পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেন সংকটের প্রকৃত গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ হচ্ছে। গণমাধ্যমগুলোতে বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আঞ্চলিক ক্ষতিকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও, ইউক্রেন রাষ্ট্রের সাথে তার সমাজ ও জনগণের যে গভীর দূরত্ব তৈরি হচ্ছে—তা প্রায় অনালোচিতই থেকে যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সাম্প্রতিক মস্কো ও কিয়েভ সফরের পর কিয়েভ থেকে বিভিন্ন তথ্য ফাঁস হয়েছে, যেখানে রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে পূর্ব-সম্মতিপ্রাপ্ত ২৮ দফার একটি শান্তিপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে ইউক্রেন রাশিয়ার মৌলিক দাবিগুলো গ্রহণ করেনি, বরং তারা কেবল মার্কিন কূটনীতির অংশ হিসেবে সময়ক্ষেপণ করে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল, এই যুদ্ধে মার্কিন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এড়ানো এবং দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, যার ফলে সামগ্রিক আর্থিক ও কূটনৈতিক বোঝা এখন ইউরোপের কাঁধে গিয়ে পড়েছে। কিয়েভ প্রশাসনও ভালো করেই জানে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু এখন আর ওয়াশিংটন নয়, যার প্রমাণ মেলে ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক কানাডা সফর, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি ডট কমের এক বিশ্লেষণে ইউক্রেনের সর্বশেষ পরিস্থিতি হিসেবে এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য স্পেক্টেটর’ সাময়িকী এবং ইউক্রেনের নিজস্ব সামরিক-রাজনৈতিক শীর্ষ কর্মকর্তারাও স্বীকার করতে শুরু করেছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে।
তবে আরটির বিশ্লেষণের লেখক পোলেতাভ যুক্তি দিয়েছেন যে, এই পরাজয় দৃশ্যমান অবকাঠামোগত ক্ষতির চেয়েও অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। যদিও ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলা রাশিয়ার জ্বালানি গুদামগুলোতে সাময়িক সংকট সৃষ্টি করেছে। তবুও রাশিয়ার পাল্টা জবাবে ইউক্রেনের সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস, পরিবহন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি নেটওয়ার্ক প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে ইউক্রেনীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাশিয়ান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে প্রায় অক্ষম হয়ে পড়েছে। কৃষ্ণসাগরের ওডেসা বন্দরে হামলার ফলে ইউক্রেনের ডিজেলের দাম একশো হ্রিবনিয়া ছাড়িয়ে গেছে এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনীর জন্য জ্বালানি রেশনিং চালু করতে হয়েছে। সমুদ্রপথে শস্য রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় জাতীয় রাজস্ব আয় যেমন কমেছে। তেমনি খুচরা ও সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তবে এই সমস্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি কেবল সাময়িক ট্র্যাজেডি নয়; এটি ইউক্রেনকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অর্থাভাবের কারণে দেশটির সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সাধারণ জনগণকে তাদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়িক শ্রেণী, যারা একসময় রাষ্ট্রের সমর্থক ছিল, তারা এখন নিজেদের দেউলিয়া ও অসহায় বলে আবিষ্কার করছে।
এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সমান্তরালে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে একটি প্রচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধ বা সামাজিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ কেন্দ্রগুলোর (টিসিআর) বিরুদ্ধে তরুণ ও যুবকদের অবস্থান। ইউক্রেনীয় সমাজ এখন অনুধাবন করতে পারছে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো জনগণের কল্যাণের চেয়ে তাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিক সমাজের এই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা ইউক্রেনকে একটি সাধারণ রাষ্ট্র থেকে ক্রমান্বয়ে কেবল একটি ‘সামরিক সংগঠনে’ রূপান্তরিত করছে—যেমনটি সাম্প্রতিক ইতিহাসে আইসিস-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামাজিক ও নাগরিক মূল্যবোধের সমর্থন ছাড়া কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক সংগঠন হিসেবে ১৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র বা ফ্রন্টলাইন ধরে রাখা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব নয়।
ইউক্রেন রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তার নিজস্ব নাগরিকদের চেয়ে পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে, তখনই সমাজ থেকে রাষ্ট্রের এই বিচ্ছিন্নতার সূচনা হয়েছে। ইউরোপীয় মার্কিন-বিরোধী বা রাশিয়া-বিরোধী জোটের চাপে কিয়েভ সরকার আবারো যুদ্ধের পথই বেছে নিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র এবং অভ্যন্তরীণ সমাজ—উভয়ক্ষেত্রেই চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। পোলেতাভের বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, মার্কিন মধ্যস্থতার উদ্যোগ সফল না হওয়ার মূল কারণ এটিই; এই যুদ্ধ ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সাধারণ ইউক্রেনীয় সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কিয়েভ শাসনের চরম পতন ঘটে।