তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় গত সাত দিনে অন্তত ৩৮৬টি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। এতে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে ১১৩টি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র হয়েছে। বিডব্লিউডিবির রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, “সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।
পাঁচ জেলার ১১৩টি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র হয়েছে। গত সাত দিনে ৩৮৬টি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে।”
এই প্রকৌশলী বলেন, “ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বরাদ্দ কম রয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হয়েছে।”
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কাপাসিয়া ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনে মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সিঙ্গিজানি ও ভোরের পাখি এলাকায় বাসিন্দারা জানান, হঠাৎ নদীর স্রোত বেড়ে যাওয়ায় নদীতীরের বিভিন্ন অংশ একের পর এক ভেঙে পড়েছে।
নদী ভাঙনে অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ধসে পড়ার সময় আসবাবপত্র, চাল, কাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র রক্ষা করতে পারেনি। ছবি: ইউএনবি
অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ধসে পড়ার সময় আসবাবপত্র, চাল, কাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র রক্ষা করতে পারেনি। এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘ভাঙন এত দ্রুত হয়েছে যে মানুষ তাদের জিনিসপত্র নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময়ও খুব কম পেয়েছে।’’
আহাদ মিয়া বলেন, ‘‘ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে পরিবারগুলো এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে।’’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি। পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
কুড়িগ্রামের উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলায়ও ভাঙন তীব্র হয়েছে। গত এক সপ্তাহে সেখানে প্রায় ৮০টি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলো নিজেদের, সন্তান ও গবাদিপশুর জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েছে। লালমনিরহাটে পাঁচটি উপজেলাতেই ভাঙন দেখা দিয়েছে।
বিডব্লিউডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় বলেন, ‘‘নদীর পানির উচ্চতা ওঠানামার সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও-টেক্সটাইল উপকরণ স্থাপন করা হয়েছে। তবে স্থায়ী ভাঙনরোধের কাজের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।’’
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “স্থায়ী ভাঙনরোধের কাজের জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আমাদের তেমন কিছু করার নেই।”
খুলিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাদল বলেন,‘‘ প্রায় প্রতিদিনই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।’’
নীলফামারীতে ভাঙনকবলিত শত শত পরিবার খোলা জায়গা, বাঁধের ওপর বা স্বজনদের বাড়ির উঠানে দিন কাটাচ্ছে। অনেক পরিবারের রান্না ও খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, তাঁবু ও শুকনো খাবার জরুরি প্রয়োজন।
চর খড়িবাড়ির আবদুল করিম বলেন, ‘‘দুই বছরে নদীটি ওই এলাকায় ছয়বার ভাঙন সৃষ্টি করেছে। নদীতে আমার দুটি ঘর বিলীন হয়েছে। এখন আমি জানি না কোথায় যাব।”
আতওয়ার রহমান বলেন, নদীতীরের মানুষকে সুরক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রায়ই ঘরবাড়ি ভাঙতে শুরু করার পর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়।
বিডব্লিউডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিন বলেন, রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলায় গত সাত দিনে ৫৩টি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে।
ভাঙনকবলিত মানুষজন জানান, তারা সাময়িক ত্রাণের পরিবর্তে স্থায়ী সুরক্ষা চান।