বাংলাদেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ যেন নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অসচেতনতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে, যা আজ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি।
ডেঙ্গুর তিন ফেইজ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু জ্বরের গতিপ্রকৃতি মূলত তিনটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম পর্যায়ে রোগীর তীব্র জ্বর, গায়ে ও হাড়ের জোড়ায় প্রচণ্ড ব্যথা হয়, যা ৫ থেকে ৬ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। স্বস্তির বিষয় হলো, এই সময়ে সাধারণত রক্তে প্লাটিলেট কমে না।
দ্বিতীয় পর্যায়ে জ্বর শুরু হওয়ার ৬ষ্ঠ দিন থেকে ৯ম দিন পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময়ে সাধারণত জ্বর থাকে না, কিন্তু রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে। ফলে শরীরের যেকোনো স্থান থেকে রক্তক্ষরণ, প্লাজমা লিকেজ, মারাত্মক পানিশূন্যতা এবং রক্তচাপ হুট করে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই পর্যায়কে ‘ক্রিটিক্যাল ফেইজ’ বলে।
একদম শেষ পর্যায়ে, ১০ম দিন থেকে প্লাটিলেট আবার বাড়তে শুরু করে। এই সময়ে রোগীর শরীরে হালকা চুলকানি হতে পারে এবং ১০ম থেকে ১৪তম দিনের মধ্যে প্লাটিলেটের মাত্রা সাধারণত স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।
প্লাটিলেট আসলে কী এবং কেন কমে?
আমাদের রক্তে প্রধানত তিন ধরনের রক্তকণিকা থাকে, যার মধ্যে আকারে সবচেয়ে ছোট হলো প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা। এটি আমাদের অস্থিমজ্জায় উৎপাদিত হয়। রক্ত জমাট বাঁধতে এবং শরীরের কোথাও কেটে গেলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে প্লাটিলেট ‘অতন্দ্র প্রহরীর’ মতো কাজ করে। ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণ বাড়লে অস্থিমজ্জার কার্যকারিতা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্লাটিলেট দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। মানে তখন শরীর নিজের প্লাটিলেটগুলোকে ভুলবশত শত্রু মনে করে আক্রমণ ও ধ্বংস করে, তখন প্লাটিলেট কমে যায়। এই অবস্থাকে মূলত ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বা আইটিপি বলা হয়।
প্লাটিলেট হ্রাসের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ
রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে শরীরে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন:
- শরীরের সামান্য কোনো ক্ষতস্থান থেকে দীর্ঘক্ষণ রক্তপাত হওয়া।
- ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়ে বেগুনি রঙের ছোপ ছোপ ক্ষত বা কালসিটে দাগ পড়া।
- ত্বকে অস্বাভাবিক লাল বা কালো র্যাশ দেখা দেওয়া।
- মহিলাদের ক্ষেত্রে পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক রক্তপাত হওয়া।
- বিনা কারণে মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া।
- প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দেওয়া।
- অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ ও শরীর চরমভাবে পানিশূন্য হয়ে পড়া।
কিছু জরুরি তথ্য
অনেকেই মনে করেন ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমলেই সঙ্গে সঙ্গে প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশন বা রক্ত লাগবে—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে শুধু প্লাটিলেট কমতির কারণে রোগীর মৃত্যু হয় না, বরং প্লাজমা লিকেজ ও রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে শকে চলে যাওয়ায় বিপদ ঘটে।
স্বাভাবিক মানুষের রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা প্রতি মাইক্রোলিটারে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার। ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে নেমে গেলে কিংবা শরীরে ইন্টারনাল ব্লিডিং বা রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা দিলেই কেবল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্লাটিলেট বা রক্তের প্রয়োজন পড়ে। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরে ঘরোয়া উপায়ে প্রচুর তরল খাবার, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন এবং পুষ্টিকর খাবার খেয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা সবচেয়ে কার্যকর পথ। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।