জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে গত ২৯ আগস্ট ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দেওয়ায় অটোরিকশা থেকে পড়ে মারা যান শিক্ষক রনজিলা পারভীন। পর দিনই ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তারের দাবি করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২ (বিলুপ্ত র্যাব)। এরই মধ্যে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার ১৭ দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের পর নতুন করে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসআরবির গ্রেপ্তার করা তিনজনের এ ঘটনায় সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে মো. শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের নিকট থেকে এরই মধ্যে নিহত রানজিলার ব্যবহার করা ব্যাগটি উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবির হাতে নতুন করে গ্রেপ্তার দুজন হলেন- মো. খোকন ও রাজীব মাতুব্বর। আর এসআরবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন হলেন- মোটরসাইকেল মালিক রাকিব, মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ও সেড্রিক জুলিয়ান।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, রনজিলা পারভীন হত্যা মামলায় মূল আসামি কারা?
নিজেদের দাবিতে অটল এসআরবি
এসআরবির হাতে গ্রেপ্তার আসামিদের যখন সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করা হয়, তখন পনি গাজী চিৎকার করে বলেন, “তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে।” তিনি নিজের মোটরসাইকেলের রঙের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “তার বাইক রূপালি ও কালো রঙের, কিন্তু ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করা বাইকের রং নীল।”
এ সময় এসআরবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আলোর তারতম্যের কারণে বাইকের রঙে পার্থক্য মনে হলেও তারা শতভাগ নিশ্চিত, জব্দ করা বাইক দিয়েই ছিনতাই করেছিলেন আসামিরা। শুধু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা নয় স্থানীয় সোর্স এবং প্রযুক্তিগত তথ্য অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েই তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলেও দাবি করা হয়। এসআরবির পক্ষ থেকে বলা হয়, পনি গাজির নামে আগে বিভিন্ন অপরাধে ১৩টি মামলাও রয়েছে।
এসআরবির জব্দ করা মোটরসাইকেলটি ইয়ামাহা আর ওয়ান ফাইভ। মোটরসাইকেলটির রং সিলভার এবং সামনে কালো বডি কিট রয়েছে। তবে ডিবির অভিযানে জব্দ হওয়া মোটরসাইকেলটি সুজুকি জিক্সসার এসএফ মডেলের নেভি ব্লু রঙের। যা সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে।
এই বিষয়ে এসআরবি-২-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তিনি বাইকটি নিহত শিক্ষকের স্বামীকে দেখিয়েছেন। তার স্বামী বলেছেন, “হুবহু এই বাইকটাই ছিল।” সেই সঙ্গে আলোর তারতম্যের কারণে সিসিটিভি ফুটেজে সিলভার কালারকে নীলচে মনে হয়েছে বলেও যুক্তি দেখান তিনি।
প্রথমে ছিল ‘আসামি’ এখন ‘সন্দেহভাজন’
ডিবির অভিযানে জব্দ হওয়া ভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেল, সেই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ব্যাগ, ফোনসহ নানা সরঞ্জাম স্পষ্ট ইঙ্গিত করে এসআরবির তদন্তের গরমিলকেই। এসআরবি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার নিফাস রহমান চরচাকে বলেন, “এই ঘটনাটি একটি তদন্তাধীন বিষয়। আমরা কেউ বলিনি, আমাদের অভিযানে গ্রেপ্তার তিনজনই নিশ্চিত অপরাধী। তারা যদি নিরপরাধ হয়, তাহলে তারা আইনি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বের হবেন।”
এসআরবি কর্মকর্তা নয়মুল হাসান চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা প্রথম দিন থেকেই বলেছি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সন্দেহভাজন হিসেবে ধরা হয়েছে। আমরা এটাও বলেছিলাম, তদন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করব, যে তারা জড়িত কি না। এখনো দায়িত্ব নিয়েই বলছি যে, আমরা সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছিলাম। আগে গ্রেপ্তার পনির সঙ্গে নতুন করে গ্রেপ্তার একজনের চেহারায়ও মিল আছে। এটা প্রমাণ করে যে আমরা কাছাকাছি গিয়েছিলাম। সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করায় তো নতুন অপরাধী ধরতেও সহায়ক হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে যা বলছে ডিবি
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার খোকন স্বীকার করেন তিনি নিজে বাইকের পেছনে বসে ব্যাগটি ছিনতাই করেছিলেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “খোকনের দেওয়া তথ্যে মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে শিক্ষক রনজিলার ব্যাগটি উদ্ধার করা হয়। ব্যাগে তার জামাকাপড়, টিকিটের অংশ বিশেষ, চশমার বাক্স ও ওষুধ ছিল।”
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, “ঘটনার সময় মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন রাজিব। তাকে সাভারের বিরুলিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনায় ব্যবহার করা মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়।”
ভুল গ্রেপ্তারের দায় নেবে কে?
