ব্রিকসের একটি সদস্য দেশ কয়েকমাস ধরে হামলার শিকার। তারা আবার ব্রিকসের আরেক সদস্য দেশের ওপর হামলা চালিয়েছে। কয়েকদিন পরে তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধ নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে আলোচনায় বসবে তারা। কারণ এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, গতকাল শনিবার থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে জোটটির গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করবে ভারত। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যকার মতবিরোধও সামনে এসেছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংঘাতে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পরে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে নিয়ে গঠিত এই জোটের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা।
তবে ব্রিকস গঠনের প্রায় ২০ বছর হতে চললেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, জোটটি বিশ্বকে আরও বহুমুখী করতে ভূমিকা রাখলেও পশ্চিমা বিশ্বের কার্যকর বিকল্প হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেনি।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ নিয়ে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং অর্থনীতিতে বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ পেয়েছে। তবে এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য রয়েছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ থাকায় একসঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প তৈরি করতে পারছে কি না, শুধু সেটি দিয়ে ব্রিকসের সাফল্য বিচার করা উচিত নয়। বরং পশ্চিমা আধিপত্যকে আগের চেয়ে কঠিন করে তুলতে পারছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের ব্রাজিলীয় গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহো আলজাজিরাকে ই-মেইলে বলেন, “আমরা সাধারণত ব্রিকসের যেকোনো উদ্যোগকে ছোট করে দেখি, কারণ আমরা যে ধরনের বিপ্লব আশা করেছিলাম, এটি তেমন কিছু নয়।”
তাদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় জাতিসংঘের মতো শক্তিশালী কাঠামো বা সক্ষমতা ব্রিকসের নেই। কিন্তু জোটটির অস্তিত্বই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের কথা তুলে ধরতে পারছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে থেকেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারছে।
পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করতেই জন্ম
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রিকস গড়ে তোলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। তবে এর লক্ষ্য কখনোই সেই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া ছিল না।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। দোহা আলোচনা ছিল এমন একটি বাণিজ্য আলোচনা, যার লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।
ব্রাজিলের গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহো বলেন, যেসব দেশ ভবিষ্যতে উন্নত দেশ হওয়ার আশা করছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল যে একসঙ্গে সংগঠিত হলে তাদের কথা আরও জোরালোভাবে শোনা যাবে।
তাদের মতে, প্রচলিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও জাতিসংঘের বাইরে নিজেদের উন্নয়নের জন্য অভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এসব দেশ ব্রিকস গড়ে তোলে। সেই অর্থে, ব্রিকসের জন্মই পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি পদক্ষেপ ছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলো এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল, যেগুলো তাদের কাছে পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে বলে মনে হতো।
কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্গেস বলেন, এই বিষয়টি এখনো ব্রিকসের সদস্যদের একত্রে রাখার অন্যতম প্রধান কারণ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
বার্গেস আল জাজিরাকে বলেন, ব্রিকসের দেশগুলোকে মূলত দুটি বিষয় এক করে রেখেছে। প্রথমত, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বেশি অর্থনৈতিক লাভ করতে চায়। দ্বিতীয়ত, অধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে তারা কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে–এ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিকথা শোনা বন্ধ করতে চায়।
বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে ফেলার চেয়ে সংস্কার ও নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাড়ানোই ব্রিকসের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বার্গেস প্রশ্ন তোলেন, ব্রিকসের দেশগুলো কেন জি–৭-এর সদস্য দেশগুলোর মতো পুরো বিশ্বের পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চাইবে? তার ব্যাখ্যা, ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করে দিয়েছে। এসব পথ মূলত সদস্য দেশগুলোর নিজেদের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য কমানোর স্বার্থে কাজে লাগছে।
এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, চীন কোনো শর্ত ছাড়াই উন্নয়ন সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আবার ব্রাজিল সরাসরি বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে।
বার্গেসের মতে, এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যেই নয়, পুরো উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যেই অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, একই সময়ে অধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে চাপও কমছে। বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের মতো কঠোর শর্ত আরোপ করা হচ্ছে না।
ভূরাজনীতি ও নীতি বিশ্লেষক গাই বার্টন অবশ্য মনে করেন, ব্রিকস যখন গড়ে উঠেছিল, তখনকার ‘পশ্চিমা বিশ্বের’ ধারণাই এখন অনেক বদলে গেছে। তার মতে, বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্যই দুর্বল হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার সম্পর্কেও ফাটল ধরেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ব্রিকস আসলে এখন কাকে বা কাদের চ্যালেঞ্জ করছে–যুক্তরাষ্ট্রকে, নাকি ইউরোপকে?
বিশাল অর্থনীতি, কিন্তু একসঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা সীমিত
বিশ্লেষকরা মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে ব্রিকস অনেক শক্তিশালী হলেও এই শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর ক্ষমতা এখনো সীমিত।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফরেন পলিসি ইন ফোকাসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইমরান খালিদ আল জাজিরাকে বলেন, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে বাস করে। ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বিশ্বের মোট অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ ব্রিকসের দখলে। বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশও এই জোটের সদস্য দেশগুলোর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, এ বছর ব্রিকসের ১১টি দেশের অর্থনীতি গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিপরীতে, জি৭-এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশ।
তবে এত বড় অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ব্রিকসের প্রভাব এর আকারের তুলনায় কম বলে মনে করেন খালিদ। তিনি বলেন, ব্রিকসের তৈরি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ মোট প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। বিশ্বব্যাংক কয়েক মাসেই এর চেয়ে বেশি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ ছাড়া ব্রিকসের এই ব্যাংক এখনো বেশির ভাগ অর্থ ডলারে সংগ্রহ করে।
ব্রাজিলের গবেষক অলিভেইরা ও গোদিনহোও বলেন, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পশ্চিমা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো বড় কোনো নতুন ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি। এর অনেক বৈশিষ্ট্যই আগে থেকে থাকা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মতো।
তাদের মতে, বিশ্বের মোট অর্থনীতিতে ব্রিকসের অবদানও এখনো জি৭-এর চেয়ে কম। আর ব্রিকসের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি চীন ও ভারত।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ডলারের ওপর এখনো তাদের ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে।
ব্রাজিলের এই দুই গবেষক বলেন, ডলারের ব্যবহার কমানোর বিষয়ে ব্রিকস অনেক কথা বললেও বাস্তবে জোটের বেশির ভাগ বাণিজ্য এখনো মার্কিন ডলারে হয়। সদস্য দেশগুলোর বেশির ভাগের কাছেই বিপুল পরিমাণ ডলার মজুত রয়েছে। এর ফলে বিশ্বে প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। একই সঙ্গে ব্রিকসের দেশগুলোও ডলারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। এতে নিজেদের নীতিনির্ধারণে তাদের স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে।
সম্মেলনের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেন। ছবি: রয়টার্স
চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের মুদ্রা ব্যবহারের চেষ্টা করছে। সৌদি আরবও ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রায় বাণিজ্যের কথা বলেছে। তবে ব্রিকসের এই উদ্যোগে ডলারের সামনে এখনো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়নি। আগামী ১০ বছরেও তা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন বার্টন।
খালিদ বলেন, পুরো ব্রিকস একসঙ্গে ডলার থেকে সরে যাচ্ছে না। বরং সদস্য দেশগুলো আলাদাভাবে, একেকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া ধীর হলেও একবার শুরু হলে তা ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন।
তবে অলিভেইরা ও গোদিনহো মনে করেন, ব্রিকসের অর্থনৈতিক সাফল্যকে একেবারে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তারা বলেন, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকই পশ্চিমা দেশগুলোকে ছাড়াই গঠিত প্রথম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যদিও এটিও বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করছে।
২০২৪ সালে ব্রিকসের সম্প্রসারণও জোটটির সম্মিলিত প্রভাব বাড়িয়েছে। সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্ত হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্রিকসের প্রভাব আরও বেড়েছে।
এ ছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগসহ অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে চীনের বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক লেনদেন বাড়ছে। গবেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও উন্নয়নের বাস্তব বিকল্প তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো পুরোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষায় এক, স্বার্থে বিভক্ত
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বিশ্বের বড় একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারাই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এটিই আবার জোটটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে। কারণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এখনো অনেক মতবিরোধ রয়েছে।
মে মাসে ভারতেই ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি ব্রিকস।
খালিদ বলেন, মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। কারণ ইরান চেয়েছিল বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হোক। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে রাজি হয়নি।
তবে খালিদ বলেন, চলমান যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতির জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর। এর কোনোটিই ওয়াশিংটন থেকে আসেনি।
আজ শুরু হচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন। ছবি: রয়টার্স
অন্যদিকে বার্টন বলেন, ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা বাড়ায় জোটের ভেতরের মতবিরোধ আরও জটিল হয়েছে। সদস্য বাড়ার ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু জোটের অভিন্ন অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ইরানের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্রিকসের সদস্য হওয়ার কারণে তেহরান নিজের কথা বলার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে ব্রিকসের অন্য সদস্য দেশগুলো ইরানের পক্ষ নিয়েছে।
বার্টন বলেন, ব্রিকসে ‘একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন’–এমন কোনো নীতি নেই। সদস্য দেশগুলো ইচ্ছা করেই নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ধরে রেখেছে। এটি একটি সমন্বিত জোটের ঠিক বিপরীত।
বার্গেসও একই মত দেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্য ব্রিকসের সব সদস্যেরই রয়েছে। কিন্তু কী বার্তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তারা একমত নয়।
অলিভেইরা ও গোদিনহো বলেন, শুরুতে সদস্য সংখ্যা কম হওয়ায় উন্নয়নশীল বিশ্বের বৈচিত্র্য তুলে ধরা কঠিন ছিল। এখন আবার সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকায় ব্রিকস এতদিনে যে সাফল্য অর্জন করেছে, সেটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে ব্রিকসের নতুন সদস্য এবং জোটে যোগ দিতে আগ্রহী দেশগুলোর সংখ্যা বাড়াকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এত ভিন্ন স্বার্থের দেশ একসঙ্গে বসতে পারছে–এটাই বিশ্বব্যবস্থা যে ধীরে ধীরে বহুমুখী হয়ে উঠছে, তার প্রমাণ।
ব্রিকস কি সত্যিই পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করছে?
খালিদের মতে, সামগ্রিকভাবে ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং এটি বিভিন্ন দেশের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাড়ানোর একটি প্ল্যাটফর্ম। ব্রিকসের নিজস্ব কোনো অভিন্ন মুদ্রা নেই, অভিন্ন শুল্কব্যবস্থা নেই এবং সদস্যদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও নেই। তাই এটিকে প্রচলিত অর্থে একটি ভূরাজনৈতিক জোট বলা কঠিন।
তবে ব্রিকস পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আরও সুযোগ দিয়েছে।
খালিদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–ব্রিকস হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য কোনো একটি দেশকে আলাদাভাবে চাপ দেওয়া আগের চেয়ে বেশি কঠিন করে তুলেছে।