দিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনটি এমন এক সময়ে আয়োজিত হয়েছে, যখন এই জোটটি উদীয়মান অর্থনীতির ক্লাব থেকে বিশ্ব বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামোর রূপরেখা তৈরির এক অন্যতম শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। জোটে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের ভিন্নতা রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা নিজেরাও প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে তারা সবাই একমত। রাশিয়ার জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রিকসের মাধ্যমে মস্কো অ-পশ্চিমা প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে নতুন লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি প্রমাণের পথ খুঁজে পেয়েছে। মস্কোর সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিশেল বিচকোভা সোমবার আরটি ডট কমে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে এর বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে রাশিয়া তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দিল্লিতে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বব্যবস্থায় বর্তমানে এক গভীর ও মৌলিক রূপান্তর ঘটছে, যেখানে পুরনো অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর জায়গা দখল করছে নতুন উদীয়মান কেন্দ্রগুলো। বিগত পাঁচ বছরে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৪০ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে ব্রিকস দেশগুলো, যেখানে জি-৭ দেশগুলোর অবদান ছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। মস্কোর মতে, অর্থনৈতিক শক্তির এই পুনর্বন্টন কোনো রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে বাস্তব কাঠামোর ওপর ভর করেই ঘটিয়ে চলেছে। পুতিন ব্রিকসকে বিশ্ব প্রবৃদ্ধির একটি ‘নতুন ও টেকসই প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, বৈশ্বিক ব্যবস্থার নিয়মাবলী বাইরে থেকে কারো ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গঠনের এই নীতিই রাশিয়ার কৌশলগত দর্শনের মূল ভিত্তি।
কয়েক বছর আগেও ব্রিকস সংক্রান্ত আলোচনা কেবল প্রতীকী বক্তব্য এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর মূল এজেন্ডায় যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য লেনদেন পদ্ধতি, জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার, নতুন পরিবহন করিডোর, প্রযুক্তি বিনিময়, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং স্থিতিশীল শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খল। রাশিয়ার কাছে বহুমেরু বিশ্বের ধারণাটি কেবল তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন বাণিজ্য, অর্থ ও লজিস্টিকসে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রাশিয়া-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সংযোগ
দিল্লি সম্মেলনের ফাঁকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে। এই বৈঠকে রাজনৈতিক বিষয় ছাড়াও বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ সহযোগিতা ও শ্রম গতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা পুনর্ব্যক্ত করে দুই দেশ। শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগে অনুষ্ঠিত ইনোপ্রম ইন্ডিয়া প্রদর্শনী শিল্প ক্ষেত্রে উভয় দেশের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। তেল, অস্ত্র ও পারমাণবিক শক্তি নির্ভরতার বাইরে গিয়ে উৎপাদন, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং যৌথ শিল্প প্রকল্পে বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই নেতাই।
ব্রিকস বিজনেস ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন নিশ্চিত করেন যে, রাশিয়া বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতায় উন্মুক্ত এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। একই সাথে তিনি ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর’ এবং ‘ট্রান্স-আর্টিন পরিবহন করিডোর’-এর মতো বিকল্প পথগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। ভারতের বাজারে কেবল পণ্য বিক্রি করাই মস্কোর একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং বহিরাগত রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত একটি নিরাপদ লজিস্টিক ও লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন রাশিয়ার মূল অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর রাশিয়াকে কাস্পিয়ান অঞ্চল, ইরান ও ভারত মহাসাগরের মাধ্যমে ভারতের সাথে যুক্ত করে, যা ব্রিকস নেতাদের প্রস্তাবিত বহুমেরু ব্যবস্থার বাস্তব প্রতিফলন।
ডি-ডলারাইজেশনের বাস্তব রূপ এবং জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার
দিল্লি ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি, বিভিন্ন পেমেন্ট সিস্টেমের মধ্যকার মেলবন্ধন এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা জোরদার করার ওপর সমর্থন দেওয়া হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে একটি একক ব্রিকস মুদ্রা তৈরির পরিকল্পনা এই সম্মেলনের মূল এজেন্ডায় রাখা হয়নি। ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি ও মুদ্রানীতি ভিন্ন হলেও, একটি একক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর ক্ষেত্রে তাদের সমান আগ্রহ রয়েছে।
পশ্চিমা নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া রাশিয়ার জন্য এই অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম উপাদানে পরিণত হয়েছে। ক্রেমলিনের তথ্যানুযায়ী, ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ লেনদেনই বর্তমানে জাতীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে। তবে ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ স্পষ্ট করেছেন যে, রাশিয়া কোনো অন্ধ ডি-ডলারাইজেশন ছক বাস্তবায়নে নামেনি; বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার পরিসর বাড়াতে চায়, যাতে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ হয়ে না যায়।
পার্শ্ব কূটনৈতিক আলোচনা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার
দিল্লিতে ভ্লাদিমির পুতিনের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির গভীরতা থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার কৌশল স্পষ্ট হয়। মোদির সাথে আলোচনার পাশাপাশি পুতিন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সাথে বৈঠক করেন, যেখানে শিক্ষা, আন্তঃসংসদীয় যোগাযোগ এবং দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয়। আফ্রিকা মহাদেশের উদীয়মান আন্তর্জাতিক ভূমিকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে মস্কো।
এছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে পুতিনের আলোচনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতি জোরদার এবং আসিয়ান দেশগুলোকে ব্রিকসের সাথে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সঙ্গেও বৈঠক করেন পুতিন।
এই যোগাযোগের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, নতুন দেশগুলো যোগ দেওয়ায় ব্রিকসের কূটনৈতিক পরিধি কতটা বিস্তৃত হয়েছে। নতুন দেশগুলোর পশ্চিমা বিশ্বের সাথে নিজস্ব সম্পর্ক থাকলেও তেল, প্রযুক্তি, খাদ্য বা বিনিয়োগের প্রয়োজনে তারা রাশিয়ার সাথে কাজ করতে আগ্রহী।
পুতিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর দাবি উত্থাপন করেন। কৌশলগত এই জায়গায় রাশিয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে ভারতের বহু বছরের পুরনো দাবির পূর্ণ মিল রয়েছে, দুই পক্ষই আন্তর্জাতিক সংস্থায় ২১ শতকের অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে চায়।
স্লোগান থেকে কার্যকর ব্রিকসের রূপান্তর
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের চলমান সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণে ব্রিকসের সাফল্য ছিল এই সম্মেলনের অন্যতম বড় অর্জন। বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানের দেশগুলোও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংযম, কূটনৈতিক সমাধান এবং একতরফা কঠোর পদক্ষেপের বিরোধিতার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, ব্রিকস এমন একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে, যেখানে বৈচিত্র্যময় মতামত থাকলেও তা পারস্পরিক সহযোগিতার পথকে রুদ্ধ করে না।
ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। ছবি: রয়টার্স
এক মেরু বিশ্বব্যবস্থা ইতিহাসের পাতায় জমা হচ্ছে উল্লেখ করে পুতিন দাবি করেন যে, ব্রিকস বৈশ্বিক পরিচালন কাঠামোর অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব জনসংখ্যার একটি বড় অংশ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি এখন ব্রিকসের নিয়ন্ত্রণে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রিকস কি এই প্রভাবকে স্থায়ী অর্থায়ন, পরিবহন ও প্রযুক্তির শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারবে? দিল্লি সম্মেলন সব বিরোধের সমাধান না করলেও এটি নিশ্চিত করেছে যে, বহুমেরু বিশ্বের ধারণাটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে আটকে না থেকে ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে।