গত সপ্তাহে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। আর সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে বিপুল ভোটও পড়েছে। সিদ্ধান্তটি হলো নতুন বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহার। এসব মানচিত্রে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আকার আরও সঠিকভাবে দেখানো হয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে প্রচারণা চালানোর পর এই সিদ্ধান্ত আসে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নও নতুন একটি মানচিত্র গ্রহণ করে। ভোটে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ, যারা এর বিরোধিতা করেছে। ভোটের আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনচেভিচ বলেন, এই প্রস্তাবই প্রমাণ করে কেন জাতিসংঘের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। ছবি: রয়টার্স
তিনি বলেন, “বাস্তব সমস্যাগুলোতে মনোযোগ না দিয়ে এই সংস্থা ১৬শ শতকের মানচিত্র নিয়ে আলোচনা করছে।”
তবে প্রস্তাবটি অনুমোদনের পর আরও অন্তত তিনটি দেশ পরিবর্তনটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। দেশগুলো হলো ভারত, ইউক্রেন ও জাপান।
নতুন মানচিত্র পদ্ধতি গ্রহণের সরাসরি বিরোধিতা করেনি কোনো দেশই। তবে বিতর্কিত কিছু অঞ্চল মানচিত্রে কীভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে তারা উদ্বেগ জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো - নতুন বিশ্ব মানচিত্র কেন?
জাতিসংঘ মার্কেটর প্রজেকশনের পরিবর্তে বিশ্ব মানচিত্রের ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানচিত্র তৈরিতে মার্কেটর প্রজেকশনই বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে এই প্রস্তাবের মাধ্যমে মার্কেটর প্রজেকশন নিষিদ্ধ করা হয়নি। কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহার করাও বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বরং দেশগুলোকে ২০১৮ সালে তিনজন গবেষকের তৈরি ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়েছে।
মার্কেটর প্রজেকশন তৈরি করেছিলেন ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে। সেই সময় পশ্চিমা দেশগুলো নতুন নতুন অঞ্চল দখলের প্রতিযোগিতায় ছিল। ত্রিমাত্রিক পৃথিবীকে দ্বিমাত্রিক সমতলে দেখানোর চেষ্টা থেকেই এই মানচিত্রের তৈরি।
এ কারণে এই মানচিত্রে মেরুর কাছাকাছি থাকা দেশগুলো তাদের প্রকৃত আকারের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। অন্যদিকে, বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা দেশগুলো তুলনামূলক ছোট দেখায়।
কয়েক দশক ধরে মানচিত্র বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, মার্কেটর মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন অনেক ছোট দেখানো হয়। অন্যান্য উন্নয়নশীল অঞ্চলও একইভাবে ছোট দেখায়। অন্যদিকে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলকভাবে অনেক বড় দেখায়।
উদাহরণ হিসেবে, মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান বড় দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে আফ্রিকার ভেতরে প্রায় ১৪টি গ্রিনল্যান্ড জায়গা করে নিতে পারে। আবার মানচিত্রে ইউরোপকে দক্ষিণ আমেরিকার চেয়ে বড় দেখানো হলেও বাস্তবে ইউরোপের আয়তন দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় অর্ধেক।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অধিকারকর্মীরা বলেন, আয়তনের এই ভুল উপস্থাপনাই মানচিত্রটিকে সমস্যাযুক্ত করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের মানচিত্র আফ্রিকা সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক ধারণা আরও বাড়িয়ে দেয়।
অনেক মানচিত্রবিদ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন ঠিকভাবে দেখানোর জন্য নতুন মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেছেন। তবে আফ্রিকার অধিকারকর্মীরা বিশেষভাবে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন মানচিত্রের পক্ষে প্রচারণা চালায়। এতে আফ্রিকাকে বড় এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক ছোট দেখানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গোল পৃথিবীকে সমতল কাগজে দেখাতে গেলে কিছুটা ভুল থাকবেই। তবে পৃথিবীর প্রকৃত আয়তন দেখানোর ক্ষেত্রে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনই এখন সবচেয়ে কাছাকাছি।
কিন্তু নতুন মানচিত্র নিয়ে ইউক্রেনের কপালে ভাঁজ কেন?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটে ইউক্রেনসহ ছয়টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। অন্য পাঁচটি দেশ হলো এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও লিথুয়ানিয়া। তারা ইউক্রেনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ভোট দেয়নি।
ইউক্রেনের অভিযোগ, ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন মানচিত্রে রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে অনেক হালকা রঙে দেখানো হয়েছে।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয় এবং পরে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। জাতিসংঘ এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছিল।
নতুন মানচিত্রে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকেও আলাদা রঙে দেখানো হয়েছে। তবে ক্রিমিয়ার হলুদ রংটি ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়ার রঙের কাছাকাছি।
জাতিসংঘে ইউক্রেনের স্থায়ী প্রতিনিধি আন্দ্রি মেলনিক বলেন, মানচিত্র পরিবর্তনের মূল বিষয়টি নিয়ে ইউক্রেনের কোনো নীতিগত আপত্তি নেই।
তিনি বলেন, ভোটের আগে ইউক্রেন মানচিত্রে কিছু পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু সেই অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
মেলনিকের মতে, নতুন এই মানচিত্র ভবিষ্যতে বিশ্ব মানচিত্রের ভুল ব্যবহার বা বিকৃত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশ ও মহাদেশকে মানচিত্রে সঠিকভাবে দেখানোর পুরোনো ভুল ঠিক করতে গিয়ে নতুন কোনো সমস্যা তৈরি করা উচিত হবে না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের জন্যও এমন পরিস্থিতি তৈরি করা বড় ভুল হবে।
জাপানের দাবি কী?
এদিকে বৃহস্পতিবার জাপানও নতুন মানচিত্রে কিছু পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। জাপান জাতিসংঘের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। টোকিও বলেছে, ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন মানচিত্রে রাশিয়ার ভূখণ্ড এবং বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জ একই ধরনের রং ও শেডে দেখানো হয়েছে। এ কারণে জাপান মানচিত্রটিতে সংশোধন চেয়েছে।
রাশিয়া ও জাপান দীর্ঘদিন ধরে চারটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ করছে। রাশিয়ায় দ্বীপগুলো দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জ এবং জাপানে উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড নামে পরিচিত।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বীপগুলো দখল করে নেয়। পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে একটি চুক্তির আওতায় তারা এই অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে দ্বীপগুলোতে থাকা জাপানি বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ওই দ্বীপগুলো মূল চুক্তির অংশ ছিল না। তবে দ্বীপগুলো এখনো রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চলতি বছরের আগস্টে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রথমবারের মতো দ্বীপগুলো সফর করেন। এই সফরের নিন্দা জানায় জাপান।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সফরটিকে ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এই সফর জাপানের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।
এ সপ্তাহে জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে জাপানের দূতাবাস ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের নির্মাতাদের মানচিত্রে পরিবর্তন আনার অনুরোধ জানিয়েছে।
কিহারা বলেন, “মানচিত্রে এমন কিছু দেখানো হয়েছে, যা জাপান সরকারের অবস্থানের সঙ্গে মেলে না।”
তিনি আরও বলেন, “জাপানের ভূখণ্ড ও ভৌগোলিক নাম নিয়ে ভুল ধারণা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
নতুন মানচিত্র নিয়ে ভারতের উদ্বেগ কেন?
ভারতও ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন মানচিত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে রোববার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলকে মানচিত্রে কীভাবে দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে একটি আপত্তি জানিয়েছে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীরের মালিকানা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই দাবি জানায়। ওই অঞ্চলটি আগে ব্রিটিশদের পরোক্ষ শাসনের অধীনে ছিল।
এরপর থেকে কাশ্মীর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে আছে। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধও হয়েছে।
কাশ্মীরের কিছু অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্য অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কাশ্মীরের কিছু এলাকা নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনেরও বিরোধ রয়েছে। অঞ্চলটির উত্তর-পূর্ব অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, জাতিসংঘের ভোটে সব অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন অনুযায়ী মানচিত্র তৈরিতে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
তিনি বলেন, “জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলসহ ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ড অবশ্যই ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখাতে হবে। কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন গ্রহণযোগ্য নয়।”
লেখাটি আল জাজিরার নিবন্ধ থেকে অনূদিত