লাওস, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তকে জুড়ে দেওয়া পাহাড়ি বনাঞ্চল ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ একসময় ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আফিম উৎপাদনকারী অঞ্চল। মাদক ব্যবসায়ীরা আফিমের নির্যাসকে বলত ‘কালো সোনা’। এই নির্যাসকেই পরিশোধন করে হেরোইন তৈরি করা হয়।
১৯৯০-এর দশকে এই অঞ্চলেই বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আফিম গাছের চাষ হতো। পরে সরকারি অভিযানসহ নানা কারণে পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০০৬ সাল আসতে আসতে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, বিশ্বে অবৈধভাবে যত আফিম উৎপাদিত হতো, তাতে এই অঞ্চলের অবদান নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৫ শতাংশের আশপাশে।
তবে মিয়ানমারে আবারও আফিমের উৎপাদন বেড়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) বলছে, মিয়ানমারই এখন আবার বিশ্বের অবৈধ আফিমের সবচেয়ে বড় পরিচিত উৎস। মিয়ানমারের আফিমের সবচেয়ে বড় অংশের চাষ হয় দেশটির পূর্বাঞ্চলের শান রাজ্যে।
মিয়ানমারে আফিমের ব্যবসা আবার বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্য অনেক দেশের পরিস্থিতিরও ভূমিকা আছে। আফগানিস্তানের কথাই ধরুন, এই দেশটিও আফিম উৎপাদনের জন্য পরিচিত। দেশটির বর্তমান শাসকগোষ্ঠী তালেবান ১৯৯০-এর দশক থেকে আফিম নিয়ে একেক সময়ে একেক ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে– একবার তো আফিম চাষকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দিয়েছিল!
তবে ২০২১ সালে আফগানিস্তানের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তালেবান আফিম চাষ নিষিদ্ধ করে দেয়। এতে লাভ হয়েছে মিয়ানমারের আফিম চাষীদের, তারা নিজেদের উৎপাদিত আফিমের জন্য দামটা বেশি পাচ্ছেন।
তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতও দেশটিতে আফিমের ব্যবসা বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ। ইউএনওডিসির জেরেমি ডগলাস বলেন, “এখানে মূল সমস্যাটা হচ্ছে দারিদ্র।” পাঁচ বছর আগে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক হাজার। দেশটির অর্ধেক মানুষের বাস এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে– ২০১৭ সালে এই হার ছিল অর্ধেক।
এ অবস্থায় স্থানীয় কৃষকদের কাছে আফিম চাষ লাভজনক হয়ে উঠেছে। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে আফিম চাষের জমির পরিমাণ গত বছর ১৭ শতাংশ বেড়েছে– গত ১০ বছরে এত জমিতে আফিম চাষ হয়নি।
মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের চিন রাজ্যে আফিমের চাষ বাড়ছে। এই রাজ্যটি সীমানা ভাগাভাগি করছে ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে। গত বছর পর্যন্ত মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী থাকা বীরেন সিং বলেছেন, “গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ভারতের দিকে সরে আসছে।” তিনি এই সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
থাইল্যান্ডও চিন্তিত। মাদক পাচারকারীরা মাদক পরিবহনের জন্য থাইল্যান্ডের উন্নত সড়কব্যবস্থা ব্যবহার করে। দেশটির কয়েকটি সীমান্ত শহরে গত পাঁচ বছরে মাদক ব্যবহারের হার তিন গুণ বেড়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে আফিম উৎপাদন বেড়ে যাওয়াও এর একটি কারণ।
মিয়ানমারের সেনাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া মিন অং হ্লাইং গত আগস্টে ব্যাংককে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। মিয়ানমারে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এটাই ছিল তাদের প্রথম বৈঠক। মাদক সমস্যা মোকাবিলায় দুই দেশ যৌথভাবে আরও কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
থাইল্যান্ডের বিশেষজ্ঞরা জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)-এর সঙ্গে কাজ করছেন। তারা মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে এমন কিছু পদ্ধতি ব্যবহারে সহায়তা করছেন, যেসব পদ্ধতি বহু বছর আগে থাইল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকা থেকে আফিমের চাষ কমাতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এর মধ্যে অন্যতম হলো বিকল্প ফসল চাষ। এই পদ্ধতিতে কৃষকদের আফিমের বদলে ফল বা এমন কোনো লাভজনক ফসল চাষে উৎসাহ দেওয়া হয় এবং এ জন্য তাদের অর্থও দেওয়া হয়। মিয়ানমারে ইউএনওডিসি শান রাজ্যের রাজধানী তাউংগির আশপাশের কয়েকটি গ্রামে কৃষকদের কফি চাষে সহায়তা করছে। জেরেমি ডগলাস বলেন, জাতিসংঘ যেখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, সেখানে এই কর্মসূচি সফল হয়েছে। তবে বড় পরিসরে এই প্রকল্প চালানো বড় চ্যালেঞ্জ।
মিয়ানমারের জান্তা সরকার আফিমের ব্যবসা বন্ধ করতে আসলে কতটা আগ্রহী, এ নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধেই আফিমের ব্যবসা থেকে লাভ করার অভিযোগ রয়েছে।
মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণও সামরিক সরকার ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত। এসব গোষ্ঠীর কেউ সামরিক সরকারের সঙ্গে আছে, আবার কেউ তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে আফিম চাষ পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
আর কৃষকদের দিক থেকে দেখলে, অনেক কৃষকের চোখে অন্যান্য ফসলের চেয়ে আফিম চাষ আয় করার নিশ্চয়তা বেশি। এক হেক্টর জমিতে শুকনো আফিম চাষ করে কফির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি আয় করা যায়।
১৯৫৮ সালে থাইল্যান্ড আফিমের ব্যবসা নিষিদ্ধ করার পর দেশটির পাহাড়ি এলাকা থেকে আফিমের চাষ সরাতে প্রায় ৫০ বছর লেগেছিল। তখন থাইল্যান্ডে শান্তি ছিল, অর্থও ছিল। মিয়ানমারে এর কোনোটিই নেই।
লেখাটি দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত