দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সরকার বলছে, সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে এই পরিস্থিতি খারাপ হবে। অন্তত ১৫ জেলায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের তুলনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু নিজেও ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারে না সে কী অনুভব করছে।
অনেক অভিভাবক শুরুতে জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে করে বাড়িতেই চিকিৎসা চালিয়ে যান। কিন্তু ডেঙ্গুতে দেরিতে চিকিৎসা শুরু হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়, বিশেষ করে প্লাটিলেট কমে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ জ্বরের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু জ্বর যদি তিন দিনের বেশি থাকে বা শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। ডেঙ্গুর শুরুতে যেসব লক্ষণ সাধারণত দেখা যায়—
- হঠাৎ করে বেশি জ্বর (১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত)
- মাথা ব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা
- খাবারে অরুচি
- বমি ভাব বা একবার দুবার বমি
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের ৭টি সতর্কীকরণ লক্ষণ
ডেঙ্গু জ্বরে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো খুবই বিপজ্জনক। এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
- শিশু বারবার বমি করলে বা কিছু খেলেই বমি হয়ে গেলে এটি ডেঙ্গুর গুরুতর লক্ষণ হতে পারে। এতে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
- ডেঙ্গু জ্বরে হঠাৎ করে তীব্র পেট ব্যথা শুরু হলে সেটিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
- নাক দিয়ে রক্ত পড়া, দাঁত ব্রাশের সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া বা শরীরে লাল দাগ দেখা গেলে তা ডেঙ্গুর সতর্ক সংকেত।
- শিশুর পায়খানার রং যদি কালচে বা রক্তের মতো হয়, তাহলে এটি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের লক্ষণ হতে পারে। এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
- শিশু যদি অনেক সময় প্রস্রাব না করে বা খুব অল্প প্রস্রাব করে, তাহলে এটি পানিশূন্যতা বা শকের লক্ষণ হতে পারে।
- শিশু হঠাৎ খুব নিস্তেজ হয়ে গেলে, কথা বলতে না চাইলে বা অস্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে থাকলে সেটি বিপদের ইঙ্গিত।
- শরীর গরম থাকলেও যদি শিশুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, তাহলে এটি ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজে প্রবেশের লক্ষণ হতে পারে।
এই লক্ষণগুলো সাধারণত ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজে দেখা যায়, যা শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা ও জরুরি করণীয়
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তাই ডেঙ্গুর চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখা এবং জটিলতা প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে বেশিরভাগ শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। এর জন্য কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। জ্বর ও ব্যথা নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, শরীরে পানিশূন্যতা হতে না দেওয়া এবং প্লাটিলেট ও অন্যান্য জটিলতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। এই তিনটি বিষয় ঠিকভাবে মানা হলে ডেঙ্গু জ্বর নিরাপদভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব। এছাড়া যা করতে পারেন-
- জ্বর হলে কেবল নিরাপদ জ্বরের ওষুধ ব্যবহার করা
- পর্যাপ্ত পানি, ওআরএস বা তরল খাবার যেমন স্যুপ, জাউ ভাত, ডাবের পানি, ফলের রস দেওয়া
- শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখা
- মশারি টানিয়ে রাখার পাশাপাশি ফুলহাতা পোশাক পরিয়ে রাখা
- জ্বর ও উপসর্গ নিয়মিত লক্ষ্য করা
কখন হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি?
সব ডেঙ্গু রোগীকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় না। তবে নিচের পরিস্থিতিতে হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি—
- গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে
- প্লাটিলেট দ্রুত কমে গেলে
- শিশুর শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে
- শিশুর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে গেলে
সতর্কতা: ভুল ধারণা থেকে পেঁপে পাতার রস বা অন্য কোনো ঘরোয়া চিকিৎসা শিশুকে দেওয়া উচিত নয়। নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ওষুধ দেওয়া বা অন্যের পরামর্শে চিকিৎসা শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।