বিরিয়ানিতে নাকি আলু প্রচলন শুরু করেছিলেন লখনৌয়ের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ—
এমনটা প্রায়ই শোনা যায়। লখনৌ থেকে তাকে যখন কলকাতায় নির্বাসিত করা হয় তখনই নাকি তার নবাবি হেঁশেলে বিরিয়ানিতে আলুর প্রচলন হয়।
অনেকে বলেন, নবাব সাহেবের কোষাগারে টান পড়ছিল বলে বিরিয়ানিতে আলু ঢুকেছিল। আবার অনেকে বলেন, আলু তখন আমদানি পণ্য ছিল। সুতরাং সেটা ‘দামি’ ছিল। ‘দামি জিনিস’ অর্থাৎ বিলাস পণ্য। নবাব বিলাসি হবে না তো কে হবেন?
সুতরাং ট্যাঁকে টান পড়ায় বিরিয়ানিতে আলু ঢুকেছে—এই তত্ত্ব ঠিক নয়। সত্যি বলতে, দুটোর কোনো তত্ত্বই ঠিক নয়। তাহলে বিরিয়ানিতে আলু কবে ঢুকেছিল? সেটা বরং খোঁজা যাক।
আলু প্রথম চাষ ও ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ৭ হাজার ১০ হাজার বছর আগে, অর্থাৎ আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ৫ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলে, বর্তমানের পেরু ও বলিভিয়ায়। আন্দিজ পর্বতমালার টিটিকাকা হ্রদ অঞ্চলে ইনকা ও তাদের পূর্বসূরিরা প্রথম বুনো আলু চাষ শুরু করে। বুনো আলুতে তিতা ও বিষাক্ত ‘সোলাইন’ উপাদান থাকত, যা বিশেষ প্রজনন কৌশলে মিষ্টি ও নিরাপদ আলুতে রূপান্তর করা হয়। এ বিষয়ে ব্রিটিশ গবেষক রেডক্লিফ সালামান-এর লেখা ‘দ্য হিস্ট্রি অ্যান্ড সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্স অব দ্য পটেটো’তে বিশদ বিবরণ আছে।
স্প্যানিশরা ১৫৩২ সালের পর ইনকা সাম্রাজ্য দখল করলে প্রথম আলুর খোঁজ পায়। পরে ১৫৭০ এর দশকে তারা জাহাজে করে এই আলু ইউরোপে নিয়ে আসে। যা পরে ছড়িয়ে ইতালি, আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
এখানে একটা গল্প আছে। বলা হয়, ১৫৮৬ সালের দিকে অভিযাত্রী স্যার ওয়াল্টার র্যালে রানী প্রথম এলিজাবেথকে আজকের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা আলুসহ একটি আস্ত গাছ উপহার দেন। প্রথমবার আলু দেখে রাণীর শেফ বুঝে উঠতে পারেনি কোনটা খাওয়ার অংশ আর কোনটা নয়। শেষমেশ সে আলুটাকে ফেলে দিয়ে গাছের অংশটুকু রেখে দেয় রান্না করার জন্য। আলুর পাতা ও গাছে ‘সোলাইন’ থাকায় সেই সেদ্ধ পাতা খাওয়ার পর রানী এলিজাবেথসহ ভোজের সমস্ত অতিথি মারাত্মক পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রানী নাকি তৎক্ষণাৎ রাজকীয় বাগান থেকে সব আলু গাছ উপড়ে ফেলতে নির্দেশ দেন। এই ঘটনার কারণে পরবর্তী দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ রাজপরিবারে আলু নিষিদ্ধ ছিল। তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
ইউরোপে আলু ঢোকার ১০ বছর পরে অর্থাৎ ১৫৮০ সালে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের অধীনে স্পেন ও পর্তুগাল এক হয়। তার কিছু বছর পর ১৬০০ সালের পরে ভারতের পশ্চিম উপকূল তথা আজকের গুজরাটের সুরাট বন্দরে পর্তুগিজরাই প্রথম ইউরোপ থেকে আলু নিয়ে আসে।
ব্রিটিশ ধর্মযাজক ও পর্যটক এডওয়ার্ড টেরি ১৬১৫ সালে স্যার থমাস রো-এর সাথে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন। ১৬৫৫ সালে প্রকাশিত তার লেখা বই ‘অ্যা ভয়াজ টু ইস্ট ইন্ডিয়া’ তে সম্রাট শাহজাহানের শ্বশুর আসফ খানের দরবারে এক ভোজসভায় আলুর ব্যবহার দেখতে পান।
আরেক ইংরেজ চিকিৎসক ও পর্যটক জন ফ্রায়ার ১৬৭৩ সালে উপমহাদেশে আসেন। তার ভারতবর্ষ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৬৯৮ সালে প্রকাশিত হওয়া বই ‘অ্যা নিউজ অ্যাকাউন্ট অব ইস্ট-ইন্ডিয়া অ্যান্ড পার্সিয়া ইন এইট লেটারস’ এ সুরাট ও কর্ণাটকে আলুর চাষ হতে দেখেছেন বলে লিখেছেন। তবে এখানে একটু কিন্তু আছে। উভয় বর্ণনাতে যে আলুর কথা বলা হচ্ছে, তা কি সাদা আলু নাকি মিষ্টি আলু, তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ করেন।
১৭ শতকে ইংরেজি ভাষায় ‘Potato’ শব্দটি মূলত স্প্যানিশ ‘Batata’ থেকে আসা মিষ্টি আলু (Ipomoea batatas) বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। আধুনিক গোল আলু বা সাদা আলু (Solanum tuberosum)-কে তখন আলাদা করতে ‘Virginia potato’ বা ‘Irish potato’ বলা হতো।
খাদ্য ইতিহাসবিদ কে. টি. আচায়া এবং স্যার জর্জ ওয়াট-এর গবেষণা বলছে, টেরি ও ফ্রায়ার যে ‘Potato’-এর কথা লিখেছেন, তা ছিল মূলত মিষ্টি আলু বা মেটে আলু।
সে তো গেল। কিন্তু বাংলায় আলু এল কবে?
কে টি আচায়া তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ১৭৮০ সালে কলকাতায় তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসকে এক ঝুড়ি আলু উপহার দেওয়া হয়েছিল। সেই আলু দিয়ে তিনি কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়ে ডিনার করেন। ১৮২০ সালে উইলিয়াম কেরি কলকাতায় ‘অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড হরটিকালচারাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’ প্রতিষ্ঠা করার পরই মূলত হুগলি, বর্ধমান ও কলকাতার আশপাশের অঞ্চলে আলু চাষকে কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় করার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ঔপনিবেশিক জেলখানা ও কয়েদিদের খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত ঐতিহাসিক নথিপত্রেও উঠে এসেছে আলুর অস্তিত্ব। ১৮২৪ সালের আলিপুর জেলের বাজার খরচের তালিকায় আলুর কেনার প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং সরকারি প্রতিষ্ঠানে যে আলুর ব্যবহার শুরু হয়েছে এটি তা প্রমাণ করে।
অধ্যাপক উৎস রায় তার ‘কালিনারি কালচার ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’ বইয়ে জানাচ্ছেন, ১৮২৮ সালে লর্ড আমহার্স্টের শাসনামলে অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড হরটিকালচারাল সোসাইটি স্থানীয় চাষিদের আলু চাষে উৎসাহ দিতে পুরস্কারের ব্যবস্থা করে এবং প্রথম সারির ১০ জন দেশীয় আলুচাষীকে নগদ অর্থ ও পদক দেওয়া হয়।
এবার দেখা যাক বিরিয়ানিতে আলু কীভাবে ঢুকলো?
১৫ শতকের শেষভাগে ফারসি ভাষায় লেখা কুকবুক ‘নি’মাতনামা নাসির শাহী’, মোঘল সম্রাট শাহজাহানের হেঁশেলের রন্ধনপ্রণালীর বই ‘নুশখা-ই-শাহজাহানি’ তে যেসব পোলাও ও বিরিয়ান-এর রেসিপি আছে তাতে আলু কোনো নাম গন্ধ নেই। এই যেমন ‘জের বিরিয়ান নূরমহলী’, যাকে আজকের মাটন বিরিয়ানির (তা সে কাচ্চি হোক বা পাক্কি) জননী ধরা হয় সেখানেও কিন্তু আলু নেই। সাদা আলু তো নেই-ই, আগে যে লাল আলুর কথা বলা হয়েছে তারও কোনো উল্লেখ নেই।
বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম কুকবুক ‘পাকরাজেশ্বর’ ১৮৩১ সালে প্রকাশিত হয়। আর দ্বিতীয় বই ‘ব্যঞ্জনরত্নাকর’ প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ সালে। এই দুই বই ঘেঁটে বিরিয়ানিতে আলুর সন্ধান পাননি খাদ্যগবেষক নীলাঞ্জন হাজরা। ‘বিরিয়ানি বন্দিশ’ বইয়ে তিনি বিরিয়ানির বিশদ লেখার চেষ্টা করেছেন। যে ইতিহাস লিখেছেন তা আগ্রহী পাঠকের কাছে রত্নের মতো। বই দুটি যখন প্রকাশিত হয় তখন আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে ইতোমধ্যে নির্বাসিত।
এবার একটু দেখা যাক খাওয়ার বাইরে নবাব ওয়াজিদ আলী আর কী কী বিলাস করতেন।
নির্বাসিত জীবনেও তিনি প্রচুর অর্থ খরচ করতেন সুরম্য অট্টালিকা, বাগানবাড়ি, নৃত্যকলা, দাবা খেলার পেছনে। ছিল চিড়িয়াখানাও। এহেন নবাব অর্থাভাবে বিরিয়ানির মাংস কম কিনতে পারছিলেন— এ গল্প মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
নবাবেবর মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে, ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত বাঙালি কুকবুক ‘পাক-প্রণালী’ এর প্রথম খণ্ডে আলুর কোনো ব্যবহার পাওয়া যায় না। তবে ১৮৯৭ সালে ওই বইয়েরই পাঁচটি খণ্ড যখন একসঙ্গে প্রকাশ হয় তখন আলুর ব্যবহার দেখা যায়। বইয়ের লেখক বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, আলু, মাংস ও মাছ-ভাতের সাথে খেলে আরও বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়।
এই বিপ্রদাসের পরিচয় একটু করে দেওয়া যাক। তার বাবা হলেন, প্রখ্যাত নাট্যকার অভিনেতা অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। পাক-প্রণালী বইয়ে বেশ কয়েকটি বিরিয়ানির রেসিপি আছে। তবে তাতে আলুর উল্লেখ নেই। ১৯০০ সালের শুরুর দিকে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয়া প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর বই ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বইয়েও বিরিয়ানিতে আলুর উল্লেখ নেই।
ঢাকার বিরিয়ানিতে আলু ঢুকল কবে
হেকিম হাবিবুর রহমান, যিনি সাতচল্লিশপূর্ব ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে’ তারই রচনা। সেখানে হেকিম সাহেব লিখেছেন, বিরিয়ানিতে আলু ঢাকার মানুষ খুব একটা পছন্দ করতেন না। আরও লিখেছেন, যারা কলকাতায় বেশি যেতেন বা থাকতেন তারাই বিরিয়ানিতে আলু পছন্দ করতেন। তার বইটি মূলত ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে অলইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে উর্দু ভাষায় প্রচারিত কথিকা সিরিজ। ১৯৪৫ সাল থেকে ৫০ বছর আগের অর্থাৎ ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকের ইতিহাস, সমাজ-সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে হেকিম হাবিবুর রহমানের নিজের প্রত্যক্ষ করা ঘটনার ধারাভাষ্য।
বিরিয়ানিতে নাকি আলু প্রচলন শুরু করেছিলেন লখনৌয়ের শেষ নবার ওয়াজিদ আলি শাহ। ছবি: চরচা
তবে ১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা বিরিয়ানিতে আলু চালু ছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ৪০ এর দশকে কলকাতায় বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট; যেমন ১৯৪৭ সালে আমিনিয়া আর ১৯৪৮ সাল থেকে সাবির হোটেলে আলু দিয়ে বিরিয়ানি চালু ছিল। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারের সদস্য রেণুকা দেবী চৌধুরাণী (১৯০৯- ১৯৮৫) জমিদার বাড়ির রান্নার রেসিপি সংকলন করেন। যা পরে ‘রকমারি নিরামিষ রান্না’ ও ‘রকমারি আমিষ রান্না’ নামে প্রকাশিত হয়। অনেকে অবশ্য বলেন, গত ষাটের মধ্যে ঢাকার বিরিয়ানিতে আলুর ব্যবহার শুরু হয়। সুতরাং এটুকু বলা যায়, ঢাকার বিরিয়ানি অন্তত চল্লিশের দশকে আলু ছিল না। আলুর সংযোজন তার পরে।