২০২৩ সালের অস্কার অ্যাওয়ার্ডের আসরে উপস্থাপক ছিলেন জিমি কিমেল। উপস্থাপনার পাশাপাশি কমেডিয়ান হিসেবেও তার বেশ খ্যাতি রয়েছে। তো সেই আয়োজনে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, “সবাইকে বেশ দারুণ দেখাচ্ছে। চারপাশের চেহারাগুলো দেখলে একটা প্রশ্নই মাথায় ঘোরে—আমারও কি এবার ‘ওজেম্পিক’ খাওয়া শুরু করা উচিত?”
উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হালকা হাসির রোল উঠলেও বোঝা যাচ্ছিল কথাটি অনেকেরই বেশ গায়ে লেগেছে। লাগারই কথা! কারণ তিন বছর আগে তারকাদের দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলার জন্য ওজেম্পিকের বহুল ব্যবহারকে তখন হলিউডের সবচেয়ে বাজে ‘ওপেন সিক্রেট’ বলা হত।
২০২২ সালের শেষের দিকে হঠাৎ করে ওজেম্পিকের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে যখন হলিউডের সেলিব্রেটিরা এর ব্যবহার শুরু করেন। তাদের দেখাদেখি যারা দীর্ঘদিন ধরে ওজন কমানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারাও এর দিকে ঝুঁকে গেলেন। দেখা যায় ওজেম্পিক ব্যবহার করে এক ধাক্কায় মাসে ৪ থেকে ৫ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেছেন কেউ কেউ! এভাবেই ওজন কমানোর দুনিয়ায় রাতারাতি বড় পরিবর্তন এনে দেয় এই ম্যাজিক ‘ইনজেকশন’।
কিন্তু ওজেম্পিকের দাম কিন্তু অনেক। ইচ্ছা থাকলেও সবার এটি কেনার সামর্থ্য হয় না। তাই তো বিভিন্ন ওয়েলনেস ইনস্টিটিউট ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এর ‘প্রাকৃতিক বিকল্প’ খুঁজেছেন হন্যে হয়ে। তারা সস্তা ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যাবে এমন কিছু জিনিস নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন, যা নাকি ওজেম্পিকের মতো দ্রুত কমাতে পারে। এই তালিকায় সাম্প্রতিক সময় সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে ‘সিলিয়াম হাস্ক’-এর নাম। আর এই সিলিয়াম হাস্ক আর কিছুই নয়— আমাদের অতি পরিচিত ইসবগুলের ভুষি।
কীভাবে ইসবগুল ওজেম্পিকের বিকল্প হলো
এটি বুঝতে হলে আগে ওজেম্পিক কীভাবে কাজ করে সেটা জানতে হবে। ওজেম্পিক মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য তৈরি একটি ওষুধ। এটি মূলত শরীরের ক্ষুধা ও হজমপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক নিয়ম বদলে দিয়ে দ্রুত ওজন কমাতে সাহায্য করে। এই ওষুধটি ‘জিএলপি-১’ নামের একটি বিশেষ হরমোনের মতো কাজ করে মস্তিষ্ককে বোঝায় যে পেট ভরা আছে। পাশাপাশি এটি পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি ধীর করে দেয়, ফলে খাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগে না। একই সাথে ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়িয়ে রক্তে শর্করার মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখে। হরমোন আর হজমপ্রক্রিয়ার ওপর এই প্রভাবগুলোর কারণেই এর ‘সাইড ইফেক্ট’ ফল হিসেবে শরীর থেকে মেদ কমতে শুরু করে।
অন্যদিকে, ইসবগুলের ভুষি হলো প্ল্যান্টাগো ওভাটা গাছের বীজ থেকে পাওয়া একটি প্রাকৃতিক দ্রবণীয় আঁশ বা ফাইবার। বছর পর বছর ধরে হজমের সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মানুষ এটি খেয়ে আসছে। ওষুধের মতো এটি শরীরের হরমোনের সাথে কোনো সরাসরি রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না, বরং পানি দিয়ে খাওয়ার পর এটি পরিপাকতন্ত্রে একদম সাধারণ কিছু শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজ করে।
ওজেম্পিক খুব দ্রুত ওজন কমাতে পারে। ছবি: রয়টার্স
ওজেম্পিক আর ইসবগুলের কাজের ধরণ আলাদা হলেও শেষমেশ দুটোই জিএলপি-১ হরমোনকে সক্রিয় করে। ওজেম্পিক সরাসরি শরীরের হরমোন রিসিভারগুলোকে নামিয়ে দেয়, আর ইসবগুল কাজটি করে একটু ঘুরিয়ে। ইসবগুল পানির সাথে মিশে পেট ও অন্ত্রের ভেতরে গিয়ে জেলের মতো ফুলে ফেঁপে ওঠে। এতে অন্ত্রের দেয়ালে এক ধরনের মৃদু চাপ তৈরি হয়। এই শারীরিক প্রসারণ দেখে শরীর নিজে থেকেই জিএলপি-১ হরমোন তৈরি করতে শুরু করে, যা পরে মস্তিষ্কে পেট ভরা থাকার বার্তা পাঠায় এবং ক্ষুধা কমিয়ে দেয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ওজেম্পিক বাইরে থেকে সরাসরি হরমোনের সংকেত পাঠায়, আর ইসবগুল স্বাভাবিক পরিপাকতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে শরীরকে সেই একই হরমোন তৈরি করতে ‘উসকানি’ দেয়।
ইসবগুলের উপকারিতা
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার মেয়ো ক্লিনিকের ডায়েটেশিয়ান ক্যাথরিন জেরাটস্কি জানান, ইসবগুলের ভুষি দ্রবণীয় আঁশের একটি দারুণ উৎস। অদ্রবণীয় আঁশ যেমন হজমের সময় অপরিবর্তিত থাকে, দ্রবণীয় ফাইবার কিন্তু তেমন নয়। এটি হজমের সময় পানি শুষে নিয়ে ঘন জেলের মতো রূপ নেয়।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক সেন্টার ফর হিউম্যান নিউট্রিশনের ডায়েটেশিয়ান জুলিয়া জুম্পানো ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “এই জেল মলকে নরম করে এবং এর পরিমাণ বাড়ায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া—উভয় সমস্যা সমাধানেই সমান সাহায্য করে।”
জুম্পানো আরও উল্লেখ করেন, এই জেল অন্ত্রে থাকা পিত্তের সাথে মিশে যায়, যা মূলত কোলেস্টেরল দিয়ে তৈরি। পরে তা বর্জ্য হিসেবে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, যার ফলে শরীরের সামগ্রিক কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে।
‘আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত ২০১৮ সালের একটি মেটা-অ্যানালিসিসের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ গ্রাম ইসবগুলের ভুষি খেলে তা সুস্থ ব্যক্তি এবং উচ্চ কোলেস্টেরল থাকা রোগী—উভয়ের ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর ‘এলডিএল’ ও মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
জুম্পানো জানান, এটি রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ শোষণের গতি ধীর করে দেয়, যা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতেও ভূমিকা রাখে।
এছাড়া ইসবগুল দৈনিক ফাইবারের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৫ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে মাত্র ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করেন। সেই হিসেবে এটি অত্যন্ত উপকারী, কারণ মাত্র এক টেবিল চামচ ইসবগুল থেকেই প্রায় ৭ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছে
‘অ্যাকাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিক্স’-এর মুখপাত্র লিনা বিল দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ইসবগুলের ভুষির কথা নানাভাবে প্রচার করায় এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাদের দাবি—এটি ক্ষুধা কমায়, হজম ক্ষমতা বাড়ায়, এমনকি দামি ওষুধের মতোও কাজ করতে পারে।” তবে ইসবগুলের ভুষিকে ওজেম্পিকের সাথে তুলনা করাকে তিনি ‘অতিরঞ্জিত এবং বিভ্রান্তিকর’ বলে সতর্ক করেছেন।
জুম্পানোর মতে, যেকোনো রূপেই ফাইবার খাওয়া হোক না কেন, তার নানাবিধ স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। এটি যেমন হজমপ্রক্রিয়া ধীর করে, তেমনি পেট ভরিয়ে রেখে তৃপ্তি বাড়ায়—যা ওজন কমানোর ওষুধগুলোরও মূল কাজ। তবে তিনি সতর্কতার সাথে যোগ করেন, ওজেম্পিকের মতো ওষুধগুলো যতটা কার্যকরভাবে এই কাজ করে, ফাইবার কিন্তু ঠিক ততটা ব্যাপকভাবে করতে পারে না।