মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বি-১ (ব্যবসায়ীক) ও বি-২ (পর্যটন) ভিসার আবেদনকারীদের জন্য চালু করা ভিসা বন্ড (জামানত) নীতি স্থায়ী করেছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। নতুন নীতিতে বন্ডের পরিমাণ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ ৫০টি দেশের নাগরিকরা এই নীতির আওতায় পড়বেন।
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের ভিসা বন্ড নীতির আওতায় আনার কথা জানিয়েছিল ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস।
ভিসা বন্ড কী?
ভিসা বন্ড হল একটি আইনি এবং আর্থিক চুক্তি। যখন কোনো দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ মনে করে, কোনো একজন আবেদনকারী সেই দেশে গিয়ে আইন ভঙ্গ করতে পারেন বা মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় থাকতে পারেন, তখন তারা ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ জামানত হিসেবে দাবি করে। এটি একটি গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে যে, যাত্রী তার সফরের সকল শর্ত মেনে চলবেন।
কী পরিবর্তন হচ্ছে?
গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এক বছরব্যাপী পর্যালোচনায় দেখা গেছে- ভিসা বন্ড কর্মসূচি কার্যকর হয়েছে। নতুন নিয়ম আগামী সোমবার থেকে কার্যকর হবে। ভবিষ্যতে এই তালিকায় আরও দেশ যুক্ত হতে পারে।
পরীক্ষামূলক কর্মসূচির সময় বন্ডের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার ডলার, যা কনস্যুলার কর্মকর্তার বিবেচনায় নির্ধারণ করা হত। নতুন নিয়মে ৫ হাজার ডলারের বিকল্পটি বাতিল করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলার করা হয়েছে। এখন বন্ডের পরিমাণ হবে ১০ হাজার অথবা ২০ হাজার ডলার।
এই বন্ড কেন প্রয়োজন হয়?
অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সাধারণত তিনটি প্রধান কারণে এই বন্ড দাবি করে-
১. ভিসার মেয়াদের বেশি দিন থাকা রোধ: অনেক সময় পর্যটক বা ছাত্ররা নির্দিষ্ট মেয়াদের পর নিজ দেশে ফিরে না গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যান। আর্থিক বন্ড থাকলে ফিরে আসার প্রবণতা বাড়ে।
২. আইনি খরচ মেটানো: কোনো বিদেশি নাগরিক যদি সে দেশে অপরাধ করেন বা তাকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করতে হয়, তবে সেই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়াটি যেন সরকারের তহবিল থেকে খরচ না করতে হয়, সে জন্য ওই বন্ডের টাকা ব্যবহার করা হয়।
৩. আর্থিক সক্ষমতা যাচাই: বন্ড জমা দেওয়ার ক্ষমতা প্রমাণ করে যে আবেদনকারী আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং তিনি সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রীয় বোঝা হবেন না।
এই নিয়মের আওতাভুক্ত হবেন কারা?
এই নিয়ম বি-১ ও বি-২ ভিসার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা ব্যবসায়ীক ও পর্যটন ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তালিকাভুক্ত দেশের নাগরিকদের ভিসা সাক্ষাৎকারের আগে নির্ধারিত বন্ডের অর্থ জমা দিতে হবে। যদি ভিসা আবেদন বাতিল হয়, তাহলে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। আর ভিসা পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর আবেদনকারী ভিসার সব শর্ত মেনে চললে নির্ধারিত সময় শেষে সেই অর্থও ফেরত পাবেন।
অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান বা ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও থেকে যাওয়ার (ভিসা ওভারস্টে) প্রবণতা কমাতে গত বছরের আগস্টে এই কর্মসূচি চালু করেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। সরকারি হিসাবে, একজন ভিসা ওভারস্টে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গড়ে প্রায় ১৮ হাজার ডলার ব্যয় হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার ভ্রমণকারীদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানও এই তালিকায় রয়েছে। ভারত-সংলগ্ন এই তিন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ, বাণিজ্য এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এখন থেকে এসব দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন বা ব্যবসায়ীক ভিসার জন্য আবেদন করলে বাধ্যতামূলকভাবে ভিসা বন্ড জমা দিতে হবে। এটি আর অস্থায়ী নয়, বরং স্থায়ী নিয়ম হিসেবে কার্যকর থাকবে।
ভিসা বন্ড স্থায়ী করার ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটক, ব্যবসায়ী, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি এবং অন্যান্য নিয়মিত ভ্রমণকারীরা অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারেন।
যে ৫০টি দেশের নাগরিকরা এই নীতির আওতায় রয়েছেন
আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বাংলাদেশ, বেনিন, ভুটান, বতসোয়ানা, বুরুন্ডি, কেপ ভার্দে, কম্বোডিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, কোট দিভোয়ার, কিউবা, জিবুতি, ডোমিনিকা, ইথিওপিয়া, ফিজি, গ্যাবন, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, গ্রেনাডা, গিনি, গিনি-বিসাউ, কিরগিজ প্রজাতন্ত্র, লেসোথো, মালাউই, মৌরিতানিয়া, মরিশাস, মঙ্গোলিয়া, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, সাও টোমে ও প্রিন্সিপে, সেনেগাল, সেশেলস, তাজিকিস্তান, তানজানিয়া, টোগো, টোঙ্গা, তিউনিসিয়া, তুর্কমেনিস্তান, তুভালু, উগান্ডা, ভানুয়াতু, ভেনেজুয়েলা, জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়ে।
কর্মসূচি কতটা সফল?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা এই কর্মসূচিকে সফল বলে দাবি করেছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তালিকাভুক্ত ৫০টি দেশের প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ জন ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু কর্মসূচি চালুর প্রথম ১০ মাসে, এই নিয়মের আওতায় থাকা আবেদনকারীদের মধ্যে ৫০ জনেরও কম ব্যক্তি ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছেন।
প্রাথমিকভাবে সরকার ধারণা করেছিল, বছরে প্রায় ২ হাজার আবেদনকারীকে বন্ড দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ২০ হাজার আবেদনকারী এই নিয়মের আওতায় পড়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আবেদনকারী বন্ডের অর্থ জমা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ব্যবসায়ীক ও পর্যটন ভিসা ইস্যুর সংখ্যা ৮৩ শতাংশ কমে যায়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই নীতি তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে বি-১ ও বি-২ ভিসার চাহিদা আরও কমাতে ভূমিকা রাখবে।
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি কার্যকর হচ্ছে। এর আগে যে বৈধ বি১ ও বি২ ভিসা ইস্যু করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী- বাংলাদেশসহ তালিকাভুক্ত ৩৮টি দেশের নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত বন্ড জমা দিতে হতে পারে। এ তালিকায় যুক্ত হওয়া দেশগুলোর বেশিরভাগই আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
বিশ্লেষকদের মতে, ১০ থেকে ২০ হাজার ডলারের বন্ডের শর্ত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে। ফলে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা পর্যটনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ অনেকের জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়বে।