিশাল পরিবর্তন কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নরওয়ের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে নর্গেস ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট একটি চিঠির মাধ্যমে এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তারা বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে এবং বাজারের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব ও লেনদেনের খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে সমগ্র প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এবং ধীরে ধীরে সম্পাদন করা হবে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করা হবে এবং ২০২৭ সালের বসন্তে ফান্ডের বার্ষিক হোয়াইট পেপার পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হবে।
এরপর নরওয়ের অর্থ মন্ত্রণালয় দেশটির পার্লামেন্টে চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করবে এবং সেখানে গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে। নরওয়ের সেন্ট্রাল ব্যাংক নর্গেস ব্যাংকের গভর্নর ইডা ওল্ডেন বাচে এবং এনবিআইএমর প্রধান নির্বাহী নিকোলাই টাঙ্গেন যৌথভাবে দেওয়া চিঠিতে লিখেছেন, বেঞ্চমার্ক ইনডেক্সে সরকারি বন্ডের ভাগ ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশ করা হলে তা আর্থিক বাজারের যেকোনো উত্তাল বা অস্থির পর্বেও ফান্ডের তারল্য চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হবে।
এ ছাড়া প্রযুক্তি খাতের গুটিকয়েক মার্কিন কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা কমাতে তালিকাভুক্ত নয়–এমন সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আলাদা চিঠিতে সুপারিশ করেছে। বর্তমানে এই তহবিল অ-তালিকাভুক্ত রিয়েল এস্টেট এবং নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের অনুমতি পেলেও অন্যান্য সমকক্ষ বৈশ্বিক ফান্ডের তুলনায় সেখানে তাদের অংশীদারত্ব বেশ কম।
মার্কিন ট্রেজারির বদলে বেসরকারি বন্ডে মনোযোগ
রয়টার্সের বিশদ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন সরকারি বন্ড থেকে সরে আসার অর্থ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগ একেবারে গুটিয়ে নেওয়া নয়, বরং বিনিয়োগের ধরন পরিবর্তন করা। নর্গেস ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, সরকারি ট্রেজারি কমানো হলেও তারা নন-গভর্নমেন্ট ডেট বা বেসরকারি বন্ড যেমন মর্টগেজ-ব্যাকড সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াবে, যাতে ঝুঁকির প্রিমিয়াম থেকে ভালো আয় আসে এবং পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় হয়। সামগ্রিক আমেরিকান ডলারে ফান্ডের মোট এক্সপোজার আগের মতোই প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে, তবে ডলারভিত্তিক মার্কেটের ভেতরের উপাদানে পরিবর্তন আসবে।
নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে যে, বন্ড ইনডেক্সে মার্কিন সরকারি বন্ডের বরাদ্দ ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে, যা ৮০ বিলিয়ন ডলার হ্রাসের সমতুল্য। একইভাবে ইউরোজোনের সরকারি ঋণের বরাদ্দ ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে সামান্য কমিয়ে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ করা হবে। বিপরীত দিকে জাপানি সরকারি বন্ডে বরাদ্দ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, আর যুক্তরাজ্যের বরাদ্দ ৪ দশমিক ২ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারের প্রকৃত আকারের সাথে ফান্ডের ইনডেক্সকে আরও নিখুঁতভাবে মেলানো সম্ভব হবে।
বিশ্ব ক্যাপিটাল মার্কেটের অভিভাবক বলে বিবেচিত নরওয়ের এই ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ফান্ডটির প্রস্তাব প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক ও বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন সরকারি বন্ডের চেয়ে করপোরেট ও অন্যান্য কাঠামোগত বেসরকারি ঋণের ঝুঁকি-রিটার্ন প্রোফাইলকে বেশি পছন্দ করছেন। সর্বসাকুল্যে, নরওয়ের ওয়েলথ ফান্ডের কৌশলগত প্রস্তাব কার্যকর হলে তা বৈশ্বিক বন্ড মার্কেটে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।