ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও মৌলিক পরিচয়ের ধারক ও বাহক। মানুষের চিন্তা, চেতনা এবং স্বকীয়তা ভাষার মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায়। এই আদর্শে মাতৃভাষা ও ভাষার গুরুত্ব সংরক্ষণের লক্ষ্যে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যের ভ্যানকুভারে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটি’ (জিএমএলএলএস)।
গত রোববার এই সংগঠনের উদ্যোগে নিউ ওয়েস্টমিনস্টারের কুইন্সবোরো কমিউনিটি সেন্টারের মুক্তমঞ্চে বার্ষিক ‘মাতৃভাষা উৎসব ২০২৬’ সফলভাবে উদ্যাপিত হয়েছে।
চলতি বছরে এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘‘ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই আমাদের পরিচয়।’’
বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণের অঙ্গীকার নিয়ে আয়োজিত এই উৎসবে সমাজসেবক, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী এবং কানাডার বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
কানাডার জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে উৎসবের উদ্বোধনী পর্বের শুভ সূচনা হয়। এরপর ফার্স্ট নেশনসের (কানাডার আদিবাসী) শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে দেশীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পরবর্তীতে বাংলাদেশের ভাষা শহীদ ও বিশ্বের যেসব মানুষ মাতৃভাষা রক্ষায় সংগ্রাম ও জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের স্মরণে ৩০ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করা হয়।
ছবি: ফারজানা নাজ শম্পার মাধ্যমে প্রাপ্ত
ফেডারেল সংসদ সদস্য (এমপি) জেইক সাওয়াটস্কি দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও উৎসবের মূল অতিথি হিসেবে একটি বিশেষ বার্তা পাঠান। তিনি মাতৃভাষা সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান ও সাধুবাদ জানান। তার বার্তা পাঠ করে শোনান শফিউল আজম।
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বসবাসরত বিশিষ্ট বাঙালি লেখক ও কবিরা এই আয়োজনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
সাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী ফারজানা নাজ শম্পা তার অনূদিত বই থেকে কানাডিয়ান কবি জর্জ এলিয়টের ইংরেজি কবিতার এবং বাংলা আবৃত্তি উপস্থাপন করেন।
তিনি বিভিন্ন ভাষার সৌন্দর্যকে অলংকারের সাথে তুলনা এবং কানাডার সাহিত্য অনুবাদের প্রয়োজনীতা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৭০টিরও বেশি ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ছবি: ফারজানা নাজ শম্পার মাধ্যমে প্রাপ্ত
সংগঠনের দীর্ঘদিনের সহযোগী কবি শাহানা আক্তার মহুয়া তার বক্তব্যে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কীভাবে আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয় গঠন করে তা তুলে ধরেন।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ড. আবদুল মতিন তার বক্তব্যে মনে করিয়ে দেন, মাতৃভাষা রক্ষার লড়াই শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকেই। অভিভাবকেরা যেন প্রতিদিনের পারিবারিক জীবনে সন্তানদের সাথে মাতৃভাষায় কথা বলেন, সেই আহ্বান জানান তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, ভাষা হলো শিকড় ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের মূল সেতু; এটি হারিয়ে গেলে নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়াও, আবদুল মতিন ইউনেসকোতে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাবক প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের অনন্য অবদানের কথা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তাদের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টাতেই ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
ছবি: ফারজানা নাজ শম্পার মাধ্যমে প্রাপ্ত
বহুমুখী সংস্কৃতি ও পারস্পরিক মেলবন্ধনের আবহে এই উৎসবটির সফল আয়োজনের পেছনে ছিল সংগঠনের নির্বাহী কমিটির নিরলস পরিশ্রম ও চমৎকার দলগত প্রচেষ্টা।
এই বর্ণিল আয়োজনে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানানো হয় হাসান মামুন, মাইকেল মিত্র ও শফিউল আজমসহ নির্বাহী কমিটির সকল সদস্যকে—যাদের পরিকল্পনা ও সুসমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি সাবলীলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় কানাডার বহুমাত্রিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে, যা এক কথায় ছিল চিত্তাকর্ষক।
বাংলাদেশ, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার শিল্পীদের তাদের স্বকীয় আবহে বর্ণিল নৃত্য পরিবেশনা সার্বিক অনুষ্ঠানে উচ্চতর মাত্রা যোগ করে তা দর্শকদের মুগ্ধ করে। সেদিনের সংস্কৃতির বৈচিত্রময় এই অপূর্ব মেলবন্ধন প্রমাণ করে কীভাবে ভাষা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।
ছবি: ফারজানা নাজ শম্পার মাধ্যমে প্রাপ্ত
অনুষ্ঠানে আব্দুল মতিন ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সহ আহ্বায়ক সর্বজন শ্রদ্ধেয় আব্দুস সালামের হাতে।
এই মাতৃভাষা উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি বিশেষ মুহূর্ত যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তা বহন করে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও অস্তিত্ব।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটির বর্তমান সভাপতি ড. আব্দুল মতিন ১৪ বছর ধরে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত এবং নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সহসভাপতি পদে দায়িত্বে রয়েছেন মাইকেল দীপায়ন মিত্র ও হাসান মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত শফিউল আজম।