অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুল ক্লিনিক্যাল সুযোগ, গবেষণার সংকট এবং মাননিয়ন্ত্রণের জরুরি চাহিদাকে সামনে রেখে চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। দেশে রেকর্ডসংখ্যক চিকিৎসা স্নাতক তৈরি হলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা ও শিক্ষার মান নিয়ে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে। ঠিক এমন সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ রয়েছেন। আন্তর্জাতিক গড় যেখানে ৪৯ জন।
গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম চিকিৎসক-জনসংখ্যা অনুপাত বজায় রাখতে দেশে ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। অথচ সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৩০ হাজার ৩১১ জন।
২০২৬ সালে পরিচালিত সরকার-অর্থায়নকৃত এক সমীক্ষার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, ডব্লিউএইচও-এর সর্বনিম্ন মানদণ্ড (প্রতি ২ হাজার জনে এক জন ডাক্তার) পূরণ করতে ওই সংখ্যক চিকিৎসক দরকার।
কলেজ বাড়লেও চ্যালেঞ্জ শিক্ষার মান
গত কয়েক বছরে দেশে চিকিৎসা শিক্ষার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। নতুন ভবন তৈরির পাশাপাশি পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, আধুনিক সরঞ্জাম এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকের দীর্ঘদিনের ঘাটতি চিকিৎসা শিক্ষার প্রধান দুর্বলতা। ল্যাবরেটরি, গবেষণামূলক জার্নাল ও ইন্টারনেট সংযোগের অভাবসহ মানসম্মত শিখন-পরিবেশের ঘাটতি শিক্ষার মানকে ক্ষুণ্ন করছে।
অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোর পুরোনো একাডেমিক ভবন আধুনিকায়ন ও সংস্কারের কাজ চলছে। বিদ্যমান ছাত্রাবাস সংস্কারের পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে আবাসন সুবিধা নেই, সেখানে নতুন হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক সংকট মেটাতে নতুন নিয়োগ, পদোন্নতি ও পেশাগত সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে বিষয়ভিত্তিক ও সমন্বিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা শিক্ষায় একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা জরুরি হওয়ায় এই সংকট দূর করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত গুরুতর জনবল সংকট ও ভৌগোলিক বৈষম্যে জর্জরিত। অনুমোদিত ও নিবন্ধিত অধিকাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
পাঠ্যক্রম পরিমার্জন ও সিমুলেশন শিক্ষা
চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর মেডিকেল শিক্ষার পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হয়। তবে শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করলেই রাতারাতি ফল আসে না। একটি নতুন পাঠ্যক্রমের সুফল পেতে অন্তত দুই থেকে তিনটি ব্যাচ সেই কারিকুলামের অধীনে শিক্ষা শেষ করা প্রয়োজন। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিখন পদ্ধতি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, ক্লিনিক্যাল এক্সপোজার এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন সমান জরুরি।
সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারের অন্যতম প্রধান দিক হলো সিমুলেশন-ভিত্তিক শিক্ষা। যেসব মেডিকেল কলেজে এই সুবিধা নেই, সেগুলোতে পর্যায়ক্রমে আধুনিক সিমুলেশন ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি রোগীর ওপর প্রয়োগ করার আগে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জটিল অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা পদ্ধতি অনুশীলন করতে পারবেন। এতে তাদের কারিগরি দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং রোগীর ওপর ঝুঁকি কমবে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ আরও কার্যকর করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গবেষণা শক্তিশালী করতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘রিসার্চ, পাবলিকেশন অ্যান্ড কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট বিভাগ’ থেকে শিক্ষকদের প্রতি বছর অনুদান দেওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবন উৎসাহিত করা এবং প্রমাণ-ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি জনপ্রিয় করা। স্নাতকোত্তর কোর্স আধুনিকায়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে। শিক্ষক বিনিময় কর্মসূচিও জোরদার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে কাজ করছে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’ (বিএমইএসি)। ২০২৩ সালের আইনের অধীনে গঠিত এই কাউন্সিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এটি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোর্সের অনুমোদন ও স্বীকৃতি দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম সংশোধন, সিমুলেশন ল্যাব, উন্নত ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, ফ্যাকাল্টি বিনিময় এবং গবেষণার সমন্বয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে।