হামে আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতার জন্য অপুষ্টি দায়ী বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ওই গবেষণা আরও বলছে, হামে আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশু রোগটির টিকা পায়নি।
চট্টগ্রামে হওয়া ওই গবেষণায় হাম থেকে উত্তরণে বছরব্যাপী টিকাদান চালু রাখা এবং হাম আক্রান্তদের আইসোলেশন কঠোরভাবে অনুসরণের সুপারিশও করা হয়।
চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২০০ শিশুর ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে তাদের মধ্যে ১৬৭ জনই টিকা পায়নি, তবে এদের মধ্যে ৯১জন শিশু তখন নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলন কক্ষে ওই গবেষণার প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া ২০০ শিশু এবং আক্রান্ত শিশুদের ১০০ জন মায়ের তথ্য নিয়ে এ গবেষণা করা হয়। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন গবেষণাটি পরিচালনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ জন হাম আক্রান্তের নমুনা জেনোম সিকোয়েন্সিং করে প্রত্যেকের নমুনাতে বি-থ্রি জেনোটাইপ শনাক্ত করেছে গবেষক দল। হামের এই ধরনটি টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। পাশাপাশি হামে আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতার নেপথ্যে অপুষ্টিই প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গবেষণায়। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।
সংক্রমিণের শিকার ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত হয়েছে। যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দেখায়।
এছাড়াও চট্টগ্রামে হামের রোগীদের চিকিৎসায় ডেডিকেটেড একটি হাসপাতাল চালুর প্রস্তাব দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে করে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানো অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এসপেরিয়ার গবেষণায় বলা হয়েছে, এতে অংশ নেওয়া ২০০ শিশুর মধ্যে ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ তারা নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছিল।
গবেষণার প্রধান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘‘প্রাদুর্ভাবের বড় একটি অংশ গ্রামীণ এলাকার সাথে সম্পর্কিত। যা প্রমাণ করে যে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই রোগের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’’
আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর হামজনিত জটিলতা ও হামের তীব্রতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিহীনতা বড় একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। এছাড়া ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হয়নি, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিটামিন এ হামের মারাত্মক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। কিন্তু আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৬৩ জন (৩২ শতাংশ) শিশু গত ছয় মাসে ভিটামিন এ ক্যাপসুল পেয়েছে, যা একটি বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।
কামরুন নাহার বলেন, ‘‘যেসব শিশু ভিটামিন এ পায়নি, তাদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ শিশুর মারাত্মক ও তীব্র জটিলতা দেখা দিয়েছে। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো হামের তীব্রতা কমাতে পুরোপুরি সক্ষম নয়, এর সাথে অন্যান্য চিকিৎসা ও পুষ্টি অপরিহার্য।’’
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০ জন হাম আক্রান্তের মধ্যে ১৬৭ জন শিশু টিকাবিহীন ছিল। তবে এদের মধ্যে ৯১ জন তখনও নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি। এর মধ্যে ১১ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ৬ মাসের কম এবং ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু ১ থেকে ৫ বছর বয়সী। আর ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে।
হামের টিকা না নেওয়াদের মধ্যে ৫২ শতাংশ অসচেতনতা বা তারিখ ভুলে যাওয়ার কারণে, ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকার কারণে, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতার কারণে এবং ৪ শতাংশ টিকার ভয় ও বাকি ৪ শতাংশ কার্ড হারিয়ে ফেলার কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, ‘‘শনাক্ত হওয়ার আগে নানা উপসর্গ নিয়ে জেনারেল ওয়ার্ডেও হামের রোগী থাকছে। তাদের সংস্পর্শে সাধারণ রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ হচ্ছে। অন্য রোগের রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আবার হাম নিয়ে হাসপাতালে আসছে। হামের জন্য পৃথক হাসপাতাল করা গেলে সংক্রমণ কমবে। চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে।’’
এই গবেষণায় ১৭ জনের নমুনা জেনোম সিকোয়েন্সিং করে প্রত্যেকের নমুনাতে বি-থ্রি জেনোটাইপ শনাক্ত করেছে গবেষক দল। হামের এই ধরনটি টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বি-থ্রি জেনোটাইপের উপস্থিতি বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে পূর্বে রিপোর্ট করা বি-থ্রি সার্কুলেমনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘‘বি-থ্রি জেনোটাইপ আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআর’বি এর পরীক্ষাতেও শনাক্ত হয়েছে। তে প্রমাণ হয় এবার হামের সংক্রমণ হয়েছে সার্বিক টিকাদান কমে যাওয়ায়। ৯৫ শতাংশ ভ্যাকসিনেশন করতে পারলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’’
গবেষক দল হাম নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে তার মধ্যে আছে, নিয়মিত হামের টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনার মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিতে বাড়ি বাড়ি যাওয়া, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট ও শিশুদের পুষ্টিমান উন্নত করা, টিকাদানের বয়সের কম বয়সি শিশুদের জন্য দ্রুত শনাক্তকরণ ও আইসোলেশন, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন সুবিধা ও পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা করা।
গবেষণা ফলাফল অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং আগের কয়েক বছরের ব্যর্থতার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাকসিনেশন ও আইসোলেশন দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও এত রোগী কেন। যেহেতু হাম উচ্চ সংক্রমণশীল, তাই মূল কাজ এখন আইসোলেশন। শিশুর মায়েদের পুষ্টিও নিশ্চিত করতে হবে।”