১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে কয়েকজন কৃষক চীনের লিনটং জেলায় কুয়া খোঁড়ার সময় হঠাৎ মাটির নিচে এক অদ্ভুত জিনিসের সন্ধান পান। আরও খোঁড়াখুঁড়ি করলে বেরিয়ে আসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ-আকৃতির মাটির মূর্তি। এই ঘটনার পরই চীনা প্রত্নতাত্ত্বিকরা এলাকাটি খনন করতে শুরু করেন এবং আবিষ্কার করেন চীনের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।
বলছি চীনের ‘টেরাকোটা আর্মি’ বা পোড়ামাটির সেনাবাহিনীর কথা। দেশটির শানসি প্রদেশের সিয়ান শহরের কাছে মাটির নিচে লুকিয়ে ছিল মাটির তৈরি হাজার হাজার যোদ্ধা, ঘোড়া আর রথ। এগুলো ২ হাজার ২০০ বছরের প্রাচীন। মূর্তিগুলোর গড়পড়তা উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি এটি, আর অনেকে তো একে ‘বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য’ বলে থাকে।
নির্মাণের নেপথ্য কাহিনি
এই বিশাল সমাধিসেনা তৈরি করিয়েছিলেন চীনের প্রথম সম্রাট চিন শি হুয়াং। মাত্র ১৩ বছর বয়সে সিংহাসনে বসার পরপরই, ২৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে তিনি নিজের সমাধি এবং এই সেনাবাহিনী নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। যদিও সমাধিটি সেনাবাহিনী থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রাচীন চীনা বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পরও পরকালে ক্ষমতা ও সুরক্ষা বজায় রাখতে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন। সেই বিশ্বাস থেকেই এই বিস্ময়কর নির্মাণ, যাতে পরকালেও সম্রাট সুরক্ষিত থাকেন। এই নির্মাণযজ্ঞ ছিল দীর্ঘমেয়াদী। প্রায় ৪ দশক ধরে ৭ লাখেরও বেশি শ্রমিক ও কারিগর এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। ২১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট চিন শি হুয়াংয়ের মৃত্যু হলে তার উত্তরসূরি কাজ চালিয়ে যান। ২০৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
যেভাবে সাজানো রণক্ষেত্র
বর্তমানে এই ক্ষেত্রটি একটি জাদুঘর। তিনটি প্রধান খননস্থল বা ভল্ট এবং একটি প্রদর্শনী হল নিয়ে এই জাদুঘর। প্রত্নতাত্ত্বিক হিসাব বলছে, মাটির নিচে প্রায় ৮ হাজার সৈনিক, শতাধিক রথ এবং কয়েক শ ঘোড়ার মূর্তি রয়েছে। ‘পিট ওয়ান’ হিসেবে পরিচিত প্রথম গর্তেই পাওয়া গেছে হাজারেরও বেশি মূর্তি, আর সেখানে প্রায় ছয় হাজার যোদ্ধা-ঘোড়া থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয় গর্তে জটিল রণকৌশলে সাজানো আছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মূর্তি।
পুরো প্রত্নকেন্দ্রটি এখন একটি জাদুঘর। ছবি : স্মার্ট হিস্ট্রি
আর তৃতীয় গর্তে পাওয়া গেছে ৬৮টি মূর্তি, সম্ভবত এটিই সেনা পরিচালনার কেন্দ্র ছিল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, প্রতিটি মূর্তির মুখাবয়ব, চুলের বাঁধন, উচ্চতা ও পোশাক–সবকিছুই আলাদা। কোনো একটি মূর্তি দেখতে হুবহু অন্যটির মতো নয়। ব্রোঞ্জের অস্ত্রশস্ত্রে খোদাই করা নামের মধ্যে সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী লু বুওয়েই-এর নামও রয়েছে।
শুধু কি যোদ্ধা?
না। সামরিক মূর্তির পাশাপাশি এই সমাধিক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে সরকারি কর্মকর্তা, কসরতবিদ (অ্যাক্রোব্যাট), বলবান পুরুষ ও বাদ্যযন্ত্র বাদকদের মূর্তিও। এসব থেকে বোঝা যায়, সম্রাট তার পরকালের রাজত্বে শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং পুরো একটি রাজদরবারের প্রতিরূপ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। আমরা মিশরীয় সভ্যতায়ও কিন্তু একই ধরনের চর্চা লক্ষ্য করি।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৮৭ সালে চিন শি হুয়াংয়ের সমাধিক্ষেত্রসহ টেরাকোটা আর্মিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যে হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এখন প্রতি বছর বিশ্বের লাখ লাখ পর্যটক এই জাদুঘর দেখতে আসে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকই এই স্থানকে ‘বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার মতো অনেকের মতে, এই প্রত্নস্থল না দেখলে চীন ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
খনন এখনো অব্যাহত
এই প্রত্নকেন্দ্রে গত ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে খননকাজ চলছে। গত কয়েক বছরে আরও প্রায় ২০০টি নতুন মূর্তি, ১২টি ঘোড়া ও দুটি রথ আবিষ্কৃত হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু ব্রোঞ্জের অস্ত্রও পাওয়া গেছে। খননকাজের সঙ্গে যুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক শেন মাওশেং জানিয়েছেন, নতুন পাওয়া মূর্তিগুলোর বেশির ভাগই বর্শা বা ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া রয়েছে। এই মূর্তিগুলো প্রাচীন চীনা সামরিক বাহিনীর যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মাটির নিচে এখনও হাজার হাজার মূর্তি লুকিয়ে আছে। মজার ব্যাপার হলো, সম্রাটের মূল যে সমাধিকক্ষ, তা কিন্তু আজ পর্যন্ত খনন করা হয়নি। কারণ, সেখানে উচ্চমাত্রায় পারদের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে, আর প্রাচীন লেখায় বলা হয়েছে, সমাধিকক্ষে যাতে সহজে ঢোকা না যায়, তার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ফাঁদ। তাই গবেষকরা সতর্কতা অবলম্বন করছেন। আজ হোক কাল হোক, সেখানেও খনন শুরু হবে।
এর গুরুত্ব
টেরাকোটা আর্মি শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়–এটি প্রাচীন চীনের শিল্পকলা, ধাতুবিদ্যা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামরিক সংগঠনের এক জলজ্যান্ত দলিল। চীনা রাজ্যগুলোর মধ্যে যুদ্ধ লেগে থাকত, সম্রাট চিন শি হুয়াংই রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে চীনকে এক মহান সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। তার শাসনামলে চীনা প্রযুক্তিরও বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি তার নিষ্ঠুরতার কাহিনিও ইতিহাসে লেখা আছে। এই যে টেরাকোটা আর্মি–এই বিশাল প্রকল্পে কাজ করতে গিয়েও বহু শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিল। সমাধির গোপনীয়তা রক্ষা করতেও অনেককে হত্যা করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখানে প্রতিটি নতুন খনন মানবজাতির সামনে তুলে ধরছে প্রাচীন চীনা সভ্যতার নতুন নতুন অধ্যায়। মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা এই সেনাবাহিনী এখনও তার সব রহস্য উন্মোচন করেনি। আমরা অপেক্ষায় আছি।
তথ্যসূত্র: হিস্টোরি ডট কম, ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি এনসাইক্লোপিডিয়া, চায়না হাইলাইটস