ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও স্বাধীনতাবিরোধী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি অন্তর্ভুক্ত করা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরানোর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক এই সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি যুক্ত করাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ সভা, ছবি ছিঁড়ে ফেলা, বিকল্প প্রতিবাদী আলোকচিত্র স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তিনটি তদন্ত কমিটি গঠনের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই ঘটল এসব এসব ঘটনা।
ডাকসুর মেয়াদ শেষ হয়েছে গত রোববার। তবে গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী আরও তিন মাস রুটিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের পর গঠিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ।
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি বিতর্ক ও নেপথ্যের সিদ্ধান্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার সূতিকাগার বিবেচনা করা হয়। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ও পরবর্তীতে কার্জন হলে গিয়ে যিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় স্থাপন করাকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজ ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করছেন।
ডাকসু ভবনের নিচতলায় অবস্থিত এই সংগ্রহশালাটি সম্প্রতি সংস্কারের পর গত রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়। এই সংস্কার কাজের মূল সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। উদ্বোধনের সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই সংগ্রহশালা পুনর্বিন্যাসের সার্বিক তদারকি করেন।
ছবির ক্যাপশন, ফরহাদের দাবি ও ইতিহাসের চিত্র
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর মোট তিনটি ছবি রাখা হয়েছিল। প্রথম ছবিটি ছিল, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তার বক্তব্যকাল সময়ের, যার নিচে ক্যাপশনে লেখা ছিল “কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”। দ্বিতীয়টি ছিল, ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি, যেখানে লাহোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। তৃতীয়টি ছিল, ১৯৭০ সালের নির্বাচন সংক্রান্ত পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং, যেখানে জিন্নাহর ছবি ছাপা হয়েছিল।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করার জন্য নয়, বরং ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তার বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান তুলে ধরতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে ও সমালোচকদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংগ্রহশালায় ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফরহাদের যুক্তি ধোপে টিকছে না।
অনেকেই বলছেন, যদি ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরাই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান কিংবা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোকচিত্রগুলো সরানো হতো না। সেখানে বঙ্গবন্ধুর কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি রাখা হয়নি। ১৯৭৪ সালে তার দুই ছেলের বিয়ের ছবি, ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই’ শীর্ষক পেপার কাটিং এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের দুটি ছবি রেখে তার রাজনৈতিক জীবনকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া, ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কোনো চিত্র সেখানে রাখা হয়নি। ফলে ডাকসু সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের ইতিহাস উঠে আসেনি বলেই মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও বিভিন্ন পক্ষের প্রতিক্রিয়া
জিন্নাহর ছবি সাঁটানোর বিষয়টি জানাজানি হতেই ক্যাম্পাসে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাবেক ভিপি প্রার্থী ও উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবির ফ্রেম ভেঙে তা ছিঁড়ে ফেলেন। ঘটনার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “যে জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যে জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করেছিল, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না। এই ডাকসুতে জিন্নাহর মতো কোনো ভিলেন আমাদের নায়ক হতে পারে না, হতে দেব না।”
এর পর পরই বিকেল ৩টার দিকে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে জিন্নাহর ছবির স্থানে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি সাঁটিয়ে দেন। অর্ক বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, “ডাকসু কারও বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না। গোলাম আযমরা একাত্তরে যা করেছে, তার ফলে আশিতে মানুষ তাকে জুতাপেটা করেছে। আমাদের ইচ্ছা হয়েছে, তাই আমরা আপামর মানুষের সেই ইতিহাস এখানে সংরক্ষণ করেছি।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, “বিতর্কিত ডাকসু একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো আমরা মেনে নেব না।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে অননুমোদিত সংস্কার ও ইতিহাস বিকৃতির ‘নিকৃষ্ট অপচেষ্টা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা অননুমোদিত পরিবর্তনগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি এবং অপসারিত সকল ঐতিহাসিক স্মারক পূর্বের স্থানে সসম্মানে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীও এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান ও তদন্ত কমিটি
ঘটনার তীব্রতার মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ডাকসু কর্তৃক ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ‘শিক্ষক মূল্যায়ন’ সংক্রান্ত পৃথক ওয়েবসাইট চালু করার বিষয়ে আপত্তি জানায় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ‘দ্বৈত প্রশাসন’ চালুর সুযোগ নেই এবং ডাকসুর সকল কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধীন পরিচালিত হতে হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর অনুচ্ছেদ ২৪(এ) অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ও বিধিমালার চতুর্দশ অধ্যায়ের ৪ নম্বর ধারার নোট অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে গ্রহণ করবে। কিন্তু ডাকসু ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবন সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে, তা সিন্ডিকেট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনোরূপ অনুমতি বা আলোচনা করে স্থাপন করেনি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এখতিয়ারবহির্ভূত।
সার্বিক ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
কী বলছেন ডাকসু নেতারা
ডাকসুর দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা তাদের নেওয়া পদক্ষেপের ব্যাপারে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।
সংগ্রহশালার সংস্কার কাজের দায়িত্বে থাকা ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে একটি সংবাদমাধ্যমে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই এখানে রাখা হয়নি। আর ৭২ থেকে ৭৫ সালের অংশে তো তার ছবি আছে।” তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতার মূল লড়াইয়ের অংশে বঙ্গবন্ধুর ছবি কেন রাখা হয়নি-এমন প্রশ্নের জবাবে জুমা সরাসরি বলেন, “ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।”
এ বিষয়ে কথা বলতে জুমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
জিন্নাহর ছবি রাখা প্রসঙ্গে জুমা দাবি করেন, “আমি জিন্নাহর ছবি রাখিনি, সেই ইভেন্টের ছবি রেখেছি।” পরবর্তীতে আবু তৈয়ব হাবিলদার ছবি ছিঁড়ে ফেলার পর তিনি ফেসবুকে লেখেন, “যে ছবিটা ভাঙা হয়েছে তা একক জিন্নাহর ছবি নয়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের একটি পেপার কাটিং।”
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, “জিন্নাহর ছবি রাখার পাশাপাশি ছবির নিচে তার বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছিল। জিন্নাহর ছবি না দিলে বলা হতো তার বাংলা ভাষার বিরোধী অবস্থান আমরা লুকিয়েছি। যিনি ছবিটি ছিঁড়েছেন, তিনি উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী। এ কারণে তিনি জিন্নাহর প্রতি আলাদা দরদ থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন।”