এসআরবির অভিযানে গ্রেপ্তার তিনজনকে গণমাধ্যমের কাছে আসামি দেখিয়ে তাদের জেলে পাঠানো হয়। এখন তারা নিরপরাধ হলে আদালতের নিয়ম মেনে মিলবে জামিন, মামলার কার্যক্রম থেকে মুক্তি পেতেও লাগবে সময়।
গ্রেপ্তার তিনজনের পরিবারের প্রশ্ন, কার ভুলে মাশুল গুনছেন তারা, এর দায় কার?
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-কমিশনার মো. আকতার হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, “জামিনের বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের হাতে। আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছি তারা আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর ব্যাগ, মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছি। সুতরাং মামলায় তাদেরকে আসামি করে তদন্ত চলবে। আগে যাদের আটক করা হয়েছে তারা যে নির্দোষ, তা আদালতে উপস্থাপন করা হলে জামিন হয়ে যাবে।’’
ভুক্তভোগী তিনজনের যে সম্মানহানি হলো তা কীভাবে পূরণ হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘তাদের নামে তো আগেও মামলা রয়েছে, আবার কীসের মানসম্মান?’’ একজনের নামে মামলা থাকলেও বাকি দুজনের নামে কোনো মামলা নেই এমন তথ্য জানালে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি
এসআরবির হাতে গ্রেপ্তার মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব ব্যাপারির স্ত্রী সুমাইয়া চরচাকে বলেন, “তার স্বামী রাকিব ব্যাপারিসহ তিনজনকে আদালতে তোলা হলেও, জামিন শুনানি হয়নি।” নির্দোষ হয়েও কেন হয়রানি করা হচ্ছে- এমন প্রশ্ন তুলে সুমাইয়া বলেন, ‘‘এসআরবি যেহেতু কোনো কারণ ছাড়া তুলে নিয়ে গেছে, এসআরবি আবার বাসায় ফিরিয়ে দেবে না কেন? আমাদের যে আর্থিক ক্ষতি হলো, আমাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে।”
সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে উল্লেখ করে সুমাইয়া বলেন, “ছিনতাইকারী হিসেবে আমার স্বামীর নাম আসলো, সমাজে আমরা হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি। নির্দোষ প্রমাণের পর এসআরবি কি এই বিষয়ে আবারও কোনো সংবাদ সম্মেলন করবে? মানসিকভাবে, আর্থিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমরা এই বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেব।”
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
দুর্বল তদন্তে নিরপরাধ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে এসআরবি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে- এমনটা মনে করেন মাওলানা ভাষানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি চরচাকে বলেন, “একজন ব্যক্তি যদি স্বীকারও করে সে অপরাধ করছে তখনও তাকে অপরাধী বলা যাবে না, যদি না আদালতে প্রমাণ হয়। তাকে বলতে হবে সন্দেহভাজন। কিন্তু আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই বিষয়টা মানেই না। তারা তাদের মিডিয়া উইং থেকে নামসহ ছবি প্রচার করে। এমন চর্চা এক ধরনের আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনও। কিন্তু এত অপরাধ হচ্ছে, তা নিয়ে জনগণকে নির্বৃত করতে এই প্র্যাকটিস তারা করে।’’
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন চরচাকে বলেন, “অপরাধীদের আটক করে বাহবা পাওয়ার যে মানসিকতা বাহিনীগুলোর আছে, তারই ধারাবাহিকতায় কাজটি করেছে এসআরবি। এর ফলে ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন হয়েছে। যার দায় সরকার এবং বাহিনীকে নিতে হবে।”
এদিকে, সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা আইনের পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ মনোয়ার। তিনি চরচাকে বলেন, “কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগের ১০টি মামলা থাকলেও, নতুন একটি মামলায় তাকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া জড়ানো যাবে না। প্রতিটি মামলার বিচার ও তদন্ত সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কাউকে প্রমাণ ছাড়া কোনো মামলায় জড়িয়ে দেয় এবং পরে যদি প্রমাণিত হয় যে সে নির্দোষ ছিল, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হয়রানি এবং বিদ্বেষমূলক মামলার কারণে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন। আইনানুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।”