বিশ্বে নাগরিকের গড় গণতান্ত্রিক অধিকারের স্তর এখন ১৯৭৮ সালের সমান। একনায়কতন্ত্রের তৃতীয় ওয়েভ নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে এবং তা এখন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তিশালী দেশগুলোকেও গ্রাস করছে।
সুইডেনের গোথেনবার্গ ইউনিভার্সিটির ভি-ডেম ইনস্টিটিউট তাদের দশম বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের যে অগ্রগতি ১৯৭৪ সালে পর্তুগালের কার্নেশন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এবং ১৯৯০-এর দশকে শক্তিশালী হয়েছিল, তার প্রায় পুরোটাই এখন হারিয়ে গেছে।
প্রতিবেদনের মূল তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বে ৯২টি একনায়কতান্ত্রিক এবং ৮৭টি গণতান্ত্রিক দেশ রয়েছে। মোট জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশ বা প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ এখন একনায়কতন্ত্রের অধীনে বাস করছেন। এর মধ্যে ক্লোজড অটোক্রেসিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ২৮ শতাংশ বা ২৩০ কোটি। এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাসকারী মানুষের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি। প্রকৃত উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ বা ৬০ কোটি। জনসংখ্যাভিত্তিক হিসাবে গণতন্ত্রের এই অবনতি গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে গভীর।
সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পর দেশটি উদার গণতন্ত্রের মর্যাদা হারিয়ে কেবল নির্বাচনী গণতন্ত্রে নেমে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকান গণতন্ত্রের স্তর ১৯৬৫ সালের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভি-ডেমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক ইতিহাসে এত দ্রুত সব ক্ষমতা একজন বা একটিমাত্র কেন্দ্রের হাতে নেওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি। আমেরিকার আইনসভার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা এক শ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটিতে নাগরিক অধিকার, আইনের চোখে সমতা এবং বাক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন ষাট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। আমেরিকায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে গড় নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্তর গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অবনতি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাতটি সদস্য রাষ্ট্র এবং দুটি প্রধান মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নতুন করে একনায়কতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া, ইতালি, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া এবং যুক্তরাজ্য।
বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দিক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত এক দশকে ৪৪টি দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সরকারি গণমাধ্যম সেন্সরশিপ একনায়কতন্ত্রমুখী সরকারগুলোর সবচেয়ে সাধারণ কৌশল। নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়ন ৩০টি দেশে তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে নির্যাতনের ব্যবহারও বেড়েছে এবং ৩৩টি দেশে এ সংক্রান্ত সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে।
আঞ্চলিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় গড় নাগরিকের অধিকারের স্তর ১৯৭৬ সালের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশগুলোতে অবক্ষয় অব্যাহত থাকায় এই অঞ্চলে ক্ষয়ের মাত্রা সর্বাধিক। বাংলাদেশ ক্লোজড অটোক্রেসির শ্রেণিতে চলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিশ্বের সবচেয়ে স্বৈরাচারী অঞ্চল হিসেবে রয়ে গেছে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় সামরিক অভ্যুত্থানের পুনরুত্থান এবং পূর্ব ইউরোপে স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি আরও মজবুত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশ একনায়কতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে, যেখানে বিশ্বের ৪১ শতাংশ বা ৩৪০ কোটি মানুষ বাস করেন। এর বিপরীতে মাত্র ১৮টি দেশ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত মাত্র ৫ শতাংশ। ব্রাজিল, পোল্যান্ড, গুয়াতেমালা ও মরিশাসের মতো কয়েকটি দেশ ইউ-টার্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগের অবক্ষয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে সামগ্রিক চিত্রে গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া গত ১৫ বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রের এই অবনতি শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রকেই একনায়কতন্ত্রের দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জনবহুল, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে গণতন্ত্রের ভাঙন বাণিজ্য এবং আইন কানুনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত অবনতি এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গণতন্ত্রের তৃতীয় ওয়েভ অর্জন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং একনায়কতন্ত্রের তৃতীয় ওয়েভ এখন বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু উন্নয়নশীল বা ভঙ্গুর রাষ্ট্রের প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক ব্যবস্থার অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।