ইসলামের পবিত্র শহর মক্কার কাছে নাকি হুতিরা একটি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এটা সৌদি আরবের দাবি। এ নিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও শুরু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টা এখন আর শুধু সৌদি আরব আর হুতিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়–থাকার কথাও ছিল কি? এ নিয়ে ইরান কথা বলেছে, ‘মক্কা প্রতিরোধ চুক্তি’তে সৌদি আরবের দুই সঙ্গী তুরস্ক আর পাকিস্তানও কথা বলেছে। এমনকি চীনও এ নিয়ে ইরানকে সতর্ক করছে!
এসবের মধ্যে সৌদি আরব আর হুতিদের নিয়ে বিতর্কটা সম্ভবত আরও জমজমাট–দুই পক্ষের মধ্যে কারা আসলে মুসলিম বিশ্বকে নিজেদের দিকে বেশি টানতে পারবে?
মূল ঘটনাটা আগে বলা যাক। সৌদি আরব দাবি করেছে, গত মঙ্গলবার ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের দিক থেকে পাঠানো একটি ড্রোন মক্কার দক্ষিণে শনাক্ত করেছে তারা, সেটিকে ধ্বংসও করেছে। ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ১১ বছর ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন যে ৯ দেশীয় জোটটি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, সেই জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ড্রোনটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে। মক্কা এবং মদিনা–ইসলামের দুই পবিত্র স্থানের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণের চেষ্টা মানে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করা বলেও হুঁশিয়ার করে দেন আল-মালিকি।
হুতিরা অবশ্য এমন কোনো হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দিক থেকে মক্কা বা কোনো ধর্মীয় স্থাপনার ওপর কোনো হুমকি নেই বলেও জানিয়ে দিয়েছে। হুতিদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি বলেছেন, ‘সৌদি আরব তাদের প্রপাগান্ডা মেশিন কাজে লাগানো শুরু করে দিয়েছে। মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ একটা জঘন্য মিথ্যা কথা।’
হুতিদের দিক থেকে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ সৌদি আরব যে সময় ও পরিস্থিতিতে করছে, সেই সময়টা এই আলোচনায় বাড়তি আকর্ষণ জাগাতে পারে। ইরানে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ার পর সৌদি আরব মূলত ইয়েমেন ঘেঁষে যাওয়া বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে কাজে লাগিয়ে তেল রপ্তানি করে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান আক্রমণের জেরে সৌদি-হুতি সংঘর্ষ আবার জোরাল হয়, এর জেরে সম্প্রতি বাব আল-মান্দেবের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে হুতিরা। বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচল করতে দিচ্ছে না তারা।
এরপরই হুতিরা পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি এসেছে সৌদি আরবের দিক থেকে। তবে হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি এ ক্ষেত্রে ভয়াবহ একটি অভিযোগ তুলেছেন। তার বক্তব্য, মক্কা, কাবা ও মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোকে ‘যুদ্ধের ব্যানার’ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে সৌদি আরব। উদ্দেশ্য কী? আবদুল মালিক আল-হুতির ভাষায়, এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর আবেগকে নিজেদের সমর্থনে ও হুতিদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চাইছে রিয়াদ।
আবদুল মালিক আল-হুতি বরং চলমান সংঘাতটা সৌদি আরবের কারণেই হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। ২০১৫ সালের হুতিদের ধ্বংস করতে ইয়েমেন ঢুকে যে সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন ৯ দেশের জোট, সেটাকেই এখনকার সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন আবদুল মালিক। এর পাশাপাশি গত জুলাইয়ে ইয়েমেনের সানায় সৌদি আরবের বিমান হামলাকেও কারণ হিসেবে দেখিয়েছে হুতিরা। সৌদি আরবের বিমান হামলাগুলোর পেছনে সে দেশে থাকা মার্কিন সৈন্যদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন হুতি নেতা আবদুল মালিক।
তবে সৌদি আরব আর হুতিদের এই ঝামেলা শুধু আর এই দুই পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখানে ইরান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান আর তুরস্কও জড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করল ইরান
মক্কাকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার যে অভিযোগ করেছে সৌদি আরব, সেটিকে সমর্থন করছে না ইরানও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে যেকোনো আক্রমণই নিন্দনীয়, তবে একটা ড্রোন ‘মক্কার দিকে যাচ্ছিল’ বলে নিজেরাই দাবি করা এবং শুধু এই দাবির প্রেক্ষিতেই হুতিদের দায়ী করা যায় না।
ইসলামের পবিত্র জায়গাগুলোকে যুদ্ধের হাতিয়ার বানানোও ঠিক হবে না বলে সতর্ক করে দেন বাঘাই। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো, বাঘাই সরাসরি এটাও বলে দিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে অনেক ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ (নিজেরাই হামলা করে সেটার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া) অভিযান চালিয়ে মানুষের মন ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
মুসলিম বিশ্ব, তুমি কার?
মক্কার দিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ছোঁড়ার ঘটনাটি শুধুই একটি ড্রোন হামলার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। এটি হয়ে উঠেছে মুসলিম বিশ্বকে কারও সমর্থনে টানা বা কারও বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার অস্ত্র।
দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এলমাসরি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় বলেছেন, সৌদি আরব ঘটনাটিকে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর একটির ওপর হামলা হিসেবে দেখিয়ে মুসলিম দেশগুলোর সরকার ও সামরিক শক্তিগুলোর সমর্থন আদায় করে নিতে চাইছে। অন্যদিকে হুতিরা চেষ্টা করছে নিজেদেরকে ইয়েমেনের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে দেখানোর। পাশাপাশি সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও করছে তারা।
পাশাপাশি এই ড্রোন হামলা ‘মুসলিম দেশগুলোর ন্যাটো’ হিসেবে খ্যাত মক্কা চুক্তিতে সৌদি আরবের দুই সঙ্গী পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা নিয়েও চাপ বাড়াচ্ছে।
মক্কা চুক্তির বাকি দুই পক্ষ কী বলছে
গত মাসেই সই হওয়া মক্কা চুক্তিতে সৌদি আরবের দুই সঙ্গী পাকিস্তান ও তুরস্কও এই হামলা ও অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছে। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের কথার সুর সৌদি আরবের সঙ্গেই মিলবে। তুরস্ক হুতিদের ড্রোন হামলার নিন্দা করেছে, পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবে হুতিদের চলমান কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের এই হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে যখন মক্কা চুক্তির আসলে কার্যকারিতা কী–এই প্রশ্ন উঠেছে, সেই মুহূর্তে এই চুক্তি নিয়েই কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তার কথা, হুতিদের হামলা মক্কা চুক্তিকে বাস্তবায়নের পরিস্থিতিতে নিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব ও দেশটির পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার ব্যাপারে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে খাজা আসিফ বলেছেন, এমনকি চুক্তি না থাকলেও এগুলো রক্ষা করা পাকিস্তানের দায়িত্ব।
গত ৯ সেপ্টেম্বরও খাজা আসিফ বলেছিলেন, ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা চুক্তিটি কার্যকর হতে পারে।
প্রসঙ্গত, মক্কা চুক্তির বাইরেও পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তান- দুই পক্ষই অবশ্য গত কয়েকদিনে ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়েছে।
চীন এখানে কেন কথা বলছে, কী বলছে
ইরান যুদ্ধে চীন ও রাশিয়া গোপনে গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে ইরানকে সহযোগিতা করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বারবার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বের অর্থনীতিতে মোড়ল হওয়ার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীতা, সাম্প্রতিক যুদ্ধে দেশটির ভূমিকা মিলিয়ে চীনের কথা এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এরই মধ্যে হুতিদের ঠেকাতে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে সৌদি আরব। চীনের কাছে কেন? হুতিরা ইরানি সহযোগিতায় চলে বলে অভিযোগ আছে, আর ইরানকে চীন সহযোগিতা করার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে তিনটি ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানের সঙ্গে যাতে চীন কথা বলে, সে ব্যাপারে চীনকে অনুরোধ করেছে সৌদি আরব। অন্যদিকে, চীন আবার তাদের আমদানির জন্য–বিশেষ করে জ্বালানির জন্য–হরমুজ আর বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
চীন কূটনৈতিক বক্তব্যে সব পক্ষকে সংযম দেখানোর, বাণিজ্য রুটগুলোতে জাহাজ নিরাপদে চলতে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ইরানের সঙ্গে আলাপে হুতিদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে চীন আরও সরাসরি বার্তাই দিয়েছে। ইরান জবাবে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে হলে ইসরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে তাদেরই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধগুলো বন্ধ করতে হবে।