কয়েক মাস ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের প্রচার চালিয়ে আসছিল। রিয়াদের ইয়েমেনি সহযোগীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তাদের হাতে বড় ধরনের ‘চমক’ তুলে রাখা আছে। প্রোপাগান্ডাকারীরা জোরেশোরে দাবি করছিল, খুব শিগগিরই তারা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হোদাইদাহ এবং সম্ভবত রাজধানী সানা মুক্ত করতে যাচ্ছে।
তবে আসল লড়াই শুরু হওয়ার পর চমকটা দিয়েছে হুতিরাই। ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক দিনে তাদের বাহিনী দ্রুত ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে অগ্রসর হয়েছে। এরইমধ্যে তারা সমুদ্রবন্দর নগরী মোখা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত পাথুরে দ্বীপ পেরিম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
একই সময় সৌদি আরবের একটি প্রধান তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালানো হয়। প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রিয়াদের এই পাইপলাইন দিয়ে পরিবাহিত হতো। পরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিস্তারিত তথ্য এখনো অস্পষ্ট হলেও, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার জন্য ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে।
এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সম্ভবত আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। এই নতুন আক্রমণ শুরুর আগেই হুতিদের হুমকির মুখে অনেক জাহাজ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এড়িয়ে চলছিল। ডেটা ফার্ম কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে এই প্রণালি দিয়ে সৌদি আরব দিনে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করলেও আগস্টে তা নেমে এসেছে মাত্র দুই লাখ ব্যারেলে। সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল জায়ান্ট সৌদি আরামকো ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি হয়তো দ্রুতই মেরামত করতে পারবে। কারণ গত এপ্রিলে একটি ইরানি ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পিং স্টেশনটি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সচল করা হয়েছিল। তবে এই ধরনের নতুন হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
হুতিদের লক্ষ্য ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে লোহিত সাগর ব্যবহার করতে না দেওয়া। ছবি: রয়টার্স
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের এই দ্রুত বিস্তার শুধু সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের অপমানই নয়, বরং আমেরিকার চলমান সংঘাতে ইরানকে নতুন কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। কারণ তাদের মিত্ররা আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিজেদের দখল শক্ত করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারে পৌঁছায়। সৌদি আরব উপকূলীয় অঞ্চলে হুতিদের এই নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে চাইবে না, তবে তাদের পিছু হটানো অত্যন্ত কঠিন হবে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই সময় হুতিরা উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে এসে প্রধান শহরগুলো দখল করে নেয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। তবে এই লড়াই দ্রুতই অচলাবস্থায় রূপ নেয় এবং ২০২২ সালের অস্ত্রবিরতির পর থেকে সামনের যুদ্ধাঞ্চলগুলো অনেকটাই শান্ত ছিল। তবে ইরানের ওপর আমেরিকার সাম্প্রতিক হামলা সেই স্থিতাবস্থা ভেঙে দেয়।
ইরান গত কয়েক মাস ধরেই হুতিদের এই যুদ্ধে যোগ দিতে চাপ দিয়ে আসছিল। জুলাই মাসে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো সানার বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালায়, যাতে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সামরিক উপদেষ্টাদের বহনকারী একটি ইরানি বিমান সেখানে অবতরণ করতে না পারে। এর কয়েক দিন পর হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে। এছাড়া, তারা সৌদি শহরগুলোতে আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, যা গত কয়েক বছর ধরে স্থগিত ছিল। ফলে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়া প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং এটি স্পষ্ট ছিল যে হুতিরা উপকূলীয় অঞ্চল দখলের চেষ্টা করবে। অথচ লড়াই শুরু হলে সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের একেবারেই অপ্রস্তুত মনে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিবিরোধী জোটটি বেশ বিশৃঙ্খল। এতে রয়েছে কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী, দক্ষিণ ইয়েমেনকে স্বাধীন করার দাবিতে সোচ্চার বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং বিভিন্ন উপজাতীয় মিলিশিয়া। এদের কেউ সৌদি আরবের অনুগত, কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই)। এতদিন আরব আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকেই বেশি কার্যকর মনে করা হতো। গত ডিসেম্বরে আরব আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইয়েমেনে কিছু অঞ্চল দখল করে নতুন রাষ্ট্র ঘোষণার সুর তুলে। এরপর সৌদি আরব বাধ্য হয়ে আমিরাতকে ইয়েমেন থেকে সরে যেতে চাপ দেয়।
এর ফলে বিরোধী শিবিরের মধ্যে গভীর বিভেদ তৈরি হয়। হুতিরা যখন অগ্রসর হতে শুরু করে, তাদের প্রতিপক্ষদের অনেকেই রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। গত কয়েক দিন ধরে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে ব্যস্ত। এমনকি পলায়নরত যোদ্ধারা রাস্তার পাশে তাদের অস্ত্র বিক্রি করে দিয়েছে। রিয়াদের প্রোপাগান্ডাকারীরা অবশ্য জোর দিয়ে দাবি করার চেষ্টা করছে যে, এটি হুতি যোদ্ধাদের একটি ‘কিল বক্স’ বা ফাঁদে ফেলার চতুর কৌশল, যাতে সৌদি যুদ্ধবিমান ওপর থেকে সহজে বোমা ফেলতে পারে। তবে ইয়েমেনি সূত্রের অভিযোগ, সৌদি আরব বিমান সহায়তা পাঠাতে বেশ দেরি করেছে।
সৌদি আরবের তুলনামূলক বাস্তববাদী বিশ্লেষকরা এখন যুক্তি দিচ্ছেন যে, এই সংকট কাটাতে তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন।
রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ধারাভাষ্যকার আলী শিহাবি বলেন, “মূল প্রশ্ন হলো- বাইরের বড় শক্তিগুলো কি আর দীর্ঘ সময় নিছক দর্শক হয়ে থাকার বিলাসিতা দেখাতে পারবে?” কিন্তু সমস্যা হলো, সেই সাহায্য আসবে কোথা থেকে? গত মাসে বড় ধরনের জাঁকজমক করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘোষিত ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি তথাকথিত ‘মক্কা জোটের’ প্রথম পরীক্ষা এটি। তবে এখন পর্যন্ত রিয়াদের এই নতুন মিত্ররা শুভকামনা ছাড়া আর কিছুই পাঠায়নি।”
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সৌদিদের সাহায্য করতে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত আকুল আবেদন সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে নিজস্ব বিমান হামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত শনিবার বলেছেন, “হুতিরা আমাদের ফোন করেছিল, তারা এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করেন, তাহলেও মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বর্তমানে অত্যন্ত সংকুচিত। ইয়েমেনে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতে গেলে হরমুজ প্রণালির কাছে মোতায়েন থাকা দুটি বিমানবাহী রণতরী বহরের একটিকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতে হবে। আর সেটি করা হলে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আমেরিকান অবরোধ এবং সাম্প্রতিক সময়ে জলপথে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
ইয়েমেনের এই গৃহযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বেশ পরিবর্তনশীল। হুতিরা অতীতেও বহুবার বড় ধরনের সফলতা পাওয়ার পর নিজেদের সীমার বাইরে ছড়িয়ে গিয়ে বিপাকে পড়েছে। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে তায়েজ। এটি যুদ্ধকালীন দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকা একটি পাহাড়ি শহর এবং ইয়েমেনের তেল-গ্যাস শিল্পের কেন্দ্রস্থল মারিব। তবে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তাদের পিছু হটানো সম্ভব নয়। সৌদি আরব সত্যিই কোনো জোরালো পাল্টা আক্রমণ গড়ে তুলতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।