র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন এলিট ফোর্স স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা চলছিল। তার মধ্যেই গত ১০ সেপ্টেম্বর ওই বিল সংসদে পাস হয়। যার মাধ্যমে র্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি গঠন হয়।
সংসদে আইন পাসের আগে-পরে রাজনৈতিক, মানবাধিকার সংগঠনসহ নানা মহল থেকে বলা হচ্ছে, র্যাব বিলুপ্তি কথা বলা হলেও বাস্তবে নাম বদল ছাড়া ‘আর কিছু হয়নি’। কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া এ ধরনের বদলে ‘উদ্বেগ’ জানিয়েছেন কেউ কেউ। নতুন বাহিনীকে আরও দায়বদ্ধ করতে আইনি কাঠামোর কথাও বলছেন অনেকে।
পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমকে গতিশীল ও কার্যকর করতে ২০০১-০৬ মেয়াদে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার একটি এলিট ফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করে। পরে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস প্যারেডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এলিট ফোর্সটি। একই বছরের ২১ জুন থেকে র্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৩ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন সংশোধন করে র্যাব গঠন করা হয়।
পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সফলতার পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বাহিনীটিকে বিলুপ্তির দাবি ওঠে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব ও বাহিনীর সাত কর্মকর্তার উপর যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র্যাব নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিশনের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গুমের ১৭২টি অভিযোগ জমা পড়ে, যা ছিল যেকোনো বাহিনীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার বিষয়ক কমিটি র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানায়। তবে ক্ষমতায় এসে বিএনপি বাহিনীটিকে বিলুপ্ত না করে কাঠামোগত ও কর্মপরিধি পুনর্বিন্যস্ত করে এসআরবি নামে মাঠে রাখতে আইন পাস করল।
নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি জনসাধারণের অভিযোগ এবং এসআরবি সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ে একটি অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করা হবে বলে আইনে বলা হয়েছে।
তবে এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। চরচাকে তিনি বলেন, “এসআরবির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিষ্পত্তির জন্য ডিজির নেতৃত্বে কমিটিতে তাদের অথবা সরকারের পছন্দমাফিক মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক এদেরকে যুক্ত করতে পারেন। তবে কমিটি স্বাধীনভাবে হবে-তা মনে করা কোনো কারণ নাই। যেহেতু পছন্দমাফিক বলে দেওয়া আছে তাহলে তা সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকছে না।”
র্যাবের জনবল, সম্পদ, নথিপত্র, স্থাপনা, তহবিল ও দায়দায়িত্ব নতুন ইউনিটে হস্তান্তরের বিধান আইনে থাকায় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করেন, কার্যত একই বাহিনীকে নতুন নামে রাখা হচ্ছে।
পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, এসআরবি পুলিশ বাহিনীর অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। নিয়োগ বা প্রেষণের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং নির্ধারিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য বা কর্মচারীদের নিয়ে এ ইউনিট গঠিত হবে। ইউনিটটির নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও পোশাক থাকবে। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বা তার ওপরের পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে মহাপরিচালক (ডিজি) করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ফাহিন রহমান অঙ্কিতা বলেন, “আগে বিভিন্ন বাহিনী সদস্যদের এনে র্যাব গঠন করা হতো। নতুন বাহিনীতে এই কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়নি সেটা উদ্বেগজনক।”
এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হবে। এছাড়া ইউনিটটির নিজস্ব হাজত, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র থাকবে। তবে নাম ছাড়া আরেকটি পরিবর্তন হলো, জনসাধারণের অভিযোগ এবং এসআরবি সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ে একটি অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করা হবে।
এসআরবি এর বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, এ আইনের মধ্য দিয়ে র্যাবকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। র্যাবের সঙ্গে এটার ‘কোনো সংস্পর্শ নেই’ বলে দবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
র্যাবের সম্পদ এসআরবিতে হস্তান্তরের কারণ ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এত অস্ত্রশস্ত্র, এত ইকুইপমেন্ট, এত ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট, এত সম্পদ, এগুলো কোথায় যাবে? কোথাও না কোথাও তো যাবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ হয় এপিবিএনে যেত। নতুন বাহিনীর কাছে গেলে আর এসব কেনাকাটার প্রয়োজন হবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে হবে।”
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে নাম পরিবর্তন করে কোনো লাভ হবে না।
চরচাকে তিনি বলেন, “সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে এর দায়বদ্ধতা অনেক বাড়াতে হবে। প্রতিটি কাজের তদারকি থাকতে হবে। বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তা ওই বাহিনীর লোক দিয়ে তদন্ত করলে কখনো সত্য বের হবে না। তাই অভিযোগ তদন্ত করতে আইনজীবী, সচেতন সমাজের ব্যক্তি, মানবাধিকার কর্মীদের যুক্ত করার আইন থাকা জরুরি।”
র্যাবের বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে ইশফাক ইলাহী চরচাকে বলেন, “র্যাবের জন্মের পর থেকে যখন ক্রসফায়ার দিয়ে সন্ত্রাসীদের হত্যা করছে তখন জনগণ তাদের বাহবা দিচ্ছিল। কারণ আমরা দীর্ঘমেয়াদী বিচারিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখছে পারছি না। আমরা দ্রুত সমাধান চাই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিচারবর্হিভূত হত্যা শুরু হলো। এক পর্যায়ে তারা (র্যাব) ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পেশাদার খুনিতে পরিণত হলো। পরে ২০২১ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তাদের এসব কাজ কিছুটা কমেছে।”
নতুন ইউনিট এসআরবিকে জনগণের দায়বদ্ধতার মধ্যে নিয়ে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যে বাহিনী যত বেশি ক্ষমতাধর সেই বাহিনীকে তত বেশি জনগণের জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। উন্নতদেশে এমন ধরনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো জনগণের সাথে উন্মুক্ত আলোচনা করে। আমাদের দেশেও পুলিশের বিশেষ বাহিনীকে জনগণের সাথে বসতে হবে। কিন্তু নতুন আইনে এমন কিছু নেই। সুশীল সমাজ এবং বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু বিরোধিতা করেছেন।”
এসআরবিতে জনবল নিয়োগে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি ছিল উল্লেখ করে ইশফাক ইলাহী বলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী কোনো ইউনিট হবে পুলিশের চৌকস, সাহসী, সৎ কর্মকর্তাদের নিয়ে। কিন্তু আমরা দেখলাম র্যাব করা হলো সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, এয়ারফোর্স সব জগাখিচুড়ি করে। এমন করে আসলে একটা সংগঠনের কাঠামো ঠিক থাকে না। কারণ অন্য বাহিনী থেকে ২-৩ বছরের জন্য যারা আসে তারা এগুলোতে তো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয় এবং পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া কিংবা পুলিশ আইনের বিষয়গুলো তাদের জানা নেই, জানার কথাও নয়।”
এসআরবির মধ্যে সব বাহিনীর অর্ন্তভুক্তি ‘পুলিশকে অবমূল্যায়ন’ করা হয়েছে বলে মনে করেন নূর খান লিটন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমাদের দরকার পুলিশকে সক্ষম করা। তাদের প্রশিক্ষিত করা, তাকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করা। কিন্তু তা না করে র্যাবের মতো এসআরবিকেও করা হলো সব বাহিনীর সমন্বয়ে। এর ফলে পুলিশকে অনেকটা নিষ্ক্রিয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারণ আমরা জানি, সেনা বাহিনীর প্রশিক্ষণ আর পুলিশের প্রশিক্ষণে অনেক পার্থক্য রয়েছে।”
র্যাবে কর্মরত পুলিশ ছাড়া অন্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশি উল্লেখ করে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে যারা র্যাবে এসেছিল এডিজি, ব্যাটালিয়নের হেড, ইন্টেলিজেন্সের হেড তাদেরই গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা বেশি দেখতে পেয়েছি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহিন রহমান বলেন, “র্যাবে প্রমোশনগুলোয় দেখা যায়, যারা এক্সট্রা জুড়িশিয়াল কিলিং করছে তাদের পুরস্কৃত করে প্রমোশন দেওয়া হতো। এখন আমার মনে হয়, এগুলো নিয়ে এসআরবি গঠনের সময় আলোচনা হওয়া উচিত। এই সম্যগুলো যদি পরিবর্তন না করি তা হলে আগের মতোই একটা বাহিনী গড়ে উঠবে।”
নাম পরিবর্তনে র্যাবের ‘দুর্নাম’ কাটবে না বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানের এই শিক্ষক। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি নাম কিংবা ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন বিডিআর থেকে বিজিবি, অথবা পুলিশের পোশাক পরিবর্তন-আসলে এগুলো ফলপ্রসূ হয়নি। সুতারাং এসআরবি নামকরণে সব পরিবর্তন হয়ে যাবে এটা ভাবা ভুল। আগাগোড়া পরিবর্তন করতে হবে।